শুভ হাসল।
-পিসির আজ ডিউটি নেই।
-তাতে কী হয়েছে। তুমি আমার সাইকেলটা নিয়ে চালাতে পার। গিয়াস বলল, আমি জানি-সাইকেল চালানোর নেশাটা কী রকম।
শুভ বলল, আজ আর চালাব না। পিসির বাড়ি যেতে হবে। ওখানে বাগানের কাজ আছে।
–ঠিক আছে যাও। রস খেতে মন হলে কাল ভোরে চলে এসো। জিরেন কাট রস খাওয়াতে পারব। গিয়াস তার দাড়িতে হাত বুলিয়ে দূরের দিকে তাকাল, এবছর তেমন আর শীত পড়ল কই? শীত না পড়লে খেজুরগাছ রস ঝরাতে চায় না।
মাধুরী পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। খেজুরের রস খাওয়ার থেকে তার গন্ধটা ভালো লাগে তার। গিয়াস দু-একবার যে তাদের বাড়িতে রস পৌঁছায়নি এমন নয়। তার মা খেজুরের রস খেতে ভালোবাসে। ডাক্তারবাবুকে রস খাইয়ে হাতে রাখতে চায় গিয়াস কেন না আগামী বছরও সে যদি গাছকাটার চুক্তিটা পায় তাহলে তার অভাবের সংসারে একটু গুছিয়ে নিতে পারে। তবে গিয়াসের ব্যবহার ভালো, সে এই হাসপাতালের সবার মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করে।
গিয়াস মাধুরীকে তুষ্ট করার জন্য বলল, কাল সকালে তোমাদের ঘরে রস দিয়ে আসব। ভোর ভোর ওঠো তো তোমরা?
মাধুরী ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চলে যেতেই গিয়াস খুশি হয়ে বলল, অত বড়ো মানুষের মেয়ে, দেখো মনে কোনো অহঙ্কার নেই। আসলে শিক্ষা, শিক্ষাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।
হাতে কাজের কোনো কমতি নেই, গিয়াস হড়বড়িয়ে চলে গেল। আজ বছর দুয়েক থেকে এই মানুষটাকে দেখছে শুভ। কাজের মধ্যেই ডুবে থাকে সারাক্ষণ, কাজই যেন তার আল্লা। গেল বছর গাছঝোড়ার সময় একটা ক্ষরিস সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়েছিল খেজুরগাছের মাথায়। আর একটু হলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যেত গিয়াসের, সে যাত্রায় বুদ্ধির জোরে সে বেঁচে গেল। হাতের ধার ঘেঁসো দিয়ে সজোরে একটা কোপ মেরেছিল সাপের শরীর লক্ষ্য করে। এতেই কাজ হয় মোম। দ্বিখণ্ডিত সাপটি রক্তশরীর নিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল মাটিতে। নিজে বেঁচে কিন্তু সাপটার জন্য সে হা-হুতোশ করে কাঁদছিল কপাল চাপড়িয়ে। বারবার করে বলেছিল, আল্লা রহিমের কী খেলা! একটা জান বাঁচাবার জন্য আর একটা জানকে কুরবানী দিতে হল!
সেই কাটা সাপটা দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিল হাসপাতালের ছেলে-মেয়েরা। ভয়ে দশ হাত পিছিয়ে গিয়ে তারা মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছিল যে যার মতো। অবনী গিয়াসের কাছে গিয়ে তার ঘর্মাক্ত পিঠে হাত রেখে বলেছিল, শোক করে কি হবে ভাই? যা হবার তা হবেই। যা হয়েছে তা তো তোমার ইচ্ছায় হয়নি। এসব আগে থেকে উপরওয়ালার কাছে লেখা ছিল।
গিয়াসের স্বাভাবিক হতে সময় লাগছিল, গামছায় মুখের ঘাম মুছে সে আতঙ্কিত গলায় বলেছিল, তুমি ঠিকই বলেছে দাদা, এসব আগে থিকে লেখা থাকে। নাহলে এত গাছ ঝড়ছি-বই কোনো গাছে তো সাপ বেরয় নি!
