-তুই অনেক কিছুই জানিস। আমি তো কিছুই জানি না এসব। মাধুরী নিজের দোষ খণ্ডন করে নিয়ে বলল, আমার বাইরে বেরনো হয় না। দাদুর বাড়িতে যাওয়ার সময় ব্রিজটাকে আমি দেখেছি। খোড়ে নদীর বুকের হাড়-পাঁজরার মতো মনে হয়।
শুভর মনে পড়ে যায় কত কথা।
দেশ বাড়িতে যাওয়ার সময় অবনীর মাথাটা বুঝি খারাপ হয়ে যায়।
কোথাও যেতে গেলে অন্তত একমাস আগে থেকে তার প্রস্তুতি শুরু হয়। সবার মাথা খারাপ করে দেবার মতো অবস্থা, ব্যাগ গোছানো শুরু হয় ডাক্তারবাবুর সম্মতি পাওয়ার পর থেকে। ছুটি মঞ্জুর হলে মন আর তখন কালীগঞ্জে থাকে না তার। ঐ অজ পাড়াগাঁয়ে কী মধু যে রাখা আছে তার জন্য সরস্বতীও বুঝতে পারে না। গড়িমসি করলে অবনীর কাছে বকা খায় সে। বিড়ি থেকে গামছা–সব নেওয়া চাই সঙ্গে। নদীয়া-নবদ্বীপ বলে কথা। দেশের মাটিতে পা দিলেই আতিকুটুমরা বলবেন, কই গো মুরুব্বি, গটে লদীয়ার বিড়ি দাও। পুণ্যধামের বিড়ির নেশা হয়ত বহুত জোর হবে।
বান্ডিল খুলে সবাইকে একটা-একটা করে বিড়ি ধরিয়ে দেয় অবনী। নিজে আর নদীয়ার বিড়ি খায় না। ওসব বিড়ি খেয়ে খেয়ে অরুচি ধরে গেল। সেও হাত বাড়িয়ে দেয় আত্মীয়তার, দাও গো, আমাকে একটা এগরার বিড়ি দাও। আমিও মুখ বদল করি।
শুধু বিড়ি নয়, চা পাতা গুঁড়ো দুধ আর চিনি সঙ্গে করে নিয়ে যেত অবনী। গাঁ- ঘরে এসব জিনিস চট করে পাওয়া যায় না। চিনি পাওয়া গেলেও চা আর গুড়ো দুধ তখন বিলাসিতার সামগ্রী। সকালে চা না খেলে তার পেট খোল হবে না, মাথা ধরে যাবে গ্যাসে, পেটের ভেতর ভুটভাট আওয়াজ আর অস্বস্তি। বড়ো জামবাটিতে চা ফুটছে টগবগিয়ে। সবাইকে চা-করা শেখাচ্ছে অবনী। গর্বে বুকের ভেতরে খোল করতাল বাজছে সরস্বতীর। গ্লাসে গ্লাসে বিলি হয়ে যায় ধোঁয়া ওঠা চা। গরম চায়ে চুমুক মেরে আঃ’ শব্দের যে অলৌকিক উচ্চারণ তা যেন দেশ-গাঁয়ের একঘেয়ে বাতাসকে ধনী করে তোলে। ছুটির দশ-পনেরটা দিন অবনীর যেন দম ফেলবার ফুরসত নেই। গা-ভর্তি আত্মীয়কুটুম। সবার বাড়িতে একদিন করে গেলে আরও যে কত ঘর বাকি থেকে যায়, তার কোনো গোনাগুনতি নেই। সময়হীনতার অজুহাতে অভিমানের পারদ বাড়ে। কেউ আবার আক্ষেপের সঙ্গে বলে, মোর ঘরে কেনে যাবা গো দাদা, মোর মেনে গরীব মানুষ। খাইতে পরতে দিতে পারবানি। তুমি চাকুরিয়া মানুষ। তোমাদের সম্মান কি আমি রাখতে পারি। যা হউক, ভালা থাক সব। গাঁয়ের ধুলো বুঝি ধুলো নয়–সোনা। যে ভাষায় নদীয়ায় কথা বলে অবনী সে ভাষা আমূল বদলে যায় মেদিনীপুরের মাটিতে পা ছোঁয়ালে। শুধু অবনী একা নয়, সরস্বতীও তখন সঙ্গ দেয় ও ভাষায়। নদীয়া-মেদিনীপুরের হৃদয়ের শব্দ মিলেমিশে হয় একাকার।
