শুধু শুভ কেন, সবুজের মুখ শুকিয়ে পাটের দড়ির মতো বিবর্ণ দেখায়। ভাষাহীন, বাক্যরহিত রঘুনাথ ভাবছিল–এ কী ফ্যাসাদে পড়া গেল! এর থেকে সহজে উদ্ধার পাওয়া যাবে তেমন কোনো অলৌকিক আলো সে দেখতে পেল না।
পাঁচিলের ধারে একেবারে শেষ কোয়ার্টারটি অরূপবাবুর। এদিকে মানুষজন কম আসেন। সামনের মাঠটাতে বেশির ভাগ সময় গোরু-মোষ চরে, রাখালরা ডাংগুলি খেলার উপযুক্ত জায়গা পেয়ে সব সময় হৈ-চৈ বাঁধিয়ে রাখে। বিরক্ত অরূপবাবুর কাব্যচর্চায় ওইসব হই-হট্টগোলের শব্দ কোনো নতুন কবিতার জন্ম দিতে পারে না। ফলে তিনি এই কোয়ার্টার পেয়ে দুঃখী। নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য মনের মতো পরিবেশ তিনি আজ পর্যন্ত পেলেন না। এই আক্ষেপে–তিনি স্ব-উদ্যোগে, স্ব-হস্তে তৈরি করেছেন একটি অভিনব পুষ্প-উদ্যান। এই পুষ্প-উদ্যানের তিনি নাম রেখেছেন–মনোরমা।
মনোরমা তার প্রথমপক্ষের স্ত্রী, অকালে তার জীবনদীপ নির্বাপিত হয়, সেই শোকে অধীর অরূপবাবু তাঁর জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, সেই কাব্যগ্রন্থের নাম রাখেন, মনোরমা। লাখুরিয়া ইস্কুলের বাংলার শিক্ষক তমালবাবু মনোমা’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতার প্রথম পাঠক। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই উদ্যানে চেয়ার সাজিয়ে, হ্যারিকেনের আলোয় চলত কাব্য-সাধনার নিরলস মহড়া। হরিনাথপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজলু শেখ আসতেন এই মহতী সান্ধ্যবাসরে যোগ দিতে। তার একটি মার্ড-গার্ড খোলা সাইকেল, সঙ্গের থলিতে পাম্পার, টায়ার-লিভার, সলিউশন ডিবা, ধার কচি ইত্যাদি যন্ত্রপাতি মজুত থাকত। কোনো কারণে টিউব লিক হয়ে সাইকেল তার ভার বহন করতে অক্ষম হলে ফজলু মাস্টারমশাই তার যন্ত্রপাতি সহযোগে অসুস্থ সাইকেলের রোগ সারিয়ে চাঙ্গা করে তুলতেন। নিজের হাতে এসব কাজ করার জন্য গর্ববোধ করতেন ফজলু শেখ। মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলতেন, পরমুখাপেক্ষী হয়ে জীবনধারণ করা পাপের। মহাত্মা গান্ধীর মতন মহামানবও নিজের ঘরদোর নিজেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতেন। আমি সেই মহাত্মাকে শ্রদ্ধা করি বলেই–নিজের সব কিছু নিজের হাতে করার চেষ্টা করি। এতে আমার আত্মবিশ্বাস মজবুত হয়। আমি আল্লার প্রতি আরও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে পড়ি।
এদের তিন জনের কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা শোনার সৌভাগ্য হয়েছে শুভর। সে ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে–তিনজন আলাদা মানুষ হয়েও কোথাও একটা মিল রয়েছে এঁদের মধ্যে। এঁরা তিনজনই সাহিত্যমনস্ক এবং সাহিত্যপ্রেমী। এঁদের আলোচনার অধিকাংশ সময় জুড়ে থাকে বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যের দিকপালদের নিয়ে বিশদ আলোচনা।
