৩৬.
আলো-আঁধারীর পথ শেষ হয় কলতলায় এসে। বড়ো আমগাছটা গোলাকার অনেকটা জায়গাকে ছায়া দেয়, হলুদ আমপাতা মাঝে মধ্যেই বিছিয়ে দেয় ঘাস উঠে যাওয়া মাটির বুকে। দুপুরবেলা এই আমতলা বড়ো লোভনীয়। শুভ এখানে কাচের গুলি খেলতে আসত। প্রায়ই ঝগড়া লেগে যেত পাড়ার ছেলেগুলোর সঙ্গে। হাতাহাতিতে সবুজের জোড়া মেলা ভার। চোর-চোট্টামী সে একদম সহ্য করতে পারে না। খুব অসহ্য লাগলে বিল-চড়-ঘুষি চালিয়ে দেয়। একবার ডাংগুলি খেলায় সে চোখ ফাটিয়ে দিয়েছিল পাড়ার একটি ছেলের। সেই নিয়ে কত অশান্তি আর বিচার সভা। টিকেদারবাবু নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল সবুজের কর্মকাণ্ডে। পাড়ার ছেলেটার সম্পূর্ণ চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়েছিল টিকেদারবাবুকে। আজ আমতলায় এসে বিনা কারণে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল শুভ আর সবুজ। আর তখনই এক ঝাঁক জোনাকপোকা টিপিরটিপির আলো জ্বেলে উড়ে গেল খেজুরঝোপের দিকে।
হাত উঠিয়ে সবুজ বলল, রঘুটাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। ও এতদূর এল, আর কোয়ার্টার অব্দি যেতে পারল না। এত জড়োসড়ো হয়ে থাকলে আজকের দিনে কি চলে?
শুভ অন্ধকারেই হাসল, আসলে তা নয়। রঘু খুব সাদা মনের ছেলে। আমরা ওর বন্ধু, তবু ও আমাদের সঙ্গে মিশতে দ্বিধাবোধ করে।
জন্মগত জড়তা একদিনে কাটবে না। এগুলো দূর হতে সময় লাগবে। ততদিন আমাদেরই এগিয়ে যেতে হবে। বন্ধুর জন্য এটুকু ত্যাগ তো আমাদের করতেই হবে।
সবুজ আর কথা বাড়াল না, চুপচাপ হেঁটে এল ফুটবল মাঠের শেষ প্রান্তে। মাঠ যেখানে শেষ, সেখান থেকে শুরু হয়েছে সরকারি পাঁচিল। পাঁচিলের হাত পাঁচেক দুরেই পচা জলের ডোবা। দিনরাত মশা ভনভন করে সেখানে। একটু হাওয়া দিলেই দুর্গন্ধ ছোটে চারদিকে।
সবুজ জোনাক-জুলা মাঠের দিকে তাকিয়ে নাক টিপে ধরল জামা দিয়ে। শুভ সেসব কিছু করল না তবে রঘুনাথের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, অসময়ে তোর না আসলেও চলত। বল কিসের জন্য এসেছিস? কিছু বলার আগে রঘুনাথ হাতকাটা জামার পকেট থেকে বের করে আনল বিড়ির ডিবা, একটা নিজে ধরিয়ে শুভকে জিজ্ঞেস করল, চলবে নাকি?
শুভ কপাল কুঁচকে বলল, এগুলা তুই আবার কবে থেকে খাওয়া ধরলি?
