হার-জিত বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা হল সুখ।
অবনীর খাঁকি প্যান্টের ফুপি বেরনো সুতোগুলো উড়ছে শীতের হাওয়ায। এক কাপ চা না পাওয়ার দুঃখ ভীষণভাবে বুকে বিঁধছে। কী এমন রাজকাজে ব্যস্ত ছিল যারজন্য এক কাপ চা করে দেওয়া যেত না। আসলে সরস্বতী ভালোবাসে না তাকে। অবজ্ঞা, অবহেলা যতদিন যাচ্ছে গাঢ় হচ্ছে তার মনে। ঘা-মন নিয়ে অবনী একা একা আর কত পথ হাঁটবে। এ জীবনের প্রতি ঘেন্না ধরে গেছে তার। মাঝে মধ্যে মনে হয় সংসার ছেড়ে দিয়ে কোথাও চলে যেতে। তখন সরস্বতী বুঝবে কত ধানে কত চাল হয়।
হাসপাতালের মাঠে দল বেঁধে চরছিল গোর। প্রতি বছর শীতের সময় মাঠের ঘাস বিক্রি করে দেন ডাক্তারবাবু। গোরু চরানোর জন্য এত বড়ো সবুজ মাঠ আর এ গাঁয়ে কোথাও নেই। এবারের ঘাসমাঠ কিনে নিয়েছে পাল-কোম্পানীর মালিক, ওদের হড়েগড়ে খানত্রিশেক গোরু।
খুব দ্রুত অবনী হাসপাতালের মাঠ পেরিয়ে এল। রাগ কেটে কুচিকুচি করতে চাইছে মনের মাংস। চোখের সাদা জমি লাল হয়ে উঠছে উত্তেজনায়। ফলে ঘামের বিন্দুগুলো মাছের ডিমের চেয়ে বড়ো হয়ে মিহিদানার মতো ফুটে উঠছে শরীরে। তার কেন এমন হয়? কেন সে মানিয়ে নিতে পারছে না সরস্বতীকে? এক হাতে কি তালি বাজে? কখনও নয়। দোষী তাহলে সে একা নয়? ঝগড়ার কলকাঠি নাড়ছে বউটা। বিয়ের পর থেকে একদিনও সে ভালোভাবে কথা বলেনি। তার প্রতিটি শব্দে থাকে কাঠ-পিঁপড়ের জ্বলন। বিষমাখা দৃষ্টিতে থাকে বর্শার খোঁচা। এত সব অগ্রাহ্য করে জীবনকে বয়ে নিয়ে যাওয়া বড়ো কষ্টের। এই কষ্টের কথা কি কোনোদিনও বুঝবে সরস্বতী? তাহলে কি চায় সে? ভাবতে ভাবতে হাঁপিয়ে ওঠে অবনী।
এ যেন এক কঠিন অঙ্ক। কিছুতেই উত্তর মিলতে চায় না। ঝুরঝুর করে ঝরে যাচ্ছে বিশ্বাসের মাটি। রগরগে বালি আঁকড়ে জীবনযাপনের চাষ-আবাদ হবে কী ভাবে। এক সময় অবনীর মনে হয় এই চেনা মাঠ মাটি গাছপালা কোনোকিছুই তার নিজের নয়। এমন কি শুভ সরস্বতী কেউ নয়।
লম্বা লম্বা পা ফেলে সে যেন পালিয়ে আসতে চাইল তার চেনা পৃথিবী ছেড়ে। চা-দোকানের কানু তার ঘাবড়ে যাওয়া চোখ-মুখ দেখে বলল, অবনীদা বসো। কোথা থেকে এলে গো? মনে হচ্ছে খুব চিন্তায় আছে।
অবনী কিছু না বলে নিরুত্তাপ চোখে তাকাল। হাঁপিয়ে ওঠা শরীরটাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল সে, এ পৃথিবীটা বড়ো কঠিন জায়গা ভাই। গায়ের রক্ত দিলেও কারোর তুমি মন পাবে না।
-তা যা বলেচ। কানু মন বোঝার চেষ্টা করল অবনীর, চা বানাই।
–হ্যাঁ, কড়া করে বানাও।
টাটকা পাউরুটি আছে। সেঁকে দেব?
