তারও উপায় আছে। শুভ হাসল, তখন রাতে পায়রার মাংস খাবো। তবে একটা কথা কি জানিস? পিসি পায়রার মাংস খায় না–সেইজন্য তাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে না।
এছাড়া আর উপায় কি বল? সবুজ কনুই দিয়ে ঠেলা মারল শুভকে, ফিসফিসিয়ে বলল, একটা ছোট টর্চ লাইট থাকলে ভালো হত। পায়রাগুলো লাইট ফেলে দেখে নেওয়া যেত। তখন আর অন্ধকারে পাগলের মতো হাতড়ে বেড়াতে হত না। সবুজ বলল, টর্চ যখন নেই তখন আর চিন্তা করে কী হবে? চল তো আগে চেষ্টা করি। ধরতে পারলে ভালো, না ধরতে পারলেও কোনো ক্ষতি নেই।
মড়িঘরের ঘুপচিগুলোয় বাসা বেঁধেছে পায়রা। ওরা সকাল-সন্ধেয় ওখানে বম বম সুর তোলে। তবে ওখানে যে সাপ থাকে এ বিষয়ে সে নিশ্চিত। মড়িঘরের ফণা তোলা সাপের কথা সে বাবার কাছ থেকে শুনেছে। সেই গল্পকথা সবুজও জানে। ভয় যে করছে না তা নয়। তবু ভয়কে জয় করে এগোতে হয়। নাহলে শুধু হার-ই হার। কেন হারবে সে, কেন?
অন্ধকারে ডুবে আছে চারপাশ। দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশবনের শনশন শব্দ। এই অন্ধকার বুঝি সব কিছু গিলে খাবে। ভয়ে ভয়ে ঢোঁক গিলে কাঠচোখে তাকিয়ে থাকল শুভ। রঘুর কাছে তার অনেক কিছু শেখার আছে।
মড়িঘর ছাড়িয়ে এলে ঘাসে ভরা মাঠ।
সবুজের মতিগতি বুঝতে পারল না শুভ। শুধু বিস্ময়ে মুখ ফাঁক করে বলল, পায়রা ধরবি না? তাহলে এত দূর যে এলি
–মন চাইছে না। চল ফিরি।
–তোর আবার কী হল? সবুজ শুধোল, ভয় করছে বুঝি? দুর, ভয় আবার কিসের! আমি ভূত-প্রেত মানি না।
-আমিও। কেমন আত্মপ্রত্যয়ী চোখে তাকাল শুভ। এক কঠিন প্রতিজ্ঞা তার চোখের তারায়। রঘুনাথকে মনে হল এই ঘাসে ভরা সহিষ্ণু মাঠ। অন্ধকার, আললা, ঝড়, বৃষ্টি, খরা-বন্যা… সব তার কাছে এক। এই ঘাসমাঠ বুঝি হারতে শেখেনি। আহা, সবাই মাড়িয়ে দিয়ে চলে যায়, আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় ঘাসের সংসার।
কুচকুচে অন্ধকারে শুভ দেখল অদ্ভুত এক দৃশ্য। অন্ধকার ছাপিয়ে পাশাপাশি ফুটে থাকা ঘাসফুলগুলো হাসছে। ঘাসফুলের আলোয় আবার নতুন করে জেগে উঠছে পৃথিবী। চিকচিকিয়ে উঠছে শুভর চোখের তারা। ওই ফুলগুলোর মতো আলো ছড়িয়ে দিতে চায় সে, অন্ধকারে, টুটি টিপে সে প্রকাশ্যে বের করে আনতে চায় আলোর ভোর। ঘাসফুলের হাসি।
.
৩৮.
