তর্ক না করে চেষ্টা কর। বিরক্তিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তারবাবু, শুভ যদি পারে, তুই কেন পারবি না? ওকি তোর মতো ভালো-মন্দ খেতে পায়? ওর বাবার সামর্থ কোথায় কিনে দেবে?
শুভর কান ঝাঁ-ঝাঁ করছিল এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ায়। মনে মনে ভাবল টেনেটুনে পাশ করলেই বুঝি ঠিক হত। সেকেন্ড হয়ে সে অনেকের বিষনজরে পড়ে গিয়েছে।
মাধুরী শুভকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে শুধাল, তুই কি ঘর থেকে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলি কথা বলবি না বলে, তাহলে এলি কেন?
মাধুরীর চোখে অভিমান। আশাপ্রদ ফলাফল না করার জন্য তার উপরে কম ঝড় বয়ে যায়নি। মা ছাড়া আজকের দিনে তার পাশে কেউ নেই। শুভ’সব বোঝে। ধীর গলায় সে বলল, রেজাল্ট নিয়ে এত ভাবনার কি আছে? এখনও নাইন-টেন-ইলেভেন পড়ে আছে। আসল লড়াই তো সেখানে।
-তুই সায়েন্স না আর্টস নিবি? মাধুরী ঝুঁকে পড়ল শুভর দিকে।
–আমার ইচ্ছে সায়েন্স পড়ার। বায়োলজি ফোর্থ সাবজেক্ট রাখব। হেডমাস্টারমশাই বলেছেন, যারা অঙ্ক আর বিজ্ঞানে এইটটি পারসেন্ট পেয়েছে কেবল তাদেরই সায়েন্স দেবেন।
মাধুরী মুখ শুকিয়ে বলল, তাহলে তো মাত্র পাঁচজন সায়েন্স পাবে। ধ্যাৎ তা হতে পারে । সায়েন্স যদি ইস্কুলে রাখতে হয় তাহলে অন্তত কুড়ি জনকে তো সায়েন্স দিতে হবে। আর তাই যদি হয় তাহলে দেখবি আশি থেকে শতকরা পঞ্চাশে নেমে এসেছে নাম্বার।
শুভ অনেক ভেবে ঘাড় নাড়ল, তা ঠিক। তবে সায়েন্স পড়তে গেলে খরচ আছে। আমি ভাবছি-বাবা কি পারবে আমাকে পড়াতে? যা বইয়ের দাম। বই-ই কিনে দিতে পারবে না।
তুই এত ভাবছিস কেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। মাধুরীর চোখে বিশ্বাসের রেণু। শুভর কপালে ভাঁজ পড়ল, সব মানুষ যদি তোর মতো হত তাহলে আমার পড়াটা ঠিক হয়ে যেত। সত্যি বলছি–আমিও তোর মতন এত সুন্দর মন পাইনি।
লজ্জায় রাঙা গালে টোল পড়ল মাধুরীর, আমরা কটাই বা মানুষ দেখেছি। আমাদের বয়সই বা কত! ভালোমানুষ সব যুগে ছিল, এখনও আছে।
হয়ত আছে।
আমি এখন আসি। উঠে দাঁড়াল শুভ।
মাধুরী হাত ধরে বসাল তাকে, বস না, কোথায় যাবি? মাকে বলি আচারের তেল আর মটরশুটি দিয়ে মুড়ি মেখে দিতে। পিঁয়াজ কুচি দিতে বলব তো?
শুভ কোনো উত্তর না দিয়ে মাধুরীর মুখের দিকে তাকাল। নিষ্পাপ সরল মুখখানা মেঘহীন নীল আকাশের মতো।
বনশ্রী মুড়ি মেখে নিয়ে এলেন দুটি বাটিতে। শুভকে দেখে হাসলেন, এবার তোর রেজাল্ট শুনে খুশি হয়েছি। এর থেকেও ভালো রেজাল্ট করতে হবে। ভাব তো তোর বাবা কত কষ্ট করে পড়াচ্ছে। আমরা তো সবার কাছে তোর কথা বলি।
শুভ মনে মনে ভাবল, কাকিমা বললেও ডাক্তারকাকু নিশ্চয়ই তার কথা কারোর কাছে বলে না। আত্মগরিমার আঁচে যে মানুষটা সবসময় পুড়ে আছে-তার কাছ থেকে এসব সৌজন্যতা আশা করা ভুল।
শুভ জোর করে হাসবার চেষ্টা করল। মাধুরী বলল, মায়ের কথাটা মনে রাখিস। মা তোকে ভীষণ ভালোবাসে।
-সেটা আমি জানি।
–জানিস যখন তখন এলেই পালাই পালাই করিস কেন? আসবি চুপচাপ বসে থাকবি। আমি না বলা পর্যন্ত কোথাও যাওয়ার নাম করবি না।
শুভ অন্যমনস্ক চোখে তাকাল, একটা কথা সত্যি করে বলবি?
