পদ্ম গ্লাসে দেশী মদ ঢালে, নিবিষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকে অবনী। পৃথিবীতে এমন সুখের দৃশ্য বুঝি ম দেখা যায়। এমন সুন্দর মেয়েমানুষটাকে কী ভাবে খেদিয়ে দিল তার বর? সে কি মানুষ না পশু? তার কি চোখ নেই, মন নেই? শরীরে কোনো তাপ নেই? পদ্মর কালোজাম চোখের তারায় ফঁদে লটকান ঘুঘু পাখির মতো ছটফট করতে থাকে অবনী। সে আর তাকাতে পারছে না, বুজে আসছে চোখ। পদ্মর ঠোঁটে লেপটে থাকা মিহি হাসি ধার চাকুর মতো কাটছে তার মন। আজ কি হল? কেন এই দুর্বলতা, বাঁধ ছাপানো আবেগ। এ সবের জন্য দায়ী সরস্বতী। একটা দিনের জন্য তাকে ভালোবাসা দিল না। শুধু ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারল শক্ত কথার ইট-পাথর।
কাচের গ্লাসে চুমুক দিয়ে আনমনা হয়ে গেল অবনী। পদ্মকে প্রথম কোথায় দেখেছিল মনে করার চেষ্টা করল সে। হাসপাতালই তার বৃন্দাবন। ভিড়ের মাঝে পদ্মকে দেখে তার চোখ ফসকে যায় নি। আউটডোরে শ্লিপ হাতে বোকার মতো দাঁড়িয়ে ছিল পদ্ম। অবনী আগ বাড়িয়ে বলল, ওষুধ নেবে? পদ্মর হাত থেকে ডাক্তারবাবুর লেখা শ্লিপটা কেড়ে নিয়ে সে এগিয়ে গিয়েছিল ওষুধ আনার জন্য।
একথা সে কথায় ভাব আলাপ। ঘনিষ্ঠতা।
–কোথায় থাকো?
দাসপাড়ায়।
–তোমার ঘরের মানুষ? অবনীর প্রশ্নে হা-করে তাকিয়েছিল পদ্ম।
–সে নেই। মরেচে। কথাগুলো শেষ না হতেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল পদ্ম।
ছিঃ, তার সিঁদুর পরে অমন কথা বলতে নেই। অবনীর গলা বুজে এসেছিল, তোমার অনেক দুঃখ আছে। দুঃখকে সামলে রাখতে হয় নাহলে দুঃখরা ডিম ফুটে আরো দুঃখের জন্ম দেয়। আমার কথাটা মনে রেখো।
–আমি নিজেই দুঃখের পুকুর। পানসে হাসিতে পদ্মর ঠোঁট নড়ে উঠল।
–আমিও। অবনী মন খারাপ করা চোখে তাকাল।
-কেন, তুমি তো চাকুরিয়া, মাস গেলে মাহিনা পাও, তোমার আবার দুঃখ কিসের? পদ্মর প্রশ্নে চালাকি ছিল না, ছিল সমবেদনা।
সেই প্রথম আলাপ। তারপর এখানে সেখানে দেখা হত পদ্মর সাথে। রোদের মতো ওর চেহারার আকর্ষণ। সময়ের সাথে সাথে বদলায়। এই চড়া, এই কড়া, আবার কখনও মিয়ানো।
একদিন পদ্ম কোয়ার্টারে এল ঝুড়ি মাথায়। ঝুড়িতে পাকা কলা। কাতর হয়ে বলল, সারাদিন ঘুরে ঘুরে হাঁপিয়ে গেলাম তবু কাজের কাজ কিছু হল না। কলাগুলো রাখো গো, কম করে দেব।
–এত কলা নিয়ে কী করব? পচে যাবে যে!
–পচার আগে খেয়ে নিও।
তার আদিখ্যেতা ভালো চোখে দেখেনি সরস্বতী। কলাগুলো কিনে নিয়ে বিদেয় করেছিল তাকে। পদ্মর ছায়া সরে যেতেই সরস্বতী মুখ ঝামটে বলেছিল, মেয়ে দেখলে লুলিয়ে ওঠো দেখছি। খবরদার ওই বউটার সাথে যদি কথা বলেছ–তোমার চোখ আমি গেলে দেব। মনে থাকে যেন কথাটা।
-কথা বললে কি মানুষ খারাপ হয়ে যায়?
