.
৩৯.
শীতের বেলা তাড়াতাড়ি ফুরোয়।
খিদেয় আনচান করছিল সরস্বতীর শরীর। নদীয়ায় এসে তার মনোকষ্ট আরও বেড়েছে। তবে হারবে না সে, হারতে শেখেনি। মানুষটা ভেবেছে’টা কি? বোবা হয়ে ঘুরবে সারাদিন। শুধু ডিউটিটুকু ছাড়া সে আর কি করে? দিদিমনির বাসায় বসে চা খায় কুঁড়ের মতো। এর-ওর ফাইফরমাস খাটে। বিরক্তিতে শরীর জ্বলে সরস্বতীর। গাঁয়ে থাকতে বামুনড়ির পেছন ছাড়ত না সে। বাইরে এসে সে-স্বভাব আর গেল না। না যাক। এতে সরস্বতীর কোনো কিছু আসে যায় না। সে ভেবে রেখেছে এবার দেশ-গাঁয়ে গিয়ে আর ফিরে আসবে না। কেন আসবে? দুবেলা, দুমুঠো খাওয়ার জন্য কি জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখা। এর বাইরে বুঝি জীবনটার কোনো আলাদা মানে নেই? সরস্বতী ঘেমে উঠছিল, টনটন করছিল তার কপালের শিরা।
সেই কখন বাবার খোঁজে ঘর ছেড়েছিল শুভ। ঘণ্টা দেড়েক পার করে ফিরে এল শূন্য মনে। বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে বলল, বাবাকে কোথাও দেখতে পেলাম না মা। মনে হচ্ছে বাবা শেরপুরের দিকে চলে গেছে। হলদিপোঁতা ধাওড়া যেতে তার ভালো লাগে। আমি কি একবার রঘুদের ঘর থেকে ঘুরে আসব?
-ওখানে কি ওর বাপ-ঠাকুরদা থাকে? চকিতে ঝাঁঝিয়ে উঠল স্বরস্বতী, চোখের কোণ মুছে স্বাভাবিক হয়ে বলল, আমাকে জ্বালিয়ে মারল লোকটা। এভাবে বেশিদিন বাঁচা যায় না। তোর বাবা মনে হয় আমার মরা-মুখ না দেখে শাস নেবে না। শুভ হত- চকিত। তার কিছু বলার নেই। সে কথা শুনে থরথর করে কাঁপছে। একটা ভয় খামচে ধরছে তার মন। এ সময় অবনী কোথায় থাকতে পারে এটা তার অজানা। পুরো কালীগঞ্জ বাজার খুঁজেছে সে, কোথাও তার দেখা নেই। বারোয়ারীতলায় মাঝে মাঝে শুয়ে থাকে মনের দুঃখে, আজ বারোয়ারীতলাও ফাঁকা। শুধু দুটো পথের কুকুর শুয়ে আছে বিক্ষিপ্ত ভাবে।
সরস্বতী হার মানার মেয়ে নয়, সে দম না নিয়ে বলল, তুই ঘরে থাক, আমি আসছি। যাব আর আসব। ভয় পাবি না।
-কোথায় যাবে মা?
-মরতে। সরস্বতীর চোখ ছলছলিয়ে উঠল, আমি মরলে তোর বাবার শান্তি হয়। দেখবি, আমি একদিন ঠিক মরব। মরে ওকে শিক্ষা দিয়ে যাব। ভেবেছে টো-টো করে ঘুরে বেড়াবে। আমাকে জব্দ করবে। তা আমি হতে দেব না।
গজগজ করতে চলে গেল সরস্বতী।
হাসপাতালের মাঠ পেরলেই পাকা রাস্তা। দুটোর বাস সেই কখন চলে গেছে দেবগ্রামের দিকে। এখন মরা সাপের মতো শুয়ে আছে শীর্ণ কালো পথ। দু-পাশের ধুলো ছড়ছড় করছে হাওয়ায়। চা-দোকানটাও অবেলায় বন্ধ। না হলে চা-দোকানীকে শুধাতে পারত সে।
ফাঁকা রাস্তায় দুটো গোয় হেলতে দুলতে চলে গেল। শীতের বেলায় আর ঘাসে মুখ দিতে মন করছে না ওদের। আলিস্যি ভর করে আছে হাওয়ায়।
সরস্বতীর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে হাঁটছে তো হাঁটছে।
মনে ভয় ঢুকেছে তার। কেউ যদি হারিয়ে দেয় তাকে। যদি ছিনিয়ে নেয় অবনীকে?
