জড়তা কাটিয়ে রঘুনাথ বাঁশি তুলে নিল হাতে, ফুঁ দিয়ে মনের মতো সুর না ওঠায় বাঁশিটাকে ভিজিয়ে নিল জলে। বাড়তি জলটুকু ঝেড়ে সে আবার ফুঃ দিল বাঁশির মুখে। ভারী হয়ে সুর উঠল বাতাস পেঁচিয়ে। শুভর মনে হল সুর যেন আর কিছু নয়, কঞ্চি বেড়ায় পেঁচিয়ে ওঠা শিমলতা, যাকে ছোঁয়া যায়, ধরা যায় আর আদর করা যায়। শুভ মনে মনে ভাবল বাঁশি তাকে যে করেই হোক শিখতে হবে। বাঁশি শেখায় তেমন কোনো খরচ নেই। সাঁঝবেলায় রঘুনাথের ঘরে চলে গেলেই হল। সে গেলে রঘুনাথ খুশিই হবে।
অতসী পিসি ডিউটি রুমে চলে যাবার পর, পকেট থেকে দু-টাকার একটা নোট বার করে আনল শুভ। রঘুনাথের হাতে দিয়ে বলল, নে। এটা তোর।
–তোরা খুব বড়োলোক, তাই না? রঘুনাথ বোকার মতো প্রশ্ন করল। হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না শুভ। এই পৃথিবীতে অন্তত একটা মানুষের চোখে সে বড়োলোক–এই ভেবে তার গর্ববোধ হল। আসল সত্যটা আড়াল করে শুভ বলল, আমার কাছে দু-টাকা যোগাড় করা কোনো ব্যাপার নয়। শুভ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, অতসীপিসির বাগানে কাজ করে দিলে টাকার কোনো অভাব হয় না। অতসীপিসি দু-হাত ভরে টাকা দেন। ওরকম মনের মানুষ এ হাসপাতালে আর দুটি নেই।
রঘুনাথ ঝিম ধরে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর দুঃখী গলায় বলল, এত বড়ো গাঁ, কেউ দুটা পয়সা ভিখ দিতে চায় না। অথচ, দেখ-সবার কত কি আছে?
-দুঃখ করিস না। দুঃখ করলে দুঃখ বাড়ে। শুভ বোঝাতে চাইল, সব ঠিক হয়ে যাবে। যারা সৎ পথে চলে, ভগবান তাদের ফেরায় না। আমার মা কী বলে জানিস–এই কষ্ট পাওয়ার মধ্যে কোথাও সুখ আছে।
তোর এই কথাগুলো আমি মানি না। রাগে গর্জন করে উঠল রঘুনাথ, ভগমান বড়োলোকর ঘরে পাত পেড়ে বসেছে, আমাদের ঘরে সে কী পাবে-খুদকুঁড়া ছাড়া তো কিছু জুটবে না তার কপালে।
আজ আর বাগানে কাজ করতে দিল না অতসীপিসি।
মন খারাপ করে শুভ যখন ফিরে যাবার কথা ভাবছে তখন অতসীপিসি তাকে বলল, ঘরে এসে বস। দরকার আছে।
পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে এল শুভ। এ ঘরে তার কোনো বাধা নিষেধ নেই, যেখানে খুশি সে যেতে পারে। অতসীপিসির যখন নাইট ডিউটি থাকে তখন সবুজকে নিয়ে বড়ো খাটটাতে ঘুমায় সে। আবার সকাল হলে যে যার বাড়িতে চলে যায়। সবুজ সঙ্গে থাকলে তার পড়াশোনা একদম হয় না। বড়ো ফাঁকিবাজ ছেলে সবুজ। শুভ তাকে বুঝিয়েও পারেনি। সবুজ সব কিছুকে হালকা করার জন্য বলে, গাছের পাতা কি লেখাপড়া শেখে? শেখে না তো! তাহলে আমি সবুজ হয়ে কেন পড়ব? দিনরাত পড়তে আমার বয়ে গেছে। ছোটখাটো সবুজ রাতদিন খালি বাঘার পেছনে লেগে আছে। ওদের কোয়ার্টার পাশাপাশি, তাই বাঘা কুকুর