সুপ্রিয় পোদ্দার যে গ্রামের ছেলে এটা তার চেহারায় কথাবার্তায় বোঝা যায় না। সে রোজই আলাদা-আলাদা জামা-প্যান্ট পরে ইস্কুলে আসে। এসব জামা কাপড় তার মা বহরমপুর, কাটোয়া বা কৃষ্ণনগর থেকে কিনে আনে। ফলে, সে যে ব্যতিক্রমী তা তার চেহারায় ফুটে ওঠে। মাধুরী একেবারেই পছন্দ করে না সুপ্রিয়কে। এই বয়সে এত উপর চালাকি কার-ই বা ভালো লাগে। তবু সুপ্রিয় গায়ে পড়ে বলবে, আজ আমাদের বাড়ি গেলে তোকে একটা আশ্চর্য জিনিস দেখাব।
আগ্রহ প্রকাশ পায় না মাধুরীর কণ্ঠস্বরে, তবু সে বলে, কি দেখাবি কি?
–আমার দাদুর আমলের একটা হাতির দাঁত আছে। আহা, কী সাদা ধবধবে। একবার দেখলে আর চোখ ফেরাতে পারবি না। সুপ্রিয়র কথায় মাধুরীর চোখের তারা কালো আঙুরের মতো চকচকিয়ে ওঠে না। সে বরং অমনোযোগী শ্রোতার মতো চুপ করে থাকে। বেশি বিরক্ত করলে সে সরাসরি সুপ্রিয়কে ধমকায়, আমাকে নিয়ে তোর এত না ভাবলেও চলবে। তুই নিজের চরকায় তেল দে।
তক্তপোষে শুয়ে থাকলে পুরনো রেডিওটার সুইচ অন করে দেয় শুভ। রেডিও শোনা তার কাছে একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। কখনও সখনও তা বাড়াবাড়ি মনে হয় সরস্বতীর কাছে। সে নানা ধরনের গান শুনতে পছন্দ করে। প্রতি রবিবার যে নাটকটা হয়–সেই রেডিও-নাটক শোনার জন্য সারা সপ্তাহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে সে। এখানে সময় কাটতে চায় না কিছুতেই। সব কোয়ার্টারে রেডিও ছিল, শুধু তাদেরই ছিল না। হাজারবার বলার পর অবনী এটি কিনে এনেছে কালীগঞ্জ বাজার থেকে। এ সংসারের কোনো জিনিসই তার কিস্তি ছাড়া কেনা হয়নি। কটাকাই বা মাইনে পায় সে। যা পায় তা ধার মেটাতেই চলে যায়। ফলে টানাটানি লেগেই থাকে। নিজের চোখে সব দেখে দেখে শুভর কেমন বিতৃষ্ণা জন্মায় এই বেঁচে থাকার উপর। স্বচ্ছলতা শব্দটার সঙ্গে তার এখনও পরিচয় হল না–এটাই আক্ষেপ।
রেডিওতে খেয়াল শুরু হতেই সুইচ অফ করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল শুভ। খেয়ালের সে কিছু বোঝে না, তাই শুনতেও ভালো লাগে না।
এক গাদা পুরনো কাপড়ের পোঁটলা বগলদাবা করে ঘরে ঢুকল সরস্বতী। শুভ তখন পারা চটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। বাবার সঙ্গে সেই থেকে কোনো কথাবার্তা হয়নি, সে নিজেই ইচ্ছে করে কথা বলেনি। বাবা তার কাছে দুর্বলতম জায়গা–এটা বুঝতে পারে সে। বাবার প্রতি অভিমান হলেও তা যেন ঝড়ো মেঘের মতো অপসৃয়মান হয় যে কোনোসময়।
সরস্বতী পুরনো কাপড়গুলো তক্তপোষের নীচে নামিয়ে রেখে বলল, কোথায় যাচ্ছিস? যেখানেই যাস না কেন, আগে মাধুরীর সঙ্গে দেখা করে যাবি। সে বেচারি দুপুরবেলায় এসে টাকা দিয়ে চলে গেল। বসতে বললাম, বসল না। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল খুব চাপের মধ্যে আছে।
