সবুজের সতর্কবাণী শোনার সময় নেই। আজ তার জীবনে এক অন্য অভিজ্ঞতার সূচনা হতে চলেছে। ভারী কথায় এই মুহূর্তটাকে সে নষ্ট হতে দেবে না।
বার দুই বিড়িতে টান দেবার পর কাশি ঠেলে উঠল সবুজের গলায়। ঝ্যানঝ্যান করে আওয়াজ হল বুকের পাঁজরায়।
আমগাছের গোড়ায় মুখোমুখি বসেছে ওরা তিনজন।
শুভ তুষের চাদরটা রঘুনাথকে দিয়ে বলল, এটা আমি তোর জন্য এনেছি। পুরনো চাদর। তবু তুই নে। না করিস না।
-কেন দিতে গেলি? গলা কেঁপে উঠল রঘুনাথের।
–যা শীত পড়েছে, এই ভয়ানক শীতে আমার শুধু তোর কথা মনে পড়ে। পৃথিবীতে কত গরম পোষাক, অথচ তোর একটাও নেই। শুভ রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা খসে পড়া দেখল। অমনি হ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। রঘুনাথ কেমন কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে আছে অন্ধকারে। বিড়বিড় করে বলল, মনে আছে তো বাঁশির মোট ছ’টা ফুটো, ফুঃ দেওয়ার জন্য আর একটা ফুটো। মোট সাতটা ফুটো না হলে সুর বেরয় না। প্রতিটি ফুটোয় এক সমুদ্র সুর। আমার গুরু বলে সাতটা ছিদ্রে সাত সমুদ্রের সুর। যে বাঁশি বাজায়, সে পানকৌড়ি পাখির মতো ডুব দেয় সুরের গঙ্গায়। তবে না বাতাস ভরে সুর ওঠে। সুর না উঠলে সব দুধ জল হয়ে যায়। বাঁশি শেখানোর দক্ষিণা আমি মিতের কাছ থেকে নিতে পারিনে। তুই এটা ঘুরোন নে–
-না নিলে অনেক কষ্ট পাবো।
-এত করে বলছিস যখন দে। তিতকুড়ো ঠোক গিলে ঠোঁট কামড়ে ধরল রঘুনাথ। কিসের কষ্টে সে নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারছিল না। যা কঠিন সময় এসেছে, একটা মাস কেন, একটা দিনও কাটতে চায় না। সোনার বাংলায় এখন ভাতের বড়ো আকাল। গাঁয়ের মানুষ আটা খাচ্ছে-স্বপ্নেও ভাবা যায় না এমন দৃশ্য। ট্রাক বোঝাই হয়ে মাইলো আসছে। বগলাহাটের খিচুড়ি দিচ্ছে ইস্কুলে। গমচুর খেয়ে মানুষের তলপেটে দরকচা মেরে গেল। গুয়ারাম এসব দেখে দুঃখ করে বলে, গাঁ ঘরে গরীবগুরবো মানুষ আর বাঁচবে নি গো! সেঁড়িগুগলি থেকে বনকচু কিছুই পাওয়া যায় না যে সিজিয়ে খাবে। এমন চললে মানুষ আর কদিন বাঁচবে?