আর সবুজের দেখা হয় ঘন ঘন। অতসীপিসি ডিউটিতে চলে গেলে বাঘা ছাড়া থাকে, কেউ বাগানের ফুল বা বেড়া ভাঙতে এলে বাঘা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাবে বলখেলার মাঠ পর্যন্ত। দেশী কুকুর যে এত বিক্রমশালী হয় তা বাঘাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। পলাশী হাসপাতাল চত্বরে ছোট্ট বাঘাকে প্রথম দেখেন তিনি। উলের বলের মতো নরম তুলতুলে তাঁর শরীর। কী সুন্দর, ফুটফুটে চেহারা। মায়ের পেছন পেছন ঘুরঘুর করছিল সে। আর ঠিক তখনই তার মনে হয় একটা কুকুর পুষলে মন্দ হয় না। তাঁর একাকিত্ব ঘুচবে। বাঘার সঙ্গে অন্তত কিছুটা সময় কাটানো যাবে।
সেদিনের বাঘাকে কোলে করে নিয়ে এসেছিলেন অ্যাম্বুলেন্সের কাছাকাছি। ড্রাইভার চিত্রভানু দিদিমণিকে কুকুরের বাচ্চাকে এত ভালোবাসায় কোলে নিতে দেখে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, কোলে যখন নিয়েছেন তখন এটাকে নিয়ে কোয়ার্টারে চলুন। আপনি তো একা থাকেন, পুষবেন। আপনার একঘেয়েমি দুর হবে। পোর ইচ্ছা প্রবল, কিন্তু মা কুকুরটা হাসপাতালের গাড়ির কাছাকাছি চলে এসে এমন ছলছলে চোখে তাকাচ্ছে, যা দেখে অতসী দিদিমণির মনটা বেজায় খারাপ হয়ে যায়। তিনি ভাবছিলেন বাচ্চাটাকে কোল থেকে নামিয়ে দেবেন অন্তত মা কুকুরটার মুখ চেয়ে।
কী মায়ায় বাধ্য বালিকার মতো গাড়িতে উঠে বসেছিলেন অতসী দিদিমণি। ডিউটিতে এসে এই প্রথম তার অন্যধরনের অনুভূতি। সেই অনুভূতি এখন অনেকটাই তার অন্তর জুড়ে ছেয়ে আছে। বাঘা বড়ো হয়েছে, ওকে না দেখলে অতসী দিদিমণির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। বাঘা-বাঘা’ ডাকতে ডাকতে গ্রামে চলে যান খুঁজতে। পেয়েও যান। বকাঝকা করে ফিরিয়ে আনেন বাঘাকে। তিনি যেভাবে, যে ভঙ্গিতে বাঘার সঙ্গে কথা বলেন, অনেকে ভাবেন–বাঘা বুঝি তার সন্তান।
বিকেলের আলো যত কমে আসছিল ততই শীত পড়ছিল জাঁকিয়ে। শেষ ডিসেম্বরের এই সময়টাতে কুয়াশারা হামাগুড়ি দেওয়া ভেড়ার বাচ্চার মতো ধীরে ধীরে ঘাস মাটি আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের জলীয় মুখে শুধু শীতবন্দনা।
শীত শীত অনুভূত হচ্ছিল শুভর, তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছাটা তাই প্রবল হচ্ছিল মনের ভেতর। অতসীপিসি চুল আঁচড়াচ্ছিলেন বড়ো আয়নার সামনে বসে। হাঁটু অব্দি লম্বা চুল বাগে আনতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। বেশির ভাগ দিন চুল বাঁধার জন্য হাঁক পেড়ে ডেকে নেন সরস্বতীকে। ছুটি কিংবা রেস্ট-ডে থাকলে অতসীদিদিমণি কেশ চর্চার দিকে লক্ষ্য দেন। আজ অবেলায় চুল বাঁধতে দেখে কিছুটা অবাক হয় শুভ, মাকে কি ডেকে দেব পিসি?
