অবনীর সঙ্গে কেতোও এল ক’দিন। আসার পর থেকে ছেলেটা শুধু ভুগছে। জল-হাওয়ার পরিবর্তন মানিয়ে নিতে পারছে না। মানিয়ে নিতে সময় লাগে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, ছেলেটাকে খুব সাবধানে রেখো অবনী। জ্বর হলে ওর আর ছাড়তেই চায় না।
সরস্বতীও নিজের কানে শুনেছে সব। অবনীর উপর বিরক্ত হয়ে বলেছে, ছেলে যা বলবে তাই এনে দেবে! গোছ গোছ বরফ খেলে জ্বর না হয়ে যাবে কোথায়? এখানকার জল-বাতাস নতুন। চোখে চোখে না রাখলে বিপদ ঘটে যেতে কতক্ষণ।
শুভ একটু চঞ্চল প্রকৃতির। দামাল ছেলেকে সামলে রাখা সহজ নয়। এ বয়সে সব ছেলেরাই দুরন্ত হয়। এটাই স্বাভাবিক। ৩৪ সরস্বতী তার দোষ ধরবেই। কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে পারলে তার যে তৃপ্তি হয় তা বুঝি অন্য আর কোনো কিছুতে খুঁজে পায় না সে।
রাগে চিনচিন করে অবনীর শরীর। কিছুতেই নিজেকে সে ঝতে পারে না তার দোষটা কোথায়। দোষ যাই হোক, সরস্বতী তাকে উসকে দেবার জন্য মুখি আছে। এটা তার কেমন বিচার কিছুতেই বুঝতে পারে না এবনী। রাগে উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে অবনীর, কানের গহ্বরে অনায়াসে ঢুকে যাচ্ছে শিস-হাওয়া। খেজুরগাছের কাটা যেন বিধছে . .র ভেতর। কই এত যন্ত্রণা তো আগে ছিল না। আগে অভাব ছিল কিন্তু সামান্য হলেও শান্তি স্থল। এখন চষা জমির মতো এবড়ো-খেবড়ো মন দুজনার। যেন শত্রুশিবির, শত্রুপক্ষ। কাল নাইট ডিউটিটা ভালো যায়নি। বি-খাওয়া রোগী এসেছিল। বউয়ের উপর রাগ করে ব্যাটাছেলেটা পাটে দেওয়ার বিষ খেয়েছে। সাত তাড়াতাড়ি পাইপ ঢুকিয়ে বমি করাতে না পারলে লোকটা বাঁচত না। ঘরের সব লোক এসেছে হাসপাতালে কিন্তু যার আসার কথা সে আসেনি। বউটা গুম ধরে পড়ে আছে। ঘরে। সে কি ভাবছিল তা যেন স্পষ্ট অনুমান করতে পারে অবনী। বউটা কি তার স্বামীর মৃত্যু প্রার্থনা করেছে? সে কি মনে মনে কামনা করেছে লোকটা যেন আর ঘরে না ফিরে আসুক। সে শাঁখা ভেঙে, সিঁদুর তুলে বিধবা হয়ে বাঁচবে। একা বাঁচায় কি সুখ অনেক?
এসব ভাবনার সঠিক কোনো উত্তর অবনীর জানা নেই। সারা রাত ধরে যমে-মানুষের টানাটানিতে লোকটা শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেল। ধাতস্থ হতেই তাকে শুধিয়েছিল অবনী, মরতে যদি মন চায় তাহলে কড়া বিষতেল খেলে না কেন? এমন বিষ খেয়েছে যাতে নিজের কষ্ট আরও দ্বিগুণ হল। তোমার মতো বোকা মানুষ আমি আর দুটি দেখিনি। ডলি দিদিমণি কত বোঝাচ্ছিলেন লোকটাকে, সব কথা হয়ত বুঝতে পারেনি সে, তবু যে কটা শব্দ তার কানে গিয়েছিল তাতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল লোকটা, দিদিমণি গো, আমার বউ চায় না আমি বাঁচি।
বেঁচে গেলে, এবার কি হবে? দিদিমণির চোখের বিস্ময় জোড়া ঠোঁটে, মরে যাওয়া সহজ, কিন্তু সংঘর্ষ করে বেঁচে থাকা কঠিন।
আমি যে বউয়ের বিষকথা সহ্য করতে পারিনে। ও আমার মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কঁকড়াবিছার বিষে আমি পুড়ি গো। তখন আর বাঁচতে মন চায় না, মনে হয় মরে যাই।