–খাই লেংটো কাল থিকে, তবে তোর সামনে খেতাম না। রঘুনাথ ফিচেল চোরের মতো হাসল, তুই ভালো ছেলে। জীবনে এসব খুঁবি না। কিন্তু আমার মতো ছেলে-ছোকরাদের এসব না খেলে পেট চলে না। জন খাটতে গেলে বিড়ির ধোঁয়া সালসার কাজ করে।
-তুই যে বিড়ি খাস, তোর বাবা তোকে বকে না।
–আগে বকঝকা করত–ফুসফুসটা ঝাঁঝরা হয়ে যাবে রে। খাওয়ার বয়স কি পেলিয়ে যাচ্ছে নাকি? রঘুনাথ বড়ো করে শ্বাস টেনে নিয়ে তাকাল, মজুর খাটতে গেলে জলখাবার মুড়ি না দিলে চলবে, কিন্তু বিড়ি না দিলে পেট ফুলে যাবে নেশায়। এই দেখ, আমি এট্টা পাথরপোরা খ্যাচাকল কিনেছি। দেখ কেমন আগুন উগলায়।
বুড়ো আঙুলে চাপ দিয়ে রূপো রঙের লাইটারে আগুন বের করে দেখাল রঘুনাথ। শুভ অবাক করা চোখে দেখছিল। লাইটার সে এর আগেও দেখেছে, তার বাবার আছে।
বিড়ির গন্ধে হারিয়ে যাচ্ছে বাতাসের ঘ্রাণ। হঠাৎ শুভর মনে হয় রঘুনাথ যেন পচা ডোবা। যতই আতর ছেটানো যাক–এর দুর্গন্ধ যাবে না। মিতে’ পাতিয়ে তার সম্বন্ধে এ কী ভাবছে সে? এ তো অপরাধ। বন্ধুর দোষ-ত্রুটি সামনাসামনি বলে দেওয়া ভালো। এতে ভুল বোঝাবোঝি কমে। সম্পর্ক ভালো থাকে।
শুভ হঠাৎ হাত ধরল রঘুনাথের, কিছু বলতে যাওয়ার আগে সবুজ আগ্রহ ভরে বলল, জানিস রঘু, আজ আমাদের রেজাল্ট বের হয়েছে। আমরা পাশ করেছি। পাশ করার জন্য আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। ফেল করা ছেলে যদি ভালভাবে পাশ করে যায়, তাহলে আনন্দ হবে না বল?
রঘু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল।
সবুজ সময় নষ্ট না করে বলল, আজ এই আনন্দের দিনে বিষ দিলেও আমি খেয়ে নেব। দে, আমাকে একটা বিড়ি দে। বিড়ি খেলে কেউ খারাপ ছেলে হয়ে যায় না। খাওয়ার জিনিস খাবো, তাতে দোষ কোথায়?
রঘুনাথ শুভর দিকে কাঁপা চোখে তাকাল, তোরা বাবু ঘরের ছেলে। বিড়ি খেলে, নেশা করলে তোদের বদনাম হবে।
–লোকের কথায় আমার কি এসে যায়? সবুজ রঘুর জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল, জোর করে বিড়ির ডিবাটা বের করে এনে বলল, বাঃ, সুন্দর তো বিড়ির কৌটোটা; এটা তো নস্যির কৌটো। তুই কোথায় পেলি?
বিড়িটা কায়দা করে আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে নেশাখোর মানুষের মতো সবুজ বলল, দে, তোর লাইটারটা দে। বিড়ি টানা আমার অভ্যেস আছে। আগে কুমড়োর শুকনো লতা কেটে বিড়ির মতো ধরিয়ে টান দিতাম। তাতে গলগল করে ধোঁয়া বেরত। আর কি আনন্দই না হত।
হাওয়ায় লাইটার জ্বালতে অসুবিধা হচ্ছিল সবুজের, বিরক্ত রঘুনাথ তার হাত থেকে লাইটারটা কেড়ে নিয়ে বলল, বিড়ি খাওয়া যে সে লোকের দ্বারা হয় না। বিড়ি খেতে গেলে বুকের ছাতিতে দম থাকা দরকার। তোর তো চড়ুইপাখির মতো ছাতি। এতে আর কতটুকু দম পাবি?
রঘুনাথের কথায় হীনমন্যতায় ডুবে গেল সবুজ, গলার রগ টানটান করে বলল, অত কথা না বলে বিড়িটা ধরিয়ে দে।
আমগাছের আড়ালে গিয়ে হাওয়া আটকাল রঘুনাথ। ফস ফস করে বার দুই-বিড়িটা টেনে সে ধরিয়ে দিল সবুজের হাতে, সতর্ক করে বলল, ধীরে ধীরে টান দিবি। তাড়াহুড়ো করতে গেলে শ্বাসনালীতে ধোঁয়া আটকে মরবি। তখন আর কাশি থামবে না।
