পাল পুকুরের পাড় ছাড়িয়ে এলে শুরু হয় ঘন বাঁশবন। এত ঠাসাঠাসি বাঁশগাছ যে রোদ ঢোকে কম। আগে প্রায় বিকালে ডাহুক মারতে আসত শুভ, তার হাতে থাকত চামগুলতি আর পকেটভর্তি পোড়ান ভেঁটুল। ওর হাতে এম আছে। প্রায়ই এটা সেটা মেরে আনে।
দুপুরের আলোয় একটা মোহনী মনোমুগ্ধকর লুকোচুরি খেলা চলে প্রকৃতিতে। সেই আমেজটুকু ধরার চেষ্টায় ছিল অবনী। কিন্তু ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে সে হতাশ চোখে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকাল। এত আলোেছায়ার খেলা এ তল্লাটে আর কোথাও নেই। দুপুরবেলায় বাঁশঝাড় যেন বিছানা পেতে রাখে ঘুমানোর জন্য। অনেকদিন পরে অবনীর বামুনবুড়ির কথা মনে পড়ল। তার স্নেহ যেন বাঁশতলার ছায়া। অথচ সরস্বতী বামুনবুড়িকে সহ্য করতে পারে না, দাঁত বের করে বলে, ভারি তো একটা চাকরি করে দিয়েছে তার জন্য অত! তোমার ভাগ্যে ছিল তাই হয়েছে। ও নিয়ে অত ভেবে মাথা ফাটিয়ে কি লাভ? যার কাজ সে করে এতে আবার বাহাদুরি কী!
কথা বাড়ায় না অবনী। কথা তো আগুনের হলকা। পুড়ে যাবে, ছারখার হয়ে যাবে। তাই বোবার শত্রু নেই। মুখে তার কুলুপ আঁটা। হাঁটতে হাঁটতে ঢেলায় হোঁচট খায় অবনী। আর একটু জোরে লাগলে বুড়ো আঙুলের ডগা ফেটে রক্ত ঝরত। এখন নীলচে হয়ে আছে জায়গাটা। বেশ টন টন করছে ব্যথায়। রক্ত জমে গেলে অমন হয়। ঠাণ্ডা জল দিতে পারলে ভালো হত। কিন্তু ঠাণ্ডা জল পাবে কোথায়? পুকুরের জল তেতে আছে রোদে। পুকুরের কাছে গিয়ে কোনো লাভ নেই, তার চেয়ে পদ্মর কাছে যাওয়া ঢের ভালো। পদ্ম নামটায় বুঝি সুবাস ছড়িয়ে যায়, পাখনা নাড়িয়ে উড়ে আসে মৌমাছি। অবনীর চোখে বাড়তি একটা রঙ ধরে। নিজেকে সে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। তার যে এত দুঃখ আছে ভুলে যায় নিমেষে। পুরনো সব জ্বালা-যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে সে নতুন অবনী হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। সময় তো সব কিছু বদলে দেয়। মাত্র ক’বছরে কত কি পাল্টে গেল। আগে সে ধুতি ছাড়া পরত না। এখন খাকী প্যান্ট পরা একজন মানুষ। যার মাথায় কোঁকড়া চুল, হাসি ভরা মুখ। অদ্ভুত এক ছেলেমানুষী সারল্য। এই সারল্যটুকুই তার সম্পদ, মাধুর্য।
কঞ্চির বেড়া ঘেরা বাগানটা পেরিয়ে এলেই পদ্মর খড়ের ঘরখানা চোখে পড়ে। চালের উপর একটা কাক ডাকছে কা-কা। বড়ো বিশ্রী সেই আওয়াজ। একেবারে বিষিয়ে দিচ্ছে দুপুরের সরপড়া শান্ত পরিবেশ। আর থাকতে পারে না অবনী। রাগে গা রি-রি করে। পায়ের কাছ থেকে একটা মাটির ঢেলা তুলে নিয়ে তাক করে মারে কাক-এর উদ্দেশ্যে। এলোমেলো ঢিল খড়ের চাল ছাড়িয়ে লুটিয়ে পড়ে বহুদুরে। ঢিল গুঁড়ো হয়ে ধুলো উড়ছে। ওগুলো যেন ধুলো নয়, অবনীর হতাশা। আজ অব্দি কোনো কাজে সে সফল হল না। সব কাজে পিছু টান, হেরে যাওয়া।