–সে আমি জানি নে। তবে তুমি ওর সাথে কথা বলবে না। সরস্বতীর গলা শক্ত হয়ে এল, বউটার স্বভাব ভালো নয় দেখে মনে হচ্ছে। ভাতার খেদানো মেয়েমানুষ আর কত ভালো হবে। দেখছিলে না চোখ দুটোতে খালি খাই খাই ভাব।
হাসপাতাল চত্বরে পদ্ম এলেই সতর্ক হয়ে যেত সরস্বতী। তার চিল-নজর পরিমাপ করতে চাইত কাল্পনিক এক সম্পর্কের গভীরতা। ভুল ভেঙে যেত তার। অবনী ওসবের সাতযোজন দূরে। কারোর চোখের দিকে তাকিয়ে তার কথা বলার সাহস নেই। এমন ভীতু মানুষ সম্পর্কের সেতু গড়বে। আপনমনে হেসে উঠেছে সরস্বতী। বোকা, বোকার হদ্দ!
এক গ্লাস পেটে পড়তেই অবনী আচমকাই চেপে ধরল পদ্মর নরম হাত, গলা বুজে এল কথা বলতে গিয়ে, তোমার কাছে এসেছি অনেক দুঃখ নিয়ে। গত-জন্মে তুমি আমার কেউ ছিলে গো! বোঝাতে পারব না, তোমার জন্য আমার কেন কষ্ট হয়। সেই প্রথম যেদিন দেখলাম, সেদিন থেকে। হাতটা ছাড়িয়ে নিতে পারে না পদ্ম। অবনীর দু-চোখ বেয়ে টসটসিয়ে জল ঝরছে। এই অশ্রদানার নাম বুঝি ভালোবাসা। পদ্মর বুকটা চিতল মাছের পাখনার মতো থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে। ঘামছে সে। শরীর বুঝি দিঘি হয়ে যাবে ঘামে-ঘামে। এই স্পর্শ, উষ্ণতা সেও তো জীবনে পায়নি। এই প্রথম সে বুঝতে পারে-তারও কারোর জন্য বেঁচে থাকার দরকার আছে। পরপর তিন গ্লাস মদ টেনে ধুলো পথে শুয়ে পড়েছে অবনী। এমন বেহেড মাতাল এর আগে সে হয় নি। আজ যেন সব ছাপিয়ে গিয়েছে। আজ যেন ভেঙে গেছে জগৎখালির বাঁধ। হু-হু করে ঢুকছে ঘোলা জল। বিড়বিড় করে সে বলছে, কেউ ভালোবাসেনি আমাকে। শুধু ঘেন্না করেছে। ভেবেছে-আমি একটা কুকুর। আমার মন নেই, দুঃখ নেই। কিসসু নেই। কিসসু নেই যখন, তখন এ দুনিয়ায় আমার কোনো দরকার নেই।
-তুমি চুপ করো, চাকুরিয়া। পদ্ম তার মাথার কাছে গিয়ে বসল।
–আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমার মদে কি ঘুমের বড়ি মেশানো ছিল, নাকি তুমিই নিজে ঘুমের বড়ি?
পদ্ম ধমক দিতে পারে না, শুধু বলে, চুপ করো।
ভারী পুরুষ-শরীরটাকে সে কোনোমতে শুইয়ে দেয় চাটাই পেতে রাখা তক্তপোষে। ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে থরথরিয়ে, একটা অজানা ভয় বুকের ভেতর শুরু করে হামা দিতে। চাকুরিয়া তার কাছে কেন আসে, কি চায় সে? পদ্মর কি ক্ষমতা আছে তাকে সব দেওয়ার। অথচ ধরা দিতে মন চায়। এক পা এগোতে গেলে শ’ পা পিছিয়ে আসে কেন? এ কেমন অসুখ। বুকের ভেতর খলখল করে কান্না। কথা আটকে যায় গলায়। কোনোমতে উবু হয়ে সে তার মুখটা নামিয়ে নিয়ে যায় অবনীর বুকের কাছে। হাতটা বুকের কাছে রাখতেই চমকে ওঠে অবনী। এ কার ছোঁয়া, এত শিহরণময়? সরস্বতীর ঘৃণা আজ পদ্মর ছোঁয়ায় ভালোবাসা হয়ে সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। আঃ; কী শান্তি! অবনীর মনে হয় সে মরে যাবে আনন্দে। নেশা করলে এত আনন্দ হয়-কই আগে তো সে টের পায়নি। গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে বাতাসে। অবনী হাতবাড়িয়ে পদ্মকে ফুলের ডাল নামানোর মতো নামিয়ে আনে বুকের উপর। পদ্ম কুঁকড়ে গিয়ে সরে যায়, যেন তার মনে কুঠ ফুটেছে, এই মন দিয়ে কাউকে ছুঁতে নেই। ছুঁলেই বাঁধ ভেঙে যাবে। পাপের না প্রেমের না পরাজয়ের?
