শুভ এ কথার কী উত্তর দেবে বুঝে পেল না।
গা জড়াজড়ি কোয়ার্টারগুলো থেকে হ্যারিকেনের আলো এসে পড়েছে রাস্তায়। রাস্তার দু-ধারের ঘাসগুলো শিশির জলে মুখ ধুয়ে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে।
শুভ অতসীপিসির বেড়ার শেষ প্রান্তে এসে বলল, তুই এখানে দাঁড়া, আমি অনেকক্ষণ ঘর থেকে বেরিয়েছি। মার সঙ্গে দেখা করে আসি।
–চল, আমিও তোর সঙ্গে যাব।
ইচ্ছে না থাকলেও সবুজকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে এল শুভ।
সরস্বতী খুশি হল না সবুজকে দেখে, তুই আবার শুভর সঙ্গে মিশছিস, তোর বাবা দেখতে পেলে আমাদেরই গালিগালাজ দেবে।
–তুমি থাম তো কাকিমা। সবুজ কিছুটা উত্তেজিত, তোমাদের কি ছোঁয়াচে রোগ হয়েছে যে আমি তোমাদের সঙ্গে মিশব না। শুভ আর আমি এক ক্লাসে পড়ি। এক জায়গায় থাকি। বাবা বললেই কি আমাদের মেলামেশা বন্ধ করে দিতে পারবে। এ ব্যাপারে বাবা যদি জোর করে, গালমন্দ দেয় তাহলে দেখবে তোমরা-একদিন আমি ঠিক ঘর ছেড়ে পালাব। ওরা তো আমাকে চেনে না, যেদিন চিনতে পারবে, সেদিন কপাল চাপড়াবে।
এত কথার পরেও সরস্বতীর মুখখানা কেমন বিবর্ণ দেখায়। চাপা গলায় সে বলল, তোর মনে কোনো ঘোলা জল নেই, তুই তো সাফসুতরো কলের জল। কিন্তু তোর বাবা-মুখের উপর যা না আসে তাই সবার সামনে বলে দেয়। তখন মনে হয় বেঁচে থেকে আমাদের আর কোনো লাভ নেই, এর চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো। সবুজের ফর্সা মুখ রাঙা হয়ে ওঠে লজ্জা আর অস্বস্তিতে। সে কাঁচুমাচু গলায় বলে, কাকিমা, আর কিছু বলল না। এসব শুনতে কার ভালো লাগে বলো। তবে আমি যতটুকু বুঝি-বাবার এসব বলা উচিত নয়। লেখা-পড়া জেনেও বাবা যদি মুখের মতো ব্যবহার করে তাহলে কার আর কি করার থাকতে পারে?
সোয়েটারটা তক্তপোষের উপর রেখে শুভ যখন বেরিয়ে আসবে ঘর থেকে তখন তার পথ আগলে দাঁড়াল সরস্বতী, রাত হচ্ছে, এখন যাবি কোথায়? ঘরে থাক। যা ঠাণ্ডা পড়েছে
শুভ এসব কথা কানে নিল না, মা, বাবা কোথায়?
-সে কোথায় যায়, আমাকে কি বলে যায়! সরস্বতীর গলায় অভিমান ধরা পড়ল, মানুষটা চিরকালই বাহিরমুখী। আমাকে কোনোকালেই সে পাত্তা দিল না। আজ যদি সে আমার কথামতো চলত তাহলে এ সংসারের হাল আজ এমন হত না।
সরস্বতীর চোখ হঠাৎ চিকচিকি কাগজে মোড়ান নতুন সোয়েটারটার উপর পড়ল, উবু হয়ে সোয়েটারটা হাতে নিয়ে সে দেখল, পছন্দ হল তার, এটা কোথায় পেলি রে, শুভ?