সেদিন একটা বিড়ি দিয়েছিল অবনী, তারপর পাথরপোরা লাইটারটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, মন খারাপ করো না। বেঁচে থাকতে গেলে এরকম কত ঘটনার সাক্ষী হতে হবে। ভেঙে পড়ো না ভাই। নিজের কাজ নিজে করে যাও। তার মধ্যে সব শান্তি তুমি খুঁজে পাবে।
শুকনো পাতা, খড়কুটো জোগাড় করে আগুন ধরিয়েছিল অবনী। সেই দাউ দাউ আগুনে সাপটাকে লাঠিতে করে ছুঁড়ে দিয়েছিল সে। ধোঁয়ারকুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতেই হঠাৎ একটা শব্দ হল। ভয়ে পিছিয়ে গেল বাচ্চাকাচ্চার ভিড়। অবনী সবাইকে সতর্ক করে বলল, তোরা সব সরে দাঁড়া। বিষের থলি ফেটে গিয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে, আর কারোর যদি গায়ে লাগে তাহলে আর রক্ষে নেই!
শীতের বিকেলে অভিমান বড়ো তীব্র হয়।
শুভ হাঁটতে হাঁটতে কিচেন পেরিয়ে চলে এসেছে অনেকটা। এই হাসপাতালের চেনা পরিমণ্ডল তাকে যেন পাগল করে দেয়। অভাব আছে এখানে, ক্ষতি নেই। ভালোলাগা যা আছে তার দাম কি পয়সা দিয়ে মেটানো যায়? আজ হঠাৎ তার মনে পড়ছে রঘুনাথের কথা। রঘুনাথ তার চেয়ে বয়সে বড়ো তবু বন্ধুত্ব গড়তে কোনো অসুবিধা হয়নি। ছেলেটার মন জলের মতো সরল। রঘুনাথকে দেখলে শুভর বুঝি আকাশ দেখা হয়ে যায়। এই বয়সে কত কি জেনেছে সে। সে যত পাখির নাম জানে তার অর্ধেক নাম এ গাঁয়ের অনেকেই জানে না। রঘুনাথের বাঁশি শুধু সুর তোলে না, চোখে জল এনে দেয়। বাঁশিটা ওর কাছ থেকে শিখতেই হবে। বাংলার মাস্টারমশাই বলেছেন, কথা সাহিত্যিক শরচ্চন্দ্ৰ ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। রঘুনাথ বলেছে, মিতে, তোর জন্য বাঁশি কেন আমি আমার কলিজা উপড়ে দিতে পারব। তোকে একটা কথা বলি–আমি বড়ো ভালোবাসার কাঙালরে! এ গাঁয়ের কেউ আমাদের ভালো চোখে দেখে না। সবাই ভাবে কী গরীব হলে বুঝি চোর হয়।
রঘুনাথের বুকের ভেতরটা জ্বালাপোড়া করছিল কথাগুলোকে উগরে দেবার জন্য। বাবুসমাজে তাদের সেরকম ঠাঁই নেই। আবার তাদের সেবা না নিলে বাবুদের চলেও না। ওরা গাঁয়ের একধারে পড়ে আছে, ওদের যে কেউ দেখেও দেখে না। শুধু ভোটের সময় খাতির বেড়ে যায় ওদের। টিন টিন গুড় পচানো মদ এনে বুনোপাড়ায় বিলানো হয়। কেউ তখন একটা প্রতিবাদও করে না। আসলে মানুষগুলোর প্রতিবাদ করার মতো ভাষা নেই, ভাষা থাকলেও সাহস নেই। কেউ যে মাজা সোজা করে দাঁড়াবে, দু-চারটে কথা বলবে-তেমন মানুষও পাওয়া ভার। রঘুনাথ হাতের মুঠি পাকিয়ে বলে, তোদের হাসপাতালের অতসী নার্স ছাড়া আর কেউ তেমন একটা ভালো নয়। সবাই দেখছি গা এড়িয়ে ডিপটি করছে। উগীদের উপর কারোর কোনো দায় নেই। সব আসে যায় মাহিনা পায়, ব্যাস!