বেশিদিনের কথা নয়, তখনও গোরুপালন প্রথা চালু ছিল গাঁয়ের ঘরে। গোরু চরানোর জন্য দিনভর ব্যস্ত থাকতে হত গুয়ারামকে। রঘুনাথও তার বাবার সঙ্গে মাঠে যেত গোরুর পাল নিয়ে। গ্রামের যত গোরু ঘর ঘর গিয়ে গোয়াল থেকে খুলে আনত গুয়ারাম। সকাল থেকে এ কাজে তার ব্যস্ততার শেষ নেই। পঞ্চাশ-ষাট ঘর থেকে গোরু আনা কি মুখের কথা! গোরুর পাল খেদিয়ে জঙ্গলের ধারের মাঠটাতে হাজির হত তারা। দুর্গামণি প্রতি ঘর থেকে মুড়ি গুড় চিড়ে চেয়ে আনত সারাদিনের খাওয়ার জন্য। কেউ দিত, কেউ আবার দিত না। কেউ বলত, কাল নিও… ইত্যাদি। দশ জনের দয়ায় দিন চলছিল হাওয়ার মুখে পানসির মত তরতরিয়ে। গোর চরানোর মজাটাই তখন আলাদা। এ এক নেশা। এই নেশার জন্য স্কুলের পথে বেশি দুর পা বাড়াল না রঘুনাথ। মোষের পিঠে চড়ে, সবুজ ঘন বনের দিকে তাকিয়ে বাঁশি বাজানোর যে আনন্দ-সেই আনন্দ কি স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে পাওয়া যায়? তাই স্কুলের কথা শুনলে হাঁপিয়ে উঠত সে। দুর্গামণির কাছ ঘেঁষে বসে থাকত চুপচাপ। গোরুর পাল-এ যাওয়ার অর্থ রোজ বনভোজন। মাটির ঠিলিতে পাল পুকুরের টলটল জল ভরে নিয়ে যেত দুর্গামণি। বেতের ধামা ভর্তি মুড়ি। সঙ্গে আখের গুড়। তিন জনে মিলে, জল দিয়ে মুড়ি ভিজিয়ে গুড় সহযোগে খাওয়া চলত ভর পেট। রোদ ঢাললে গোরু মোষ গুণে নিয়ে ঘরে ফেরার তাড়া। যার গোর তার তার গোয়ালে পৌঁছে না দিলে দশটা কথা শোনায় গোরুর মালিক। লোকের মুখ ঝামটা দেওয়া কথা ফোস্কা পড়ায় গুয়ারামের মনে। মাঝে মধ্যে সে আক্ষেপ করে রঘুনাথকে বলে, লেখাপড়াটা শিখে লে ব্যাটা। আজকাল যুগ পাল্টেছে। পড়া লিখা শিখলে টুক করে চাকরিটা পেয়ে যাবি।
বামুনে মন্ত্র পড়ে, পাঁঠার চামড়া শোনে। রঘুনাথ এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিত কথাগুলো। একদম ভালো লাগত না গুয়ারামের ঘ্যানরঘ্যানর ভাষণবাজি।
সবুজের বিড়িটা টানের জোরে হাতে ছ্যাক লাগার মতো অবস্থা। অন্ধকারে বিড়ির সুতো ছোঁয়া আগুনে ছ্যাঁকা খেল সে। উঃ শব্দ বাতাসে মিশতেই হাসি পেল রঘুনাথের, দেখে-শুনে খা। অমন হাভাতের মতো নেশা করলে মরবি কেশে কেশে।
সবুজ তর্কে না গিয়ে বলল, বিড়িতে যে এত দম লাগে আগে জানতাম না। শুভ বলল, চল, এবার আমরা ফিরে যাই। রঘুকে পাকা রাস্তা অব্দি এগিয়ে দিয়ে ঘর ফিরে যাব।
রঘুর সায় ছিল না, সে নিমতেতো স্বরে বলল, আমাকে নিয়ে ভাবিস না। আঁধারে বেড়ালের মতো আমার চোখ জ্বলে।
শুভ মজা করে বলল, তুই কি চোর নাকি?
মনোক্ষুণ্ণ রঘুনাথ সামলে নিল নিজেকে, চোর হলে তো বেঁচে যেতাম। দু-বেলা দুমুঠো খেতে পেতাম। সাধু হয়ে যত ঝামেলা হয়েছে। এক পা জলে, এক পা ডাঙায়, এভাবে কি মানুষ বাঁচবে? রঘুনাথ নিজেকেই যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, এত অভাবে নিয়ে বাঁচা যায় বলত? বুড়া দাদুটা টাইমে খেতে না পেলে চেল্লায়। বাপ-মা তুলে গাল দেয়।
অভাবের ধারালো নখ শুভ দেখেছে তাই সে চুপ করে থাকল। রঘুনাথ উসখুসিয়ে বলল, তুই ঘরে গেছিলিস, কোনো কথা আছে নাকি?
সকালের কথাগুলো এখন আর রঘুর কাছে বলতে ইচ্ছে করল না শুভর। উপর দিকে থুতু ছুঁড়লে নিজের গায়ে পড়ে। সেটা কি ভালো দেখায়? ঢোঁক গিলে শুভ বলল, আজ রেজাল্ট বেরল। তাই তোর কাছে গিয়েচিলাম সুখবর দিতে। দেখা হলে ভালো লাগত। কিছু সময় হয়ত বাঁশিটা শিখে নেওয়া যেত।