-কি কথা শুনি?
–আগে বুড়োমা ঠাকুরের দিব্যি দে, তারপর বলব।
–আমি চট করে বুড়োমার দিব্যি কাটি না।
–তাহলে থাক।
–না তোকে বলতেই হবে। জোর করল মাধুরী।
শুভ নিস্তেজ গলায় বলল, মায়ের কাছে যে পাঁচশ টাকা দিয়ে এলি ওটা কার টাকা, কিসের টাকা?
–টাকাটা কাকুকে দিয়েছি আমি। মাধুরী বলল, কাকুর দরকার। বাবার কাছে ধার চাইছিল। বাবা হয়ত দিত। কিন্তু আমার মনে হল কাকুর ওটা আজকালের মধ্যে দরকার। তাই আমার কাছে ছিল দিয়ে এলাম।
-কাজটা কিন্তু ভালো করিসনি। শুভ বোঝাতে চাইল, বাবা-মাকে না জানিয়ে তোর এতগুলো টাকা দিয়ে আসা উচিত হয়নি। তাছাড়া, এত টাকা তুই কোথায় পেলি? কাকু জানলে–আমাদের ভুল বুঝবে। ভাববে–আমরা পটিয়ে পাটিয়ে তোর থেকে টাকাগুলো নিয়ে নিয়েছি।
তুই বাবাকে এত খারাপ ভাবতে পারলি? মাধুরীর চোখ ছলছলিয়ে উঠল, বাইরে থেকে বাবাকে যতটা কঠিন বলে মনে হয়–আসলে বাবা তা নয়। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা অনেকটাই ফন্তু নদীর মতো।
শুভ আর কথা বাড়াল ।
মাধুরী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, টাকাটা আমি চুরিচামারি করে দিই নি। আমার জমানো টাকা থেকে দিয়েছি।
–তাহলে ফেরত দিলে নিতে হবে।
–সে আমি নেব। অত চিন্তা করিস না তো। তোদের এখন টাকার দরকার।
তবু যেন মন থেকে মেনে নিতে পারে না শুভ। সেঁক গিলে বলল, আমি বাবাকে বলব-কাকুকে সব বলতে।
-খবরদার, তা যেন করতে যাস না। আমি তাহলে অসুবিধায় পড়ে যাবে। মাধুরী কাঁচুমাচু চোখে তাকাল।
শুভ বলল, ঠিক আছে, আজ আমি আসছি। স্কুল খুললে বুক-লিস্ট দেবে। বাবার মাইনে হলে আমি বই কিনতে কৃষ্ণনগর যাবো।
-হাসপাতালের গাড়ি যাবে, তখনই যেতে পারিস। মাধুরী বুঝিয়ে বলল, আসা-যাওয়ার ভাড়াটা বেঁচে যাবে। বাবা বলছিল–আমাকেও সঙ্গে করে বই কিনতে নিয়ে যাবে। ক্লাস নাইনের বই, বুক-লিস্ট না থাকলেও কেনা যায়। সিলেবাস তো সব এক।
গাড়ি কবে যাবে, জানাস তাহলে? শুভ দূরের দিকে তাকাল, বই কেনাও হবে, খোড়ো নদীও দেখা হবে। জানিস, খোছড়া নদীর যা রূপ, একবার দেখলে নাকি চোখ ফেরানো যায় না। রেল-ব্রিজ আর বাস-রাস্তা পাশাপাশি। লালগোলা ট্রেন যখন যায় ঝমঝম শব্দ হয়। রেল-কামরার জানলা দিয়ে তাকালে কত নীচে জল, বুক হিম হয়ে যায় ভয়ে।
