–দুর বোকা, বাঁশি যখন তখন শেখা যায় না। রঘুনাথ সতর্কগলায় বলল, আমাকে গুরু মানা করেছে–দুপুরবেলায় বাঁশিতে যেন ফুঃ না দিই। দুপুরে ফুঃ দিলে সুরের ছাতি ফাটে। বাঁশি কাঁদে।
এসব গুঢ় কথা কিছুই বুঝতে চায় না শুভ।
সবুজ ঠাট্টা করে বলল, গাঁ-ঘোরা সন্ন্যাসীদের মতো কথা বলিস নে! কথায় যদি হেঁয়ালি থাকে সে কথা তো পাথরচাপা।
–তর্ক থামা। শুভ দু’জনকেই থামিয়ে দিতে চাইল, তোরা চুপ করবি?
কিছু দূরে শুয়ে আছে ঝোপঝাড়। হাড়মটমটি আর পুটুসের ছড়াছড়ি। একটা শেয়াল আড়চোখে তাকিয়ে দ্রুত ঢুকে গেল বাঁশবাগানে। রঘুর মনে পড়ে গেল ধানমাঠে শেয়ালের বাচ্চা ধরার কথা। ফুটফুটে রোদে বাচ্চাটা গর্ত থেকে বাইরে এসে বিপদে পড়ে গিয়েছিল। দূর থেকে তার নরম শরীরটাকে দেখে ফেলে রঘুনাথ। ছুটে গিয়ে দখল নেয় শেয়ালছানার। খুশি আর ধরে তার চোখে-মুখে। ভয়ে জড়োসড়ো শেয়ালের বাচ্চা নিয়ে সে ছুটে এসেছিল ঘরে। মায়ের কোলের কাছে শেয়ালের বাচ্চাটা নামিয়ে রেখে বলেছিল, হ্যাঁ দেখ মা, কী সোন্দর শেয়ালের ছা! এটা আমি পুষব।
ঠোঁট ভরিয়ে হেসে দুর্গামণি বলেছিল, ছা, শেয়ালের ছা আবার কেউ পোষে নাকি? যা এটারে যেখান থিকে ধরে এনেচিস, সিখানে ছেড়ে আয়। ঘরে শেয়াল পুষেচি শুনলে এ টিপেয় আর কেউ পা দিবেনি।
পায়ের চড়া পড়া দাগে পাশাপাশি হাঁটছিল ওরা তিনজন।
চাদর বিছানোর মতো হিম পড়ছে সর্বত্র। অল্প হাঁটলেই মাথার চুল স্যাঁতসেতে হয়ে ওঠে। টুপটুপিয়ে হিম ঝরে গাছের পাতা চুঁইয়ে। কদিন হল ঠাণ্ডাটায় শুলোনী ভাব আছে। রাতে শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না রঘুনাথের। পাতলা কথাকানিতে ঘুমের বারোটা বেজে যায়। তবু কাউকে বলা যায় না এই দুঃখের কথা, মুখ বুজে পড়ে থাকতে হয়। হঠাৎ তারা খসে পড়ল মাঝ আকাশ থেকে।
তারা খসে পড়ার সংকেত শুভ নয়।
কিছুটা আসার পর ওদের পথ আটকে দিলেন এই হাসপাতালের স্টাফ অরূপবাবু। ভালো করে তিনজনকে জরিপ করে অরূপবাবু বললেন, এটাকে তো চিনলাম না। কোথায় বাড়ি ছেলেটার? রাতের বেলায় হাসপাতাল চত্বরে কেন এসেছে? ডাক্তারবাবু জানলে রাগারাগি করবেন।
অরূপবাবুর পোশাক-আশাক বড়োই বিচিত্র। ফিনফিনে ধুতির সঙ্গে ফুল-পাঞ্জাবী পরেন তিনি। সেই পাঞ্জাবীর বুক পকেটে আটকান থাকে সোনালী মুখখাঁটির দামী একটা কলম। শুধু দামী কলম নয়, অরূপবাবুর চশমাখানাও খাসা, সোনালী ফ্রেমের উপর বিদেশী কাচ তার চোখজোড়াকে দিয়েছে আলাদা এক দর্শন ক্ষমতা। ধুতির কোঁচা পাঞ্জাবীর পকেটে ঢুকিয়ে অরূপবাবু কবির চোখে তাকালেন, তোমরা আমার সন্তানের মতো, তোমাদের একটা কথা বলি–অল্প বয়সে নেশা-ভাঙ করা অনুচিত। এতে দৈহিক মানসিক-দুদিক থেকেই শরীরের প্রভূত ক্ষতি হয়। তোমরা এ দেশের ভবিষ্যৎ। তোমরা যদি বিপথগামী হও, তাহলে এত বড়ো দেশটা চালাবে কে?