পদ্ম খুঁটিবাঁশ ধরে খিলখিল করে হাসছে তাকে দেখে। হাসি নয় তো যেন জুইফুল ফুটেছে জ্যোৎস্নারাতে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সুগন্ধ। চোখ ভরে এ দৃশ্য দেখতে থাকে অবনী। দেখতে দেখতে সে ভাবে পদ্ম নয়-খুঁটি বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সরস্বতী। ঠোঁট নাড়িয়ে আদর করে বলছে, আসো, অনেকদিন পরে এলে! রোদ মাথায় এলে যে-বসো, বসো। কসার গ্লাসে জল এগিয়ে দেয় পদ্ম। মেঝেয় হা করে তাকিয়ে বসে আছে তার পাঁচ বছরের ছেলে রকেট। সারা গায়ে ছোপ ছোপ ময়লা। গায়ে কোন জামা নেই। এমন কি উদোম পেছন।
এদিকে কোনো খেয়াল নেই পদ্মর। সে পেটের ভাতের যোগাড় নিয়ে ব্যস্ত। না খাটলে চলবে কি করে? কেউ তো তার চাঁদমুখ দেখে পয়সা দেবে না। স্বামী খেদিয়ে দিয়েছে ঘর থেকে, নিজের দাদা-বৌদিরাও দেখে না, এ অবস্থায় তার চলবে কি করে? একার পেট তো নয় যে চালিয়ে নেবে। দু-দুটো পেট ভরানো কি মুখের কথা! পদ্ম ঘামছিল। ওর ড্যামা-ড্যামা চোখে বিস্ময়। হা-করে দেখছে অবনীকে। মনে মনে কি ভাবছে তা নিজেই জানে। দেশী মদ বেচতে গিয়ে তার আবার নেশা হল না তো! ঘোর কাটাতে ছেলের হাত ধরে বলল, যা কলপাড় থেকে চান করে আয়। আমি তোকে ভিজে ভাত আর পেঁয়াজ কেটে দেব।
ছেলেটা কি বুঝল খুশি হয়ে চলে গেল টিউবকলটার দিকে। কেউ না কেউ পাম্প করে দেবে জল। আহা, ছোটছেলে বলে কথা। পদ্মর সেসবে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সামান্য গলা চড়িয়ে সে বলল, দাঁড়িয়ে থাকবে, বসবে না চাকুরিয়া?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসব। বসার জন্য তো এসেছি। অবনী ঘোর কাটিয়ে বাঁশবাতার বেঞ্চিটায় গিয়ে বসল, পা নাচাতে নাচাতে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল সে, এদিকটায় অনেকদিন আসিনি। আজ যখন এসেছি, ভালো করে দাও, খাই
-খাবে? কাকে?
যেন হুঁশ ফিরল অবনীর, ভুল শুধরে বলল, প্রথমে এক গ্লাস। পরে পারলে আরো খাবো। আজ খাওয়ার মন নিয়ে এসেছি।
সে তো ভালো কথা। পদ্ম চোখ নাচিয়ে নদী হয়ে গেল, ভেসে যাবে, সাঁতার জানো তো? বৌদি যদি টের পায়, তাহলে তোমাকে আর ঘরে ঢুকতে দেবে না।
আমি আর ওসব নিয়ে ভাবি না। অবনী অসহিষ্ণু হয়ে উঠল, ঘর কাকে বলে জানো? ঘর না তো কবর। সারাদিন খালি ঘ্যানর ঘ্যানর, আমি আর পারি না। এর চেয়ে কাঁটার বনে। বাস করা ঢের ভালো।
বৌদি জানতে পারলে রাগ করবে। পদ্মর ভাটা পড়া গলা। তেতে উঠছে অবনী, কেউ রাগ করলে আমার করার কি আছে? যেমন কর্ম তেমন ফল। দাও দেরি করিয়ে দিও না।