ফজলু শেখ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হলেও তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ., পি. এইচ ডি করেছেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর চেহারা, সাজ-পোশাক দেখে অনেকেই হয়ত ভাববেন তিনি বড়ো জোর বি ডি ও অফিসের একজন কেরানী নয়ত কোনো ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যকর্মী। যে যাই ভাবুক–ফজলু শেখ এসব নিয়ে আদৌ মাথা ঘামান না, তিনি তাঁর মৌলিক লেখালেখি আর পড়াশোনা নিয়ে মগ্ন হয়ে আছেন, তাই কলেজের শিক্ষকতার প্রস্তাবও হাসি মুখে ফিরিয়ে দেন। বিনীতভাবে বলেন, সৃজনশীল কাজ করতে গেলে টাকার পেছনে দৌড়ালে চলবে না। দু-বেলা ভাতের যোগাড় হয়ে গেলে মানুষের আর বিশেষ কিছু দরকার হয় না। প্রাইমারি স্কুলে আমি ভালো আছি। এখানে কোনো দুঃশ্চিন্তা নেই, শিশুদের সঙ্গে মিশে মনটাকে শিশুদের মতন করার চেষ্টায় আছি। মনের পাঁকে যদি পদ্মফুল না ফোঁটাতে পারি তাহলে আমি কিসের শিক্ষক হলাম?
ফজলু শেখের পরিচিতির শেষ নেই, তিনি ছ’ফুট দুই ইঞ্চি লম্বায়, মাথায় সাদা টুপি পরেন শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায়। তার চেহারা অনেকটা তরলা বাঁশের মতো সাদাসিধে, ছাত্ররা তাকে আড়ালে আবডালে বলে লগা মাস্টার। লগা মাস্টারের অনেক গুণের মধ্যে নির্ভুল রবীন্দ্র-সংগীত গাওয়া অবশ্যই পড়বে। তার তেমন বোদ্ধা শ্রোতার প্রয়োজন হয় না। ক্লাস থ্রি-ফোরের ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি গান গেয়ে শোনান, তার মানে বুঝিয়ে দেন। আর উদাত্ত কণ্ঠে বলেন, আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছেন, নজরুল আছেন। তোমরা বড়ো হয়ে বড়ো মানুষদের কথা পড়বে।
তিন মাথা যেখানে মিলিত হয় সেটাই বুঝি ত্রিবেণী!
.
৩৭.
অরূপবাবুর মনোরমা উদ্যানের প্রবেশপথটি ইট বিছানো, তার দু-পাশে শীতের ফুল সুগন্ধ ঢালছে বাতাসে। বেশ গর্বিত মেজাজে অরূপবাবু বললেন, ফুল আর শিশু যারা ভালোবাসেন না তারা মানুষ নন। ঐ দেখ, পাড় বাঁধানো জলাধার। ওখানে পদ্মগাছ এনে লাগিয়েচি। ভালো করে দেখ-কুড়ি এসেছে। আজকালের মধ্যে ফুল ফুটবে।
শুভ দেখল পদ্মপাতা টলটল করছে চার হাত ব্যাসের জলাধারের মধ্যে। অতি আগ্রহে মাথা তুলে দেখার মতো দুটি কুঁড়ি জলশয্যা ছেড়ে মুখ তুলে তাকিয়েছে বাইরের আলোয়।
অরূপবাবু আফসোস করে বললেন, রাতেরবেলায় বাগানের আর কী শোভা দেখবে? দিনেরবেলায় এসো-সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব। ইট-বিছানো পথ যেখানে শেষ তার হাত দুয়েক দুরে সবুজ ঘাসের জঙ্গল। ঘাসগুলো লম্বা লম্বা, অনেকটা ধান গাছের পাতার মতো খসখসে। অরূপবাবু একটা পাতা ছিঁড়ে এনে শুধোলেন, বলো তো এটা কি পাতা?
শুভ পাতাটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। নাম জানে না ফলে ওটা সবুজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিষ্কৃতি পেতে চাইল সে।
