গিয়াস তার মুখে হাত চাপা দেয়, রাগে-উত্তেজনায় গরম বাষ্প বেরয় নাক-মুখ দিয়ে, নাফিজার ভরন্ত বুকের উপর ঝুঁকে হা করে দেখতে থাকে নাফিজাকে, মানুষ কত বদলে যায় গো। আজ শীতকাল তো পরশু বসন্তকাল। চোখের ছিমুতে কত কী যে দেখলাম। পুরুষের গাঢ় দীর্ঘশ্বাস নারীর বুক কাঁপিয়ে দেয় সহসা। শুধু বুক কাঁপে না, শরীরের জমিও কাঁপে। জোয়ার আসা খালের মতো নাফিজা ভিজিয়ে দিতে চায় গিয়াসকে। কাঁপা কাঁপা স্বরে সে আউড়ায়, গাছি জিরেনকাট রসের কারবারি। গাছে নলি না গুঁজে দিলে টাটকা রস যে ঠিলিতে পড়ে গাছের শরীল ভিজিয়ে দেবে।
সতর্ক গিয়াসের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়, বিড়ি ছোপ ধরা দাঁত দিয়ে সে ঠোঁট বুক থাই…. এমনকি সারা শরীর কামড়াতে থাকে জলাতঙ্ক রুগীর মতো। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকা নদীর মতো বাক্যহীন পড়ে থাকে নাফিজা। দাঁড় বেয়ে জল কেটে শরীরের নদীতে নৌকো ভাসায় গিয়াস। নাফিজা পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুঁড়ে দেয় ঘরের মাটি। হাত-পা এলিয়ে সে যখন কামারশালায় ক্লান্ত হাঁপর তখন গিয়াস তার ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল হাতের চেটোয় মুছে নিয়ে শুধায়, এট্টা সত্যি কথা বলবে, আমার কী নেই যা মকবুলের আচে?
আকাশ থেকে পড়ে নাফিজা। দম ধরে থাকে। কাপড় সরে যাওয়া পিঠের ঘামে বিশ্বাসের মাটি উঠে আসে। বিষণ্ণ ঝিঁঝি পোকার মতো সে বলল, সন্দেহ রোগটা একবার যদি মনে ঢোকে তাহলে হাজার কবিরাজেরও সাধ্যি নেই–সেই শেকড়কে তুলে হিঁচড়ে বের করে আনে। মনে যা এসেছে, তা ঠিক নয়। ওসব মুছে ফেল।
মন তো সিলেট নয় যে জল-তেলায় মুছে দেব। লাল চোখ মেলে তাকাল গিয়াস, গাঁ-ঘরের লোক যা বলে সব কি মিছা? আমার কাচা খোকাটার গায়ে হাত দিয়ে কিরা কাটো তো? অপ্রস্তুত নাফিজা দ্বিধা দ্বন্দ্বের মায়াবী পথে উদাসীন ঘোরে। কাঁচা খোকার মাথায় হাত দিয়ে কিরা’ কাটা কি ঠিক হবে। ছেলেটা জন্মাবার পর থেকে ভুগছে। একদিন ভালো থাকে তো দশ দিন ভোগে। হাতটা কাঁচা খোকার দিকে নিয়ে যেতে গেলে তীব্র গতিতে নাফিজার হাতটাকে সরিয়ে দেয় গিয়াস, দোজকের কীট, তা না হলে কেউ ঝুটমুট পেটে ধরা ছেলের মাথায় হাত দেয়। বুঝেছি, আমি সব বুঝেছি। তুমার সারা শরীলে যে মকবুলের ঘ্রাণ সেটা আমি আগেই টের পেয়েছি। আজ একেবারে নিশ্চিত হলাম।
নাফিজা ফুঁপিয়ে ওঠে।
গিয়াস একটা বিড়ি ধরিয়ে লুঙ্গিতে গিট মেরে বেরিয়ে আসে বাইরে, নিজেকে না শুধরালে মরবে গো। আমার কি! আমি তো তিনবার তালাক বলে দিয়ে পিছুপানে আর তাকাব না। নাফিজার কথা বলার ক্ষমতা নেই, সে শুকনো গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। বেড়া থেকে সাইকেলটা টেনে নিয়ে গিয়াস ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে ধুলোর পথে নেমে আসে। ধুলোর ঝড় তার বুকের তুফানকে সামাল দিতে পারে না।
পেট-পাতলা নাফিজা ছেলে কাঁখে নিয়ে হাটের দিকে চলে যায় মকবুলকে খবর দিতে। ঘরের মানুষটা সব জেনে গিয়েছে, তাকে আর শরীরের নাড়ু দেখিয়ে ভুলিয়ে রাখা যাবে না। পাগলা ষাঁড় কখন যে কি করে বোঝা যায় না তো! চোট খাওয়া পুরুষ তো দাওলি দিয়ে কোপ মারা ষাঁড়ের মতো। মকবুলকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভীতু ডাহুকির মতো কেঁপে ওঠে নাফিজা, আমার বেপদ ঘটে গেছে গো! হাঁড়ি ফুটা করে সে ভাতে ধুলো মাখিয়ে চলে গেল গো। এখন আমার কি হবে?