খিদেটা অনেকক্ষণ ধরে জানান দিচ্ছিল পেটে, অবনী ঘাড় নাড়তেই গোটা পাউরুটি আধফালা করে সেঁকতে বসে গেল কানু। সামান্য জিরিয়ে নিয়ে একটা বিড়ি ধরাল অবনী। ফসফস করে ধোঁয়া ছেড়ে সে ভাবল, আজ আর ঘরে ফিরে যাবে না। যে ঘরে কোনো টান নেই সে ঘর তো শুধু চুন-সুরকির ঘর। ছাদ একটা। মন হাজারটা। এরকম তো চলতে পারে না। যা হবার আজ ফায়সাল্লা হয়ে যাক।
বিড়িটা যেন খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল।
হতাশ গলায় অবনী বলল, চা-টা তাড়াতাড়ি দাও। বাজারের দিকে যাব ভাবছি। অনেক কাজ পড়ে আছে।
কানু কাচের গ্লাসে তাড়াতাড়ি চামচ দিয়ে চিনি গুলে কড়া লিকার দিয়ে ধরিয়ে দিল অবনীর হাতে, নাও অবনীদা, দেখ সব ঠিকঠাক আছে কিনা!
গ্লাসে চুমুক দিয়ে অবনী বলল, পাউরুটি দাও। চায়ে ডুবিয়ে খাই। আজ যে কখন ভাত জুটবে কে জানে!
কোনোদিনও সময়মতো ভাত জোটে না অবনীর। প্রতিদিন কোনো না কোনো অশান্তি তার নাওয়া-খাওয়া ভেস্তে দেয়। বিষণ্ণ মনে সে তখন পাগলের মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। কোনোকিছু ভালো লাগে না। ভালো কথাও তেতো মনে হয়।
চা-পাউরুটির দাম মিটিয়ে অবনী আর সময় ব্যয় করল না। আজ সরস্বতীকে উচিত শিক্ষা দেবে। রোজকার ঝামেলা আজ সে মিটিয়ে নেবে। যদি না পারে সিধা চলে যাবে রঘুনাথদের দোরে। ওখানে দিনদুয়েক কাটিয়ে সে অন্য কোথাও চলে যাবে।
পাকা রাস্তায় উঠে এসে অবনী একবার বাজারের দিকে তাকাল। ভরা দুপুর খাঁ-খাঁ করে গরম শ্বাস ছাড়ছে। এসময় শুভ কোথায় আছে ভাববার চেষ্টা করল সে। পরপর তিন দিন তার স্কুল ছুটি। ছেলেটা এখন তিন দিনের রাজা। এই মায়ের জন্য একসময় সে কান্নাকাটি করত। মায়ের কথা ভেবে-ভেবে বড্ড রোগা হয়ে যাচ্ছিল ছেলেটা। ওর মামা গড়ার একদম মত ছিল না শুভ নদীয়ায় যাক। সেই মতো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল তাকে। কিন্তু শুভই বাধ সাধল এ সবে। তেলবুড়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, যার ছেলে তার কাছে দিয়ে আয়। এক গাছের ছাল আরেক গাছে লাগে না।
কথাটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি পার্বতী। শুভ আর কেতোর মধ্যে সে কোনো ফারাক দেখে না। তবু একরকম বাধ্য হয়ে সেজ-কর্তাকে চিঠি লিখতে হয়েছিল তাকে। চিঠি পেয়েই দেশ গিয়েছিল অবনী। সরস্বতীই তাকে জোর করে পাঠাল।
-আমি জানতাম ও ছেলে থাকবার নয়। দেখতে হবে তো কার ছেলে?
খোঁচাটা অবনীকে উদ্দেশ্য করে। এ কথায় ঝগড়া বাঁধতে পারত, আগুন জ্বলতে পারত তবু অবনী সব কিছুকে নিভিয়ে দিয়েছে তার সহজাত সহ্য ক্ষমতায়। নিজের ছেলেকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করা ভালো। দুরে থাকলে হাজার চিন্তার ডালপালা ক্ষত-বিক্ষত করে সহজ-সরল মন।