এত আনন্দ তবু এর ভেতরেও শীতকালের বিষাক্ত সাপের মতো চুপচাপ শুয়ে থাকে দুঃখ আর হতাশা। ফি-বছর দেশ আসার সময় অবনীর পকেট মার হবেই হবে। শিয়ালদা থেকে হাওড়া-এই পথটা কিছুতেই যেন শেষ হয় না। সবাই যেন ওঁৎ পেতে বসে থাকে অবনীর জন্য। অবনীরও সতর্কতার শেষ নেই। টাকাগুলো সে কোমরে বেঁধে রাখে শক্ত করে যাতে কেউ কেটে নিতে না পারে। ট্রামে-বাসে যেখানেই যাক অবনীর টাকা হারাবেই হারাবে। বাস থেকে নেমে টাকার শোকে বুক চাপড়ানো কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। আর তখনই গালিগালাজ শুরু করবে সরস্বতী, মর মর, মুখে রক্ত উঠে মর। গরীবের টাকাগুলান কেড়ে নিলি-তোদের ভালো হবে না। যে হাত দিয়ে টাকা উঠালি, সেই হাতে তোর কুষ্ট হবে। মা বুড়োমা, যে নিয়েছে সে যেন ধড়ফড়িয়ে মরে। তার গায়ে যেন পোকা হয়।
দেশ যাওয়া আর আসা নিয়ে এরকম গল্প শুভর স্মৃতিতে ভরে আছে। বছরে অন্তত দু-বার মেদিনীপুরের মাটিতে পা না দিলে অবনী হাঁপিয়ে ওঠে, একেবারে পাগলের মতো ব্যবহার করে সে।
অতসীপিসি অবনীকে বোঝালে অবনী ডায়ে-বাঁয়ে ঘাড় নাড়িয়ে বলবে, আপনি জানেন না দিদি, দেশের টান যে কী টান! এদেশে খেতে-পরতে পাই, তবু যেখানে জন্মেছি সেখানকার কথা কি ভোলা যায়? চোখ বুজলে রোজ আমি আমার গায়ে যাই। এগরা পার করে মাঠে মাঠে আমি যেন পৌঁছে যাই রুক্মিনীপুরে। পুকুরের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াই। মাছের ঘাই মারা দেখি। চেনা মানুষগুলো আমার বুকের পাথরটা সরিয়ে দেয়।
অবনী যে আত্মীয়তা তার দেশ-গায়ের জন্য অনুভব করে তার সিকি ভাগও শুভর মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ঝড় তোলে না। এর পেছনে কারণটা যে কি তার সূক্ষ্ম হিসাব বা সূত্র টের পায় না সে।
অবনী গম্ভীর হয়ে বলে, বড়ো হ, তারপর বুঝবি? দেশের মাটি না হলে জীবনের কোনো পুজোই তো ঠিক মতো হয় না।
বই কেনা হয়ে গেলে এবারও দেশে যাওয়ার তোড়জোড় করবে অবনী। সে কথা সে শুনিয়ে রেখেছে সরস্বতীকে। কেউ বাধা দিলে তুমুল অশান্তি বাঁধবে ঘরে। একরোখা অবনী তখন কারোর কথা শুনবে না।
কিচেন অব্দি শুভকে এগিয়ে দিয়ে গেল মাধুরী। এ সময় প্রতিদিন হাসপাতালের মাঠজুড়ে নরম আলো খেলা করে। ঝরাপাতা বিছিয়ে যায় ঘাসের বিছানায়। রসকাটা গাছি তার মাটির হাঁড়িগুলো নিয়ে গুছিয়ে রাখছে কাঁঠালগাছটার গোড়ায়। খেজুরের গাছ কেটে ঠিলি বেঁধে সে তার কুঁড়ে ঘরে ফিরে যাবে সাঁঝবেলায়। শুভকে দেখতে পেয়ে গিয়াস বলল, আজ কই সাইকেল চালাতে দেখলাম না তো?
