-না থাক। অতসী পিসি অজান্তে হাসলেন, শুভ তার সুন্দর চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে থাকল অপলক, জান পিসি, তোমার মতো এত ভালো চোখ এ হাসপাতালে আর কারোর নেই। তুমি যেমন দেখতে ভালো, তেমনি তোমার মনটাও ভালো। আমার মা বলে, তুমি না থাকলে আমাদের সংসারটা ভেসে যেত।
অতসীপিসি অবাক হয়ে শুনলেন শুভর কথা, নারে বোকা, তা নয়। তোর মায়ের মধ্যে এখনও গ্রামের সদ্গুণগুলো হারিয়ে যায়নি। আর তাছাড়া, তোদের যেখানে দেশের বাড়ি-তার মাত্র মাইল খানিক দুরে আমার বাপের বাড়ি। তোর বাবাকে আমার বাবা-দাদা সবাই আগে থেকে চিনত। আমিও হয়ত তোর বাবাকে দেখেছি ছোটবেলায়। এখন ঠিক মনে করতে পারি না। অবনী দেশে গেলে হাজার কাজ থাকলেও একবার সে আমাদের বাড়িতে যাবেই যাবে। আমার দাদা ওকে ভীষণ ভালোবাসে। কী বলে জানিস? বলে অবনীর মতো ভালো মনের মানুষ সারা দেশ-গাঁ ঘুরে এলে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
শুভ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে অতসীপিসির সামনে। সারা ঘরে ভুরভুর করছে নারকেল তেলের গন্ধ। ঘরও যে মন্দির হয়ে ওঠে এটাই বুঝি তার উৎকৃষ্ট নমুনা। চুল বেঁধে খুবই সুখী ভঙ্গিমায় গা-হাত ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন অতসীদিদিমণি। শুভর দিকে স্নেহের চোখে তাকালেন, আর তাতেই শুভ যেন টের পেল একটা অদৃশ্য শক্তি তার শরীরে ঢুকে তাকে বলবান আর জেদী করে তুলছে।
-পিসি, এবার আমি যাই। সন্ধে হয়ে এল বলে।
অতসীদিদিমণি শুভর মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তোর রেজাল্টের খবর আমি শুনেছি। এই হাসপাতালের প্রত্যেককেই আমি তোর উদাহরণ দিই। যারা পড়াশোনা করে না, ফঁকি মারে তাদেরকে বলি তোর মতো হওয়ার জন্য। কেন বলি–জানিস? তোর উপর আমার বিশ্বাস আছে। অতসীদিদিমণির চোখের তারা চকচকিয়ে উঠল কিসের ভরসায়, ঈষৎ কণ্ঠস্বর দুলে উঠল তার, মোহাবিষ্ট স্বরে বললেন, তুই আমার দেশের ছেলে। তোকে প্রমাণ করে দিতে হবে–তুই মাধুরীর চাইতে কোন অংশে কম নয়। সেদিন কথায় কথায় ডাক্তারবাবু অনেক বাজে কথা শোনালেন আমাকে। আমি সেসব কথার প্রতিবাদ করেছি। বলেছি–প্রতিভা আর পরিশ্রমের কাছে প্রাচুর্য মাথা নত করতে বাধ্য। ডাক্তারবাবু আমার কথাটা মানেনি। তোকে সেটা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিতে হবে। আমি যদি না মরে যাই হঠাৎ করে তাহলে তুই আমার স্বপ্নটাকে সত্যি করে দেখাস। আমার তো ছেলেপুলে নেই। তোরাই আমার সব।
অতসীপিসি উবু হয়ে খাটের তলা থেকে বের করে আনলেন একটা কাপড়ের প্যাকেট। একটা লাল রঙের সোয়েটার সেই প্যাকেট থেকে বের করে অতসীপিসি বললেন, এটা তোর জন্য কৃষ্ণনগর থেকে কিনে এনেছি। হাসপাতালের গাড়ি গিয়েছিল, আমিও গিয়েচিলাম সেই গাড়িতে। ওখানে গিয়ে মনে হল–তোর জন্য একটা সোয়েটার কেনার দরকার। তোর তো ভালো সোয়েটার নেই। এবার থেকে এটা পরবি
আমি নেব না। মা যদি কিছু বলে। সোয়েটারটা হাতে ধরে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে ছিল শুভ।
শুভ বলল, পিসি, এটা থাক।
–কেন থাকবে? আমি বুঝি তোদের কেউ নই? অতসীপিসি কোনো কথা শুনলেন না, বরং জোরের সঙ্গে বললেন, ক্লাস নাইনের বই কেনার ক্ষমতা তোর বাবার নেই। ঘরে থাকলে তোর বাবাকে একবার পাঠিয়ে দিবি তো?