এত অবহেলা নিয়ে যে মানুষটা বেঁচে আছে তার অন্য দিকে ঢলে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। ঠিকঠাক আশ্রয় পেলে মাথা গুঁজে দেবে-এ আর নতুন কি। সরস্বতীর চোখের তারা কেঁপে উঠল। দূর থেকে সে দেখতে পেল সনাতন মুদি-দোকানীকে ব্রহ্মানীতলার পাশ দিয়ে আসতে। চাপড়া গাঁয়ে ঢোকার ওই একটাই রাস্তা। সনাতন মুদি দোকানীকে দু-চার বার সে দেখেছে। মানুষটা ভালো। কালীগঞ্জের কেউ যখন সাহস করে ধারে ভুষিমালপত্তর দিল না, তখন ঐ মানুষটাই বলেছিল, মাসকাবারী আমার দোকান থেকে নিও, তবে বেতন পেয়ে মাসে-মাসে সব মিটিয়ে দিও। আমার পুঁজি অল্প। ধার-দেনা রাখলে ডুবে যাবো।
অবনীর হাত ধরে শুভ যেত চাপড়ায় মাসকাবারি বাজার করতে। হিসাবের খাতায় যোগ ঠিক আছে কিনা দেখতো সে। অবনী তখন গর্বিত চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত অপলক। ছেলে শিক্ষিত হলে আর কেউ ঠকিয়ে নিতে পারবে না। দিন বদলের ইংগিতটা তখনই ধরা দিত তার চোখে।
সনাতন মুদি সরস্বতীকে দেখতে পেয়ে সাইকেলের ব্রেক মেরে দাঁড়াল। টানা সাইকেল চালিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। কিছুক্ষণ দম নিয়ে বলল, অবেলায় কোথায় যাচ্ছ গো শুভ’র মা? তা খবরাখবর সব ভালো তো?
সরস্বতী অপ্রস্তুত। কিছুটা লজ্জিত। কপালের কুঁচো চুলগুলো সরিয়ে সহজ ভাবে তাকাল, শুভর বাবা ঘরে আসেনি। তাই খুঁজতে বেরিয়েছি।
সনাতন মুদি দম ধরে থাকল কিছু সময়। অবনীকে সে দেখেছে পদ্মর দাওয়ায় তক্তপোষে শুয়ে থাকতে। ভর পেট নেশা করেছে সে, দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এই অপ্রিয় সত্যটি কি সরস্বতীর কাছে বলা যাবে? বলার পরে কী প্রতিক্রিয়া হবে বউটার বোঝার চেষ্টা করল সে। দোনো-মোনো দৃষ্টি মেলে সে চেয়ে আছে সরস্বতীর দিকে। একই দৃষ্টিতে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে সরস্বতী। তার ডাগর চোখে সব সময় যেন কাজল পরানো। সব চাইতে ওর চুলের বাহার দেখার মতো। একেবারে কালো কুচকুচে কোঁকড়ান চুল। সিঁথিতে গুঁড়ো সিঁদুর পরলে দেবীর মতো দেখায়। এক নজরে সবাই তাকে বলে সুন্দরী। যেমন গায়ের রঙ তেমন চোখ-মুখের গড়ন। ভগবান ওর চেহারায় আভিজাত্যের বার্নিশ লাগিয়ে পাঠিয়েছে।
সনাতন মুদি চোখ কুঁকড়ে তাকাল। মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, অবনীকে দাস পাড়ায় দেখে এলাম। বেশ নেশা করেছে মনে হল। তবে এর আগে ওকে আমি নেশা করতে দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম।