মানুষের স্বভাব হল নদীর মতো বদলে যাওয়া।
অবনী সরস্বতীর মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবল কথাগুলো। খুব দ্রুত নিজেকে বদলে ফেলেছে সরস্বতী। সে এখন বাবুদের বউগুলোর সঙ্গে নিজের তুলনা টেনে আনে। গাঁয়ের হংসী স্বভাব, লাজুক ভাবখানা তার মধ্যে এখন আর নেই। এখানে আসার পর অনেকটাই বদলে গেছে সে। সেই পাল্টে যাওয়াটা আজ বেশি করে চোখে পড়ছে অবনীর।
শুধু কি সরস্বতী বদলে গেছে, সে বদলায় নি? প্রশ্নটা মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে অনবরত। বামুনবুড়ির ছেলে বিমল ডাক্তার না থাকলে তার আজ এখানে আসা হত না। মানুষ বান-বন্যার জলের মতো। কোথাও এক ছটাক জল রেখে যায় কারোর জন্য। সেই জলটুকুই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কিংবা মমতা। কেউ তাকে যদি আশ্রয় বলে তাতে ভুল কি। যদিও ভুলে ভরা এই জীবন। তবু জীবন ঘুরঘুর করে ভুলের চারধারে। এক কাপ চায়ের আব্দার করা কি ভুল হয়েছে অবনীর? হাজারবার প্রশ্ন করেও বুঝতে পারে না সে। তবু দাঁত মুখ বিকৃত করে ঝাঁঝিয়ে ওঠে সরস্বতী, দুপুরবেলায় চা করে দিতে পারব না। চা খেতে মন চায় তো হাসপাতালের গেটে চলে যাও। এখনও দোকান খোলা আছে।
আশাহত অবনী নিরুত্তর চোখে তাকাল। এক কাপ চায়ের ভাগ্য করে সে আসেনি। সরস্বতীর কঠোর শাসন মাঝে মাঝে তার অসহ্য লাগে, তবু বোবা হয়ে থাকতে হয় নাহলে অশান্তির আগুন দাউদাউ জ্বলে উঠবে সংসারে। বোকার মতো দুদণ্ড সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে থেকে গা-হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল অবনী। শীতের বেলা ছাগল বাঁধার দড়ির চেয়েও ছোট হয়।
এ সময় হাওয়ায় থাকে ক্ষুর। সারা শরীর বাতাস চাটতে থাকে তার খসখসে জিভ দিয়ে। তেল না মাখলে গায়ের খড়ি ফোঁটা চিহ্নগুলো আর মুছতে চায় না। ঘর থেকে বেরিয়ে অবনী ভাবল শীতকালটা কেন আসে। ওটা না এলেই বুঝি ভালো হত। রোদ ঢালছে পৃথিবী তবু শীত হাওয়া এর মধ্যে চালের কাকরের মতো লুকিয়ে থাকে। চা দেয়নি বলে সরস্বতীর উপর রাগে গজগজ করে সে। বউটা নিজেকে যে কী ভাবে কে জানে। একটু দেখতে ভালো-এর জন্য দেমাকে বুঝি পা পড়ে না। হাসপাতালের অনেকেই চোখ নাচিয়ে বলে, অবনীর বউ ভাগ্য ভালো। তবে বউটা বড়ো মুখরা। ভালো কি মন্দ’ হাড়ে হাড়ে তা এখন টের পাচ্ছে অবনী। এর চাইতে বিয়ে না হলেই বুঝি ভালো হত। ভাগ্য চিরকাল তার সঙ্গে শত্রুতা করেছে। কখনও হাত ধরে বলেনি, মন খারাপ করো না, আমি তোমার সঙ্গে আছি।
কেউ সঙ্গে থাকে না, সঙ্গ ছেড়ে যায় পুরনো পলেস্তারা খসে যাওয়ার মতো। যে যেদিকে যায় যাক। আর কারোর কাছে হারবে না সে। প্রথমপক্ষ কুমকুম গত হল, সেই দুঃখ কি এখনও বুকে বেঁধে না তার! কদিনেরই বা জীবন তবু অনেক কিছু দিয়ে গেছে সে। তার ঋণ এ জীবনে শোধ করা যাবে না। দাউদপুরের কথা মনে পড়লেই কুমকুমের হাসি মুখটা মনে পড়বেই। মনের আর কী দোষ। মন তো হাওয়ার বেগে দৌড়োয়। সরস্বতী কি এসব অভিসন্ধির কথা টের পায়? কুমকুমের কথা সে বিয়ের পরে শুনেছে। সব জেনেশুনে বিয়ের পিড়িতে বসেছে সে। এখন পোকা চেবানোর মতো মুখ করলে কেউ তাকে সমবেদনা জানাতে আসবে না। বরং লোকে বলবে, সরস্বতী, তুমি ভাগ্যবতী। চাকরি করা বর পেয়েছ–এ যুগে কটা মেয়ের ভাগ্যে এমন সুখ জোটে বলো। ওর দিদিও সেই একই কথা বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের যত্ন নে, না হলে পরে কাঁদবি। সংসারে সঙ সাজ ক্ষতি নেই, কিন্তু সাজতে গিয়ে নিজের আসল রূপটাই ভুলে যাবি তা যেন না হয়। অবনীর মতো ছেলে হয় না, একথা আমি দশজনের মাঝে জোর গলায় বলতে পারি। তুই ঠকে যাসনি, তোর জিতই হয়েছে।
