সবুজ চোখ কাচের গুলির মতো শক্ত করে বলল, দেখতে তো ধানপাতার মতো, তবে এর নাম জানি না।
সব শেষে রঘুনাথের কাছে হাত মাপের পাতাটা গিয়ে পৌঁছল। রঘুনাথ পাতার ডগাটা দু-আঙুলে চাপ দিয়ে গন্ধ শুকল। তারপর আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, এটা স্বরভঙ্গ গাছের পাতা। কারোর গলা বসে গেলে এই পাতার রস গরম জলে ফুটিয়ে খেলে গলা চাঙ্গা হতে বেশি সময় নেয় না।
অরূপবাবুর আবেশী গলা, ভেরি গুড! যথার্থ বলেছ। কী নাম তোমার?
ভ্যাবাচেকা খেয়ে রঘুনাথ বলল, আজ্ঞে, আমার নাম রঘুনাথ।
-বাড়ি কোথায়?
-বাধের ধারে থাকি! ধাওড়াপাড়ায়। রঘুনাথ বেশি কথা বলতে চাইছিল না। শুভ তার পক্ষ নিয়ে বলল, কাকু, এবার আমাদের ফিরতে হবে। রাত হয়েছে। ঘরে না গেলে মা চিন্তা করবে?
ভেবেছিলাম তোমাদের দু-চারটে কবিতা শোনাব। ঠিক আছে, সময় যখন নেই তা পরে হবে। অরূপবাবুর গলায় আফসোেস ধ্বনিত হল, তোমরা কেউ কিছু লিখলে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি মন দিয়ে শুনব। প্রয়োজন হলে কারেকশান করে দেব। শুভর মনে পড়ে গেল তার নিজের কথা। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নিয়ে সে লিখেছিল জীবনের প্রথম কবিতা। হেড-মাস্টারমশাই সেই সৃষ্টিটাকে বাতিল করে দিলেন। উৎসাহের বদলে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, কার দেখে টুকে মেরেছ? এটা কি ক্লাস এইটের ছেলের ভাষা? আবার কোনোদিন যদি দেখি অন্যের কবিতা টুকে এনে আওড়াচ্ছ তাহলে প্লেয়ারের সময় নীল ডাউন করে রেখে দেব।
হেডমাস্টারমশাইয়ের সেই রুদ্র মূর্তি, অঙ্গার ভরা চোখ এখনও ভুলতে পারেনি শুভ। সেদিন ভীষণ অপমানিতবোধ হয়েছিল নিজেকে। নির্দোষ প্রমাণ করার হাজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল সে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার প্রিয়তম কবিদের একজন। তাঁর কবিতা পড়ে শুভ অনুপ্রাণিত হয় বারবার, তার মনে হয় বেশিরভাগ কবিতা বুঝি তাদের মতো মানুষের দুঃখ কষ্ট নিয়ে লেখা। তমালবাবু বাংলার ক্লাসে এই কবিকে নিয়ে অনেক অজানা কথা বলেছেন-যা শুনে চোখের জল আটকে রাখতে পারেনি শুভ।
তমালবাবু তাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, তোমার আবেগটাকে কাজে লাগাও। আজকাল মানুষের হৃদয় থেকে আবেগ নামক শব্দটি মুছে যাচ্ছে। তোমাদের মতো নরম মনের ছেলেরাই পারবে–মাতৃভাষার কমনীয়তা রক্ষা করতে। তমালবাবু আরও বলেছিলেন, ভেবেছি, একটা দেওয়াল পত্রিকা বের করব। তোমরা সবাই লেখা দিলে কাজটা আমার পক্ষে সহজ হবে।
কিছু লিখতে বসলেই বাংলার মাস্টার তমালবাবুর মুখটা মনে পড়ে যায় শুভর। এ পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের বুকের গভীরে ঝর্না নদী এবং সমুদ্র আছে। তমালবাবু সেই মানুষ যাঁর মনে পাঁক নেই, কেবলই পলিমাটি।