এতটুকু মেয়ের আর কী চাপ থাকতে পারে? মনে মনে ভাবল শুভ। যাদের কোনো অভাব নেই, অর্থকড়ি আছে–তারা সবরকমের চাপ মানিয়ে নিতে পারে। শুভর ঠোঁটে নিশুপ হাসির আভা ফুটে উঠল, সরস্বতী ছেলের হাবভাব লক্ষ্য করে বলল, সন্ধে লাগার আগে ঘরে ঢুকে যাবি। যদি সময় পাস তাহলে তোর অতসী পিসির বাগানের কাজগুলো আজ করে দিস। দিদি বারবার করে বলছিল
শুভ ঘাড় নেড়ে বাইরে এল।
শীতের বিকেল বেশ রমণীয় হয়ে উঠেছে মোহনী আলোয়। এ এলাকায় সন্ধে নামার আগে শীত চলে আসে। একটা হাফ হাতা সোয়েটারে সেই শীত কাটতে চায় না। অবনী বলেছে, একটা তুষের চাদর কিনে দেবে বেতন পেয়ে। পুরনো মাফলারটার রঙ উঠে গিয়ে এখন কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে দেখায়। গলায় জড়াতে ভালো লাগে না শুভর।
মাধুরী হয়ত তার অপেক্ষায় ঘুরঘুর করছিল বারান্দায়। লম্বা বারান্দায় ঠিক মাঝখানে চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন ডাক্তারবাবু। কলার মোচার মতো মুখটা ঝুঁকে আছে সেন্টার টেবিলের দিকে। ডাক্তারবাবু ঘরে থাকলে শুভর গলার স্বরে ভয়জনিত জড়তা প্রকাশ পায়। ওই রাশভারি মানুষটার কাছে সে সহজ হতে পারে না। যা বলার নয়, মুখের উপর তাই বলে দেন ডাক্তারবাবু। মনে কষ্ট পেলেও চুপ করে থাকতে হয় তাকে। মা তাকে বলেছে, বড়োদের মুখের উপর তর্ক করতে নেই। বড়োরা যা বলে তা বুঝে-শুনেই বলে।
ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে বিদ্যুৎবেগে চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয় শুভ। মাধুরী তার অস্বস্তির কথা জানত। সহজ হেসে বলল, চল, আমরা ঘরে গিয়ে বসি। এখানে বকবক করলে বাবার অসুবিধা হবে।
খবরের কাগজ সরিয়ে বাঁকা চোখে তাকালেন ডাক্তারবাবু, গল্প করে তো আজ এত নীচে নেমে গেছে। বেশি গল্পগুজব করলে পড়ার ক্ষতি হয়। রেজাল্ট যাতে আরো ভালো হয় সেই চেষ্টা করা উচিত।
মাধুরী খুশি হল না বাবার কথায়, সব সময় যে স্ট্যান্ড করতে হবে তার কোনো মানে নেই। তাছাড়া পরীক্ষার সময় আমার জ্বর হয়েছিল। আমি ঠিক মতো পড়তে পারিনি।
-ঠিক আছে, আর কৈফিয়ৎ দিতে হবে না। সশব্দে পেপার ভাঁজ করে ডাক্তারবাবু শুভর দিকে তাকালেন, কীভাবে পড়তে হয় শুভর কাছে থেকে জেনে নে। ওর টিউশনির মাস্টার নেই, তবু তোকে ডাউন দিয়ে ছেড়ে দিল।
মাধুরীকে তর্ক করার নেশা পেয়ে বসেছে, মাস্টার না থাকল তো কি আছে, ব্রেন তো আছে। ও একবার পড়লেই মনে রাখতে পারে সব। ওর সঙ্গে আমার কোনো তুলনা চলে না। প্রতিভার সঙ্গে পরিশ্রম মিশলে শুভর মতো রেজাল্ট হয়।
