গুয়ারাম যখন ভর্তি ছিল তখন পরপর বেশ কয়েকদিন রাত জেগেছে সে। কারা যে গুয়ারামের মাথাটা ফাটিয়ে দিল সে রহস্য এখনো আলোয় আসেনি। তবে রঘুনাথ তক্কে তক্কে আছে, নামটা জানতে পারলে তার বাপের শ্রাদ্ধ দেখিয়ে ছেড়ে দেবে।
আউটডোরের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে রঘুনাথ সুর তুলত আড়বাঁশির, আর সেই সুরে আকৃষ্ট হয়ে আগুন পোকার মতো হাজির হত শুভ। চোখে মুখে ছড়িয়ে যেত অদ্ভুত জ্যোৎস্না মাখা সারল্য। আন্তরিকতা বাড়ার পর শুভই বলেছিল, আমাকে বাঁশিটা শিখিয়ে দিতেই হবে।
-বাঁশি যে শিখবি, তোর বাঁশি কোথায়? রঘুনাথের মোটা ঠোঁটে রোদ লাগা বনআলু পাতার মতো হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অপেক্ষা শেষ হতেই সে দেখতে পেয়েছিল বাঁশি হাতের রঘুনাথকে। সদ্য তৈরি করা বাঁশিটা শুভর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে বলেছিল, এই নে তোর বাঁশি। এই বাঁশি বানাতে গিয়ে আমি পুড়ে গেলাম। গনগনে লোহার শিকের ছ্যাঁকা খেলাম।
শুভ হা-করে তাকাল রঘুনাথের দিকে, বাঁশি তৈরি করতে গেলে বুঝি ছ্যাঁকা খেতে হয়?
রঘুনাথ তার সন্দেহ কাটিয়ে দেবার জন্য বলেছিল, আগুন আর লোহা না হলে বাঁশিতে ফুটো হবে কি করে? কাঠ কয়লার আগুনে লোহার শিক ফেলে রেখে তাতাতে হয়। শিক লাল হলে সাঁড়াশিতে ধরে ছাতার বাঁটে গুঁজে দাও। সামান্য ধোঁয়া বেরনোর পরে ছিদ্র হয়ে যাবে। এভাবে ছটা ছ্যাদার দরকার। নাহলি যে সুর খেলবে নি। আর হ্যাঁ, ফুঃ দেবার জন্য আর এট্টা বড় ছাদা চাই। মোট সাতটা ছ্যাদা না হলে বাঁশি যে বাজে না। রঘুনাথ তৃপ্তির হাসি হাসল। শুভর হাত থেকে বাঁশিটা কেড়ে নিয়ে উদাসী ফুঁ দিয়ে সুর ভাসাল বাতাসে। মুহূর্তে পাল্টে গেল হাসপাতালের রূপ ও চেহারা। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল বাতাস। কোথা থেকে ছুটে এল। সুগন্ধ ঘ্রাণ। আকাশের চাঁদ বুঝি ঝরিয়ে দিল জ্যোৎস্নাস্রোত।
মুগ্ধ বিস্ময়ে শুভ চেয়ে থাকল রঘুনাথের দিকে। সাধারণ চেহারায় কী অসাধারণ জ্যোতি বের হয় তখন। ঝাঁকড়া চুলের রঘুনাথ যেন কৃষ্ণ অবতার। তার পেশীবহুল চেহারায় কদমের কচি পাতার লাবণ্য। কালো কুচকুচে চোখ দুটো যেন আভা ছড়িয়ে দেয়। জোড়া জ্বর নীচে কিছুটা চ্যাপ্টা নাক তাকে জেদি করে তোলে আজন্ম।
খুশিতে টগবগ করে শুভর হৃদয়, বড়ো পকেটের ভেতর থেকে সে বের করে আনে মুঠো মুঠো মুড়ি। মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মুড়িগুলো পকেটে ভরে নিয়েছে সে। মা জানতে পারলে কোনো ক্ষতি ছিল না। ধরা পড়ে গেলে সে বলত, রাস্তায় যেতে যেতে খাবো।
মুড়ি আর পাটালি গুড় পেয়ে রঘুনাথের খুশি আর ধরে না। সারাদিন তার খাওয়া দাওয়ার কোনো ঠিক ছিল না। গুয়ারাম হাসপাতালে ভর্তি হবার পর চাল আসেনি ঘরে। চুনারাম জ্বর শরীর নিয়ে ভিক্ষে করতে গিয়েছিল গ্রামের ভেতর। ভিক্ষার চালগুলোতে এতগুলো লোকের পেট ভরেনি। তবু দুর্গামণি নিজে না খেয়ে এক জাম বাটি ফেনভাত দিয়েছিল তাকে। রঘুনাথ মায়ের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে কী বুঝে যেন খেল না। দুর্গামণি খাওয়ার জন্য জোর করলে রঘুনাথ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলেছিল, আমার খাওয়ার জন্য তুই ভাববি নে, মা। আমার জন্যি খাওয়া নিয়ে হাসপাতালের লোক বসে আছে। হাসপাতাল থিকে যা ভাত দেয়, বাপ অত ভাত খেতি পারে না। বাপের খাওয়া হয়ে গেলে সেই ভাতগুলো আমি খেয়ে নিই। এছাড়া বাড়তি ভাতও ঠাকুরমশাই আমাকে দিয়ে দেয়। একটা তো পেট। কত আর খাবো মা!