বিষ খাওয়া রোগী এলে রাতভর দু’চোখের পাতা এক করতে পারে না অবনী। অন-ডিউটি দিদিমণিরও তাই অবস্থা। ওই অত রাতে কল-বুক পাঠিয়ে ডাক্তারবাবুকে কোয়ার্টার থেকে ডেকে আনতে হয় অবনীকে। সেরকম সিরিয়াস হলে খবর পাঠাতে হয় থানায়। পুলিশ আসে। চলে তদন্তের কাজ। মাঝরাত হয়ে ওঠে কোর্টচত্বর।
কাল রাতে এত সব হ্যাঁপায় যাননি ডাক্তারবাবু।
রুগীর চোখ দেখে বলেছিলেন, এখন থানায় মেমো দেওয়ার দরকার নেই। দেখি শেষ পর্যন্ত কী হয়। আমার মন বলছে ট্রিটমেন্টে সাড়া দেবে। এখনও চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়নি। নানান কাজের ফাঁক-ফোকরে একটুও দম নেবার ফুরসত পায়নি অবনী। যে রাতটা খারাপ যায় তার পরের দিনটাও ভালো যায় না। সকালে ঘরে কিছু কাজ থাকে। সেগুলো তাকে করতেই হয়। তার কাজ অন্য কারোর দ্বারা হবার নয়। সংসারের জন্য এত করেও তার কোনো নাম নেই। শুধু ওই একজন মহিলা, যাকে সে সিঁদুর পরিয়ে ঘরে তুলেছিল বউ হিসাবে, তার কাছে হেরে যেতে বাস্তবিক কষ্ট হয়। এ যে কী কষ্ট তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।
অনেকক্ষণ পরে চড়া রোদে অবনীর বুকের ভেতরটা ডুকরে উঠল। কপাল ভিজিয়ে ঘাম নামছিল দ্রুত। আর তাতেই অস্বস্তি বাড়ছিল অবনীর। মাথা হেঁট করে সে কদমগাছের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াল। হলুদ পাতা ছড়িয়ে আছে কদমতলায়, হাওয়ায় ফরফর করে উড়ছে সেই পাতা যেন কোনো হলুদ মাছ ডাঙায় লাফিয়ে পড়ে ছড়ছড় করছে। টালি কারখানার পোড়ের কাঠ ছড়িয়ে আছে ইতস্তত। একটা বড়ো গাছের কাটা গুঁড়ির উপর গিয়ে বসল অবনী। এখান থেকে। হাসপাতালের মাঠ, কোয়ার্টার, মড়ার-ঘর সব দেখা যায়। এখানে বসে থাকা নিরাপদ নয় ভাবল সে। কেন না সরস্বতীর কানে সংবাদটা কেউ পৌঁছে দিলে মায়ের হাত ধরে শুভ এখানে আসবেই। আসবে। সরস্বতী রাগের ঘোরে কারোর কথা শুনবে না। গলা ফাড়িয়ে গালমন্দ করবে, প্রয়োজন হলে সে ডাক্তারবাবুর বাসায় গিয়ে নালিশ জানিয়ে আসবে অবনীর নামে।
ঘাম শুকিয়ে আর সময় ব্যয় করল না অবনী। তবে সে বাজারের দিকে গেল না এত বেলায়। পাল-পুকুরের পাড় ধরে সে চলে গেল সোজা দাসপাড়ায়। এমন হতছিন্ন জনবসতি যা দেখে। প্রতিবারই মন খারাপ হয়ে যায় অবনীর। দাসপাড়ায় এসে তার নিজের গ্রাম নানকাহাতিদার কথা মনে পড়ে। রাজ্যের অভাব বুঝি তাদের ছোট্ট গ্রামটাতে। বর্ষার সময় পুরুষমানুষরা মুনিষ খাটতে যায়। অন্যসময় হাতে কাজ থাকে না, অভাব খুবলে খায় বেকার মন। সময় আর পেরতে চায় না, কঠিন পাথরের মতো চেপে বসে বুকের উপর। চেনা মানুষগুলোর মুখ মনে পড়ে অবনীর। বিশেষ করে ব্যাঙা আর সঁপড়ির কথা সে ভুলতে পারে না। ওদের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু তার মতো সামান্য মানুষের কী বা করার আছে অন্যের জন্য। তবু সে ডাক্তারবাবুকে বলেছে হাসপাতালে ব্যাঙার একটা চাকরি করিয়ে দেবার জন্য। ডাক্তারবাবু মুচকি হেসেছেন। অবনীর সরলতা মুগ্ধ করেছে তাকে।
