–তাহলে ফি-বছর গিয়াস-ই গাছ ঝুরবে? আমরা কি তাহলে আঙুল চুষব, ডাক্তারবাবু? মকবুলের চোখের তারায় আগুন ঠিকরায়, ঠিক আছে, আমিও দেখে নেব। আপনি গাছ না দিলে কী হবে, খোদাই আমাকে গাছ পাইয়ে দেবে। সবুর করুন, নিজের চোখে সব দেখতে পাবেন।
নতুন কলসী কিনে গাছে বেঁধেছিল গিয়াস। সাতদিনের মাথায় কলসী সব ভেঙে খোলামকুচি বানিয়ে দিল কেউ। গিয়াস সেই দুঃখ ভুলতে পারেনি, হাউ হাউ করে কেঁদেছে। হাসপাতালে সেদিন ছেলে কাঁখে করে ওষুধ আনতে এসেছিল–তার বিবি নাফিজা। মানুষটার কান্না দেখে সেও কাঁদল গলা ফাড়িয়ে। সেদিন পাশে দাঁড়িয়ে মকবুল দেখছিল সব প্যাটপেটিয়ে। অবশেষে সান্তনা দিয়ে বলেছিল, আজকাল মানুষের চেয়ে পোকামাকড়ের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের মন সব পাথর হয়ে গিয়েছে। নাহলে লোতুন ঠিলিগুলো কেউ ওভাবে ভাঙতে পারে? আমি যদি জানতে পারি কে ভেঙেছে, আল্লা- কসম আমি তার ঠ্যাং ভেঙে রোদে শুকাতে দেব। মকবুলের এই আস্ফালন ভালো চোখে নেয়নি গিয়াস। লোকে যে বলে চোরের মায়ের বড়ো গলা–এক্ষেত্রে সেই হিসাব বুঝি কড়ায় গণ্ডায় মিলে যায়। মানুষকে বিশ্বাস করে এত পথ হেঁটেছে গিয়াস। অবিশ্বাস তার জীবনধারায় খুবই কম।
নানাকারণে মকবুলকে তার অবিশ্বাস করতে মন চাইল। চোখে মুখে যে মানুষটি মিথ্যা কথা বলে তার ছায়া মাড়ানোও উচিত নয়। গাঁয়ে ঘরে বদ মানুষ হিসাবে মকবুলের দুর্নাম আছে। হাসপাতালের গাছগুলোকে দখল নেবার জন্য সে সবরকম চেষ্টা করেছিল। ব্যর্থ হতেই বেড়ে যায় তার প্রতিহিংসা। গিয়াসকে সে বেইজ্জত না করে ছাড়বে না। তাতে যা হয় হোক। অতি সন্তর্পণে সে গিয়াসের বুকে থাবা মারার জন্য এগোচ্ছে। তার নিখুঁত অভিনয় সবাই বুঝতে পারে না সহজে।
গিয়াসকে কব্জা করতে না পেরে নাফিজার সঙ্গে গায়ে গা মিলিয়ে মিশতে চাইছে মকবুল। নাফিজাকে হাত করতে পারলে মকবুলের অভিযান অনেকটাই সফল হবে।
গ্রামের মেয়ে নাফিজা মকবুলের চোখা কথায় মজেছে। ছেলেকে আড়ালে দুধ ধরিয়ে দিয়ে নাফিজা লাজুক চোখে চেয়ে থাকে মকবুলের দিকে। লুঙ্গি ছেড়ে প্যান্ট-জামা পরলে মকবুলের বয়স অর্ধেক কমে যায়। গোঁফ-দাড়ি কামালে সে যেন এ গাঁয়ের নবাব। নাফিজা তাকে দুধ-চা বানিয়ে দেয়। দাওয়ায় বসতে বলে। মকবুল মিঠে মিঠে কথায় তার মন ভেজানোর চেষ্টা করে, একা থাকার দুঃখটা আমি বুঝি গো ভাবী। কি করবে, উপায় তো নেই।
নাফিজা চুপ করে থাকলে, আনমনে একটা সিগারেট ধরায় মকবুল, গলগলিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, না খাটলে বিড়ি-সিগারেটের পয়সাই উঠবেনি। এই আমার কথা ধরো। দিনরাত সাইকেল নিয়ে ঘুরছি টো-টো করে, দুটো পয়সার জন্য। কোনোদিন ব্যবসা জমে, কোনোদিন আবার জমে না। যাইহোক না কেন বেরতে তো হয় ঘর ছেড়ে।