শুভ ঘাড় নেড়ে বাইরে আসার চেষ্টা করলে অতসীপিসি তার হাত ধরল, যাবি তো, এত তাড়া কেন? মিষ্টি এনেছিলাম, খেয়ে যা।
অতসী পিসির আন্তরিকতার কোনো সীমা নেই।
শুভ টেবিলের উপর কাচ বাঁধানো একটা পুরুষালি ফটো দেখে বলল, এটা কার ফটো পিসি?
–আমার এক আত্মীয়ের।
–এখানে কোনোদিন আসেননি তো?
-খুব ব্যস্ত মানুষ। আসার একদম সময় পায় না। অতসীপিসির গলা বুজে এল আবেগে। কিছু একটা ঘটনা তিনি লুকাতে চাইছেন সযত্নে। শুভ শুধালো, পিসি, ওঁর বাড়ি কোথায়?
শুভর অতিরিক্ত কৌতূহল দেখে বিরক্ত হলেন অতসীপিসি, তোর এত খোঁজ খবর নিয়ে কি লাভ? তুই কি সেখানে যাবি নাকি?
বিব্রত শুভ মুখ নামিয়ে নিল লজ্জায়।
খোলা জানলা দিয়ে অন্ধকারের রেণু ঢুকে আসছে গুঁড়ি গুঁড়ি। সন্ধে নামতে আর বেশি বাকি নেই। শুভ দেখল সবুজ পর্দা সরিয়ে চোখের ইশারায় ডাকছে তাকে।
শুভ বাইরে এসে বড়ো করে শ্বাস নিল।
সবুজ চাপা গলায় বলল, রঘুনাথ এসেছে। তাড়াতাড়ি চল। অনেক কথা আছে। সবুজের চোখ-মুখ বলছিল কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এ সময় বাঘা থাকলে তার ঘরে ঢোকার সাহস-ই হত না।
হাতের সোয়েটারটা নিয়ে সমস্যায় পড়ল শুভ। এত কিছু নিয়ে রঘুনাথের সঙ্গে দেখা করতে ভালো লাগবে না। রঘুনাথ তার কাছে যত হম্বিতম্বি করুক এমনিতে সে মুখচোরা।
শীতের দাপটে চারপাশ মাথা ধরা রুগীর মতো বেজার হয়ে আছে। আজ সারাদিন শুভরও কম ধকল গেল না। এখনও বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। অভিমানের পাঁচিলটা এখনও কোনো তরফে কেউ ভেঙে দেয়নি।
শুভ আর সবুজ রাস্তায় এসে দাঁড়াল। হামাগুড়ি দেওয়া অন্ধকার এবার যেন মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। শনশনানো হাওয়ায় শীত খামচে দিয়ে যায় গায়ের চামড়া। সবুজ শীত সামলাতে তৎপর। হাফহাতা সোয়েটারের উপর সে চাপিয়েছে ফুল-হাতা সোয়েটার। গলায় হাতে বোনা মাফলার। তবু সে জড়োসড়ো হয়ে বলল, যতদিন না বুক-লিস্ট বেরয় ততদিন আমি বই ছোঁব না। বাবা আমার কি করবে? আমার পাশ করা নিয়ে কথা। প্রতিবছর আমি ঠিক পাশ করব।