.
৩৫.
গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলে তৃপ্তি পায় রঘুনাথ। এত সরল, সাদাসিধে গেয়ো মেয়েমানুষকে বুঝিয়ে শান্ত করে দিতে বেশি সময় লাগে না রঘুনাথের। ছেলের প্রতি এত বিশ্বাস যা বলবে তা মেনে নেবে দুর্গামণি।
মুড়ি আর পাটালি গুড়ের আলাদা গন্ধ আছে। খাওয়ার শব্দও আলাদা। তবু শুভর মনে হয়–মুড়ি চিবানোর শব্দের সঙ্গে কলিজার ধক ধকাস শব্দের বহু মিল আছে।
রঘুনাথ মুখ ভরে মুড়ি খায় আর প্রতি কামড়ে ভেঙে নেয় পাটালি গুড়। শুভ চেয়ে চেয়ে দেখে।
রঘুনাথ বলে, এ বছর এই প্রথম পাটালি গুড় খেলাম। এখন যা পাটালির দাম–তুই না আনলে কবে যে খেতাম কে জানে।
রঘুনাথ জল খাওয়ার জন্য মাঠের কলটার কাছে হেঁটে গেল। রোগীদের জল খাওয়ার জন্য সরকার থেকে কলটা বসিয়ে দিয়ে গেছে। হাসপাতালের এই চাপা কলটার জল ভীষণ ঠাণ্ডা।
হ্যান্ডেল দাবিয়ে জল বের করে আনছিল শুভ, ঈষৎ ঝুঁকে আঁজলা ভরে জল খাচ্ছিল রঘুনাথ। এ সময় যে অতসীপিসি ডিউটি ছেড়ে বাইরে এসে যাবে ভাবেনি তারা। শুভ আর রঘুনাথ দুজনেই ভ্যাবাচেকা খাওয়া চোখে তাকাল। অতসীপিসি হাসি ছড়িয়ে দিলেন ঠোঁটে, শুভকে শুধোলেন, কি ব্যাপার, এত রাতে কি করছিস এখানে? তোর পড়াশোনা নেই?
শুভ দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলেছিল, রঘুনাথের বাবা ভর্তি আছে হাসপাতালে। জান, পিসি রঘুনাথ ভালো বাঁশি বাজায়। এই দেখ–এই বাঁশিটা ও আমার জন্য তৈরি করে এনেছে।
অতসীপিসি বাঁশিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন, খুশি হলেন তিনি। ঘাড় তুলে রঘুনাথের দিতে তাকালেন, কী নাম তোমার?
-আজ্ঞে, রঘুনাথ!
থাকো কোথায়?
–হলদিপোঁতা ধাওড়ায়।
অতসী পিসি উৎসাহিত হলেন, তুমি বাঁশি বাজাতে জানো বুঝি? বাঃ, ভীষণ গুণী ছেলে দেখছি। আচ্ছা, এখন একটু বাঁশি বাজাও না, আমার শুনতে ভীষণ ইচ্ছে করছে।