-কী ভাবছ? শুভ’র কাঁধের উপর আলতো হাত রাখলেন অরূপবাবু। তোমার কথা আমি তমালবাবুর মুখে শুনেছি। এত বড়ো ইস্কুলে তোমরা ক’জন মাত্র লেখালেখি কর–সে খবর আমার জানা। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা শুনে যাও। যারা সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা করেন। তারা আমার প্রাণ, আত্মার আত্মীয়। তাই তোমাকে বলছি–যখন খুশি চলে এসো। আমার দরজা তোমার জন্য খোলা থাকবে।
সবুজ যেন গেট পেরতে পারলে বাঁচে এমন লম্বা লম্বা পা ফেলে সে হেঁটে এল কিচেনের সামনে। আর তখনি ছাদের উপর উড়ে এসে বসল একটা পেঁচা। পালক ফুলিয়ে শস্বরে ডেকে উঠল পেঁচাটা। শুভ ভয় পেল সেই ডাক শুনে।
মাঠের দিকে তাকাতেই তার চোখের সামনে ছায়া শরীর নিয়ে ঝাঁকড়া মাথা দুলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল সারিবদ্ধ খেজুরগাছ। গিয়াস জিরেন কাট রসের জন্য গাছ কেটে বেঁধে দিয়ে গিয়েছে মাটির কলসী। সারারাত রস চুঁইয়ে অর্ধেকের উপর ভরে যাবে কলসীগুলো। সকালবেলায় শিশির চুবানো ঘাসে পা দিয়ে খেজুরগাছের কাছে এসে দাঁড়াবে গিয়াস। তার পরনে চেক লুঙ্গি, এই তীব্র শীতে পাতলা ফিনফিনে একটা জামা। শীতে কম্পমান শরীর নিয়ে তবু সে স্বপ্ন দেখা ছাড়েনি। রাতভর তার পরিশ্রমের অন্ত নেই। রসের ঠিলি চুরি করার লোকের অভাব হয় না। ওরা রস খায়, ঠিলি ভাঙে। গাছের গোড়ায় ভাঙা হাঁড়ির চিহ্নগুলো যেন তার স্বপ্নকে পা দিয়ে থেতলে দিয়ে চলে যায়। এই শত্রুতার কবে যে শেষ হবে–জানা নেই গিয়াসের। হাতে বাঁশের লাঠি, গিয়াস এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়ায় গাছ পাহারা দেবার জন্য।
তিন জনকে এক সাথে দাঁড়াতে দেখে লাঠি হাতে এগিয়ে এল গিয়াস। শুভ আর সবুজকে দেখে ভুল ভেঙে গেল তার, কী ব্যপার, রাত করে যে বাইরে আছো? হিম পড়ছে। চটজলদি ঘর যাও, ঠাণ্ডা লেগে গেলে ভোগান্তির আর শেষ থাকবে না।
গিয়াসের কথায় আন্তরিকতার ছোঁয়া পায় সবুজ। মনে মনে সে ভাবে দুটো পয়সার জন্য মানুষটা সারারাত ঘুমাতে পারে না। দুরের গাঁয়ে তার বউ-বাচ্চা আছে। তাদের কাছে যে যাবে–সময় কোথায়? মাথায় কাজের চিন্তা থাকলে ঘরও অনেক ক্ষেত্রে জেলখানা হয়ে যায়। হাসপাতালের গাছগুলো ঠিকে নেবার জন্য এবারও মকবুল এসেছিল কথা বলার জন্য। গাছ পিছু চার কেজি নয়, পাঁচ কেজি গুড় দেবে–এমন কথা জোর গলায় বলেছিল ডাক্তারবাবুকে। সেই কথার ফাঁদে পা দেননি ডাক্তারবাবু। সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মকবুলকে, গিয়াসের সঙ্গে অনেক আগে থেকে কথা হয়ে আছে। তাছাড়া প্রতিবছর ও গাছগুলো ঝুড়ে দেয় যত্ন নিয়ে। ও রস ভালোবাসলেও, গাছকে কম ভালোবাসে না। ওর হাতের ছোঁয়ায় কী যাদু আছে তাই প্রতি বছর খেজুরগাছগুলো তরতরিয়ে বাড়ছে।