কি আর হবে? মকবুল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তুমি যা চাও তাই হবে। যদি বলল-পাগলা যাঁড়কে খোয়াড়ে ঢোকাতে হবে–সেই ব্যবস্থাও আমি করে দেব। আমার সবরকম ওষুধ-মলম জানা আচে।
-যা ভালো বোঝ কর। নাফিজা আঁচলে চোখের জল মুছে নিল, আমি দুকুল চাই। আমি চাই–দুজন আমাকে বাঁধ দিক। সুখ দিক। ওর ভিটে ছেড়ে আমি কুতায় যাবো গো। সারা গাঁয়ে যে টি-টি পড়ে যাবে।
সে তুমাকে ভাবতে হবে না। আমি লোগ বুঝে ওষুধ দেব। মকবুল চুরুক দাড়িতে হাত বুলিয়ে হাসি ছুঁড়ে দিল নাফিজার দিকে, ঘর যাও। খাওয়া-দাওয়া কর। রাতে কবাটটা খুলে রেখো। আমি আসব। হিসাব যা হবার তখনই হবে। নাফিজার গালে টুসকি মেরে মকবুল সিগারেট ধরিয়ে চলে গেল।
রঘুনাথকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে এল শুভ আর সবুজ। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পাশাপাশি হাঁটছিল ওরা। শুধু ঝি ঝি পোকার ডাক ছাড়া এখন আর কিছু শোনা যায় না চরাচরে। হাসপাতালটাও ডুবে আছে অন্ধকারে, ওর আবছা চেহারাটা দূর থেকে শুধু অনুমান করা যায়। গ্রামের হাসপাতাল, রাত ন’টার পরে যেন আর বসতে পারে না, অপেক্ষায় ঝাঁপ বন্ধ করে তুলতে থাকে।
সবুজ বলল, মড়িঘরের রাস্তাটা ধরে গেলে ভালো হবে। বরাত ভালো থাকলে দু-চারটে গোলাপায়রা ধরা যাবে। এবছর তো আর ফিস্ট হল না!
-এখনও সময় পেরিয়ে যায় নি। শুভ অন্ধকারে সবুজের মুখের দিকে তাকাল, গোলা-পায়রা ধরতে পারলে ভালো হবে। কাল তাহলে তুই-আমি ফিস্ট করে খাবো।
মড়িঘরে জ্ঞানত কোনোদিন মড়া থেকেছে একথা মনে করতে পারল না শুভ। তবু ঐ ঘরটার দিকে তাকালে বুকটা কেমন ভয়ে মোচড় দিয়ে ওঠে। হাসপাতালের একেবারে শেষপ্রান্তে ঘরটার যে কী প্রয়োজন এখনও তা ভালোভাবে জানে না শুভ। তবে মড়িঘরের পেছনে ময়লা-আবর্জনা, নোংরা গজ-ব্যাণ্ডেজ তুলো ফেলে অবনী। ওগুলো যাতে হাওয়ায় উড়ে গিয়ে মাঠ নষ্ট না করে তার জন্য মাঝে মধ্যেই দেশলাই জ্বেলে আগুন ধরিয়ে দেয় সে। সেই বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ধারে-কাছে কাউকেই যেতে দেয় না সে। পাশেই কোদাল দিয়ে গর্ত করেছে অবনী। পোড় ছাই সেই গর্তে ফেলে দিয়ে দায়িত্ব সারে সে। মড়িঘড়ের চারপাশটা ঘন জঙ্গলে ভরা। এখনও মাঝে মধ্যে গভীর রাতে শেয়ালের ডাক শোনা যায়, আর তখনি ভয়ে পাশ ফিরে শোয় শুভ। মনে মনে সে ভাবে মড়িঘরটা না থাকলে ভীষণ ভালো হত। ভয় বলে কোনো জিনিস থাকত না তার মনে। তবে একটা অসুবিধা হত। গোলাপায়রা কোথায় পেত তখন? পায়রাদের সাহস কি মানুষের চেয়ে বেশি? তা না হলে ওরা মড়িঘরে থাকতে ভয় পায় না কেন? ওরা দল বেঁধে থাকে–সেজন্যই বুঝি ভয়ডর ওদের শরীরে কম। তাছাড়া ওরা শুধুমুধু ভয় পাবে কেন, ওদের ডানায় তো আকাশ ছোঁয়ায় ক্ষমতা আছে। ভূত-পেত্নী যাই আসুক ওরা ডানা ঝাঁপটিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে নিতে পারবে। মানুষের সেই ক্ষমতা কোথায়? শুভ ভাবল। সবুজ বলল, পায়রার মাংস কী ভীষণ লাল। একেবারে জবাফুলের মতো। সেবার অতসীপিসি মাংস বেঁধে দিয়েছিল। ভারী চমৎকার সেই রান্না। এখনও মনে পড়লে জিভে জল চলে আসে। ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল সবুজ, আজ যদি দুটো পায়রা ধরতে পারি তাহলে কাল সারা দিনটা আনন্দ করা যাবে। অতসীপিসির কি ডিউটি থাকবে কে জানে। মর্নিং ডিউটি থাকলে রান্না করে দেবার সময় পাবে না।