নাফিজা ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।
মকবুল উৎসাহিত হয়, যতদিন এই হাত দুটো আছে ততদিন পেটের ভাতের চিন্তা করি না আমি। গিয়াসভাই যে বিদ্যা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে সেই বিদ্যা দিয়ে আমি সারা জীবন ভাত-কাপড়ের যোগাড় করে নেব। জানলে ভাবী, একটা মেয়েমানুষকে পটানো সহজ কিন্তু কাটা বোঝাই খেজুরগাছ থেকে মিঠা রস বের করা অত সহজ কথা নয়। গিয়াস ভাই খোদার আপন-বান্দা। তাই তার হাতের ছোঁয়ায় খেজুরগাছে রস বেশি ছুঁয়ায়। মকবুলের মন পটানো কথায় ভালো লাগার তিরতিরে তে নাফিজার মনের উঠোন ভিজিয়ে সেখানে ভালোবাসার বীজ বপন করে দেয়। গিয়াসের অনুপস্থিতিতে মকবুল হয়ে ওঠে তার অন্তরঙ্গ-জন।
যা রটে তা কিছু না কিছু বটে। খবরটা গিয়াসের কানে গিয়েছিল। ঝিমিয়ে যাওয়া গিয়াস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল নাফিজাকে। বউটার পরিবর্তন এসেছে কথাবার্তায়, চোখেমুখে। মিথ্যার আশ্রয় নিতে শিখেছে সে।
গিয়াস বুদ্ধি খাটিয়ে বলল, আমি তুমাকে সিখানে লিতে এয়েচি, চলো। সিথায় আমার বড়ো ঝামেলা। সময়মত দানাপানি জোটে না। তুমি গেলে দুটা চাল ফুটিয়ে দিতে পারবে। আমার কাজে হাত লাগাতে পারবে।
–তা তো বটে! নাফিজার শুকনো হাসি, কিন্তু সিখানে যে যাবো–আমার এই ঘর সনসার কে দেখবে? দু-চারটা হাঁস-মুরগি পুষেছি, তারা আন্ডা দেয়। আমি গেলে পরে তাদের কে দেখভাল করবে।
-ও নিয়ে ভেবো না, ওগুলা জবাই করে খেয়ে লিবো। গিয়াস কথাগুলো বলে নাফিজার অস্বস্তিভরা মুখের দিকে তাকাল। নাফিজা উদ্ধার পাবার জন্য বলল, কঁখের ছেলেটারে কে দেখবে। হাসপাতালে সাতজাতের মড়া এক হয়। বাতাসে জিন-পরী ঘোরে। সিখানে বদ-হাওয়ার ছড়াছড়ি। বাছার আমার গায়ে যদি কু-বাতাস লাগে
বিরক্ত হল গিয়াস, যদির কথা নদীতে ফেলে দাও।
-তুমার কি হয়েছে বলদিনি?
-কিছু হয় নাই। তুমাকে আমার সাথে যেতে হবে। আমার মাথার ঠিক নাই। বেশি কথা কইতে পারবোনি। খপখপ তৈয়ার হয়ে নাও। গিয়াস নাফিজার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে যায় মাটির ঘরের ভেতরে। চ্যাংদোলা করে শুইয়ে দেয় মেঝেয়। আবছা
আলো আঁধারিতে নাফিজা ড্যাম ড্যাম করে তাকায়, একটা রহস্যভরা হাসি তার পাতলা ঠোঁট নাড়িয়ে বেরিয়ে আসে, মাথায় খুন চড়েচে আগে বলবা তো! তারপর বিড়বিড়িয়ে বলল, খুন তো চড়ার কথা, কদিন ঘরে আসো নি বল তো? আমারও ভাল লাগে না ।