সবুজ বাহাদুরী নেবার জন্য এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল, এ কথা কেন বলছেন, কাকু? আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি?
-করছে তো! অরূপবাবু বেশ ক্রোধের সঙ্গে গর্জে উঠলেন, তোমার বয়স কত, কোন ক্লাসে পড়ো? বলো–এই বয়স থেকে তোমাদের কি ধূমপান করা উচিত? তোমরা হয়ত বুঝতে পারছ না–যে তোমাদের মুখ দিয়ে বিড়ির দুর্গন্ধ বেরচ্ছে। সেই দুর্গন্ধে যে কোনো ভদ্রলোকের নাসিকা কুঁচকে যেতে বাধ্য।
অপ্রস্তুত শুভ মুখ নামিয়ে নিল মাটির দিকে।
অরূপবাবু এই হাসপাতালের সুপারভাইজার। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে তার হৃদ্যতা এখানকার সব স্টাফই লক্ষ্য করেছেন। ইংরেজিতে অনার্স এই ভদ্রলোক একটু শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে ভালোবাসেন। ইংরেজি তাঁর প্রিয় বিষয় হলেও বাংলায় আধিপত্য কম নেই, সুযোগ এবং অবসর সময় পেলে তিনি কাগজ কলম নিয়ে বসে যান কাব্যসাধনা করতে। তাঁর কবিতায় সমস্যার চাইতে প্রকৃতি বন্দনা বেশি, আকাশ জল মাটি ফুল নদী এসবই তাঁর কাব্যভাবনাকে ঋদ্ধ করে।
এই মানুষটির উপর অবনীর শ্রদ্ধা অসীম, সে প্রায়ই আলোচনার সময় বলে, অরূপবাবুর মতো গুণী মানুষ এ হাসপাতালে আর দুটি নেই। যখন কোনো দরখাস্ত লেখার প্রয়োজন হয়, ডাক্তারবাবুর মতো মানুষও এই মানুষটার দ্বারস্থ হন।
জ্ঞানের প্রাচুর্য মানুষকে সরল দেবদারু গাছের চেয়েও সুন্দর করে তোলে। অরূপবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে সবুজের দিকে তাকালেন, তুমি তো টিকেদারবাবুর ছেলে, তাই না? কী যেন নাম তোমার? বড় পিকিউলার তোমার নামটা। এই মুহূর্তে মনে পড়েছে না!
–ওর নাম সবুজ। ঝটপট জবাব দিল শুভ।
এই ফাঁদ থেকে ওরা তিনজনই চাইছিল মুক্তি পেতে। কিন্তু মুক্তি কি অত সহজ নাকি? মুক্তি তো ছেলের হাতের নাড়ু নয় যে চাইলেই পাওয়া যাবে।
অরূপবাবু কোঁচা দুলিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, কয়েকটা কথা বলছি মন দিয়ে শোন। ছাত্রদের একমাত্র তপস্যা হল পড়াশোনা করা। যারা জেলে-তাদের তপস্যা হল মাছধরা। যারা চোর–তাদের চুরিবিদ্যায় পারঙ্গম হতে হয়। না হলে মানবজীবনে সফলতা আসে না। তাই বলছিলাম-নেশা-ভাঙ ছেড়ে দিয়ে মন দিয়ে বিদ্যাভ্যাস করো। মা সরস্বতীর আরাধনা করবে, মা সরস্বতী তাহলে তোমার জ্ঞানের ভাণ্ডার পূর্ণ করে দেবেন। আমি প্রতি বছর বাগদেবীর শ্রীচরণ বন্দনা করি। আমার বিশ্বাস-এর দ্বারা আমার জ্ঞানের গভীরতা, স্মৃতিশক্তি এই বয়সেও পুর্বের ন্যায় উজ্জ্বল আছে। আর একটি কথা–মা সরস্বতীকে পূজা অন্তে কখনই বিসর্জন দেবে না। এতে মা মনদুঃখে ভোগেন। আশীর্বাদের বদলে তার দীর্ঘশ্বাস আমাদের উপর বর্ষিত হলে এই মনুষ্যজীবনে আমাদের পক্ষে একা একা কতদূর যাওয়া সম্ভব? কথা সমাপ্ত করে অরূপবাবু থানার দারোগার মতো বললেন, তোমরা আমাকে অনুসরণ করো নাহলে আজ তোমরা এই বয়সন্ধিক্ষণে যে পাপ করেছে–তার শাস্তি তোমাদের পেতেই হবে। আমার কথার অবাধ্য হলে আমি তোমাদের পিতা-মাতার কাছে তোমাদের যাবতীয় গুণাবলী বিশদভাবে বলব। এতে ফলাফল কী হবে তা তোমাদের অজ্ঞাত নয়।