-পিসি দিয়েছে।
সরস্বতীর চোখ-মুখের চেহারা বদলে গেল নিমেষে, গদগদ গলায় সে বলল, তোর পিসির দেখছি সব দিকে নজর আছে। শুভ ব্যস্ত হয়ে উঠছিল রঘুনাথের সঙ্গে দেখা করার জন্য, মা, আমাকে যেতে হবে। রঘুনাথ এসেছে। সে একা আছে হাসপাতালের মাঠে।
তাকে এখানে আনতে পারতিস।
দরজার কাছে এসে আবার থমকে দাঁড়াল শুভ, মা, মুড়ি আর পাটালি গুড় এই চিকচিকি কাগজে ভরে দাও। রঘু সারাদিন খেয়েছে কিনা কে জানে। ওর সঙ্গে দেখা হলে ভীষণ মন খারাপ করে শুভর। সে এতদিন জানত–তারাই সব চাইতে গরীব কিন্তু তার থেকেও আরও অনেক গরীব মানুষ আছে এ সমাজে এটা তার বিশ্বাসই হত না। রঘুর সঙ্গে আলাপ হবার পর তার ধারণাটাই বদলে গিয়েছে। এই শীতে রঘুর গায়ে দেবার মতো গরম-পোষাক নেই। একটা পাতলা ফিনফিনে গেঞ্জির উপর গামছা জড়িয়ে সে চলে আসে হাসপাতালে।
ভাঁজ করা দু-হাত মুখের কাছে ধরা। উত্তরের হাওয়ায় সে ঠকঠক করে কাঁপে। তাকে দেখে মায়া হয় শুভর।
সরস্বতীকে বলল, মা আমার তুষের চাদরটা খুঁজে দাও তো।
গায়ে দিবি নাকি?
–না ওটা আমি রঘুকে দেব।
–দিবি মানে? তুই তাহলে কি গায়ে দিবি? অসন্তুষ্ট চোখে তাকাল সরস্বতী, আগে নিজে বাঁচ, তারপর অন্যের কথা ভাববি।
–একথা তুমি আমার মা হয়ে বলছো? শুভ তীরবিদ্ধ চোখে তাকাল। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠতেই সবুজ বলল, তোর আর চাদর দিয়ে লাভ নেই। তার চেয়ে বরং আমি একটা ঘর থেকে এনে দিচ্ছি। আমার দিদি তো পুরনো চাদর গায়ে দেয় না। আমি বরং দিদির চাদরটা চুপচাপ নিয়ে চলে আসি, কেউ টেরই পাবে না।
-সেটা ঠিক নয়। শুভ বোঝাল, যদি কিছু দিতে হয় তাহলে সবাইকে বলে তুই দিবি। নাহলে দেওয়ার কথা ভুলে যা….
শুভর জেদের কথা সরস্বতী সব জানে না। বেশি সময় ব্যয় না করে সে কাপড়ের পুটলিটা নামাল তাক থেকে। পুঁটলি খুলে বের করে দিল মেটে রঙের তুষের চাদর। হাসির ঢেউ থেকে গেল শুভর চোখে, যাওয়ার আগে সে বলল, বাবাকে কিছু বলবে না। বাবা শুধালে বলবে, আমি মাধুবীদের বাড়ি গিয়েচি।
এখনও বিদ্যুৎ-এর আলো আসেনি এ হাসপাতালে। শুধু হাসপাতাল কেন, সারা গ্রাম ডুবে আছে অন্ধকারে। এখন কেরোসিন তেলের আকাল চলছে। ডিলাররা ব্ল্যাকে চড়া দামে বেচে দিচ্ছে তেল। ধরা পড়ে হেনস্থা হচ্ছে কেউ কেউ। তবু শিক্ষা হচ্ছে না কারোরই। খবরের কাগজ পড়ে কত জেনেছে শুভ। এই হাসপাতালে ডাক্তারবাবুর বাড়িতেই খবরের কাগজ আসে। তাও এ গ্রামে পৌঁছতে দশটা-এগারটা বেজে যায়। শুভ সময় পেলেই ডাক্তারবাবুর বাড়িতে এসে খবরের কাগজ পড়ে যায়। প্রথম পৃষ্ঠায় যে কার্টুনটা ছাপা হয় সেটাই তার প্রিয়। শুভ তার বোর্ড বাঁধানো সাদা খাতায় রোজকার ব্যঙ্গচিত্রটি টুকে রাখে। এভাবেই ব্যঙ্গচিত্র এঁকে তার তিনটে খাতা শেষ হয়ে গেছে, আগের তুলনায় রেখাগুলো আরও জোরালো হয়েছে, আরও ভালো হয়েছে তার উপস্থাপন ক্ষম।
