পথ শেষ হয়ে আসে কোয়ার্টারের সামনে।
অবনীর পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সরস্বতী। মানুষটার বিধ্বস্ত, ক্লান্ত চেহারা দেখে তার দয়া হল। সরস্বতী কাছে এসে নীচু স্বরে বলল, শুভ ঘরে এসেছে। তুমি যাও চাপা কল থেকে হাত-মুখ ধুয়ে আসো। আসার সময় এক বালতি জল এনেনা।
–ও কোথায় গিয়েছিল? অবনী ঝুঁকে পড়ল সরস্বতীর দিকে।
–ওসব আমি পরে বলছি। এড়িয়ে যেতে চাইল সরস্বতী।
কথা না বাড়িয়ে বালতি নিয়ে চলে গেল অবনী। কিছু পরে সরস্বতীও চলে এল কলতলায়। চারপাশ দেখে নিয়ে বলল, সবুজ আমাকে খবর দিল শুভ আমতলায় শুয়ে আছে। আমি গিয়ে দেখি আমগাছের ছায়ায় দুহাত মাথায় দিয়ে ও ঘুমাচ্ছে। কিছুতেই আসবে না। জোর করতেই কেঁদে ফেলল। তার সে কী কান্না, আমিও আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি।
-যা হয়েছে সব ভুলে যাও। অবনীর গলা কেঁপে উঠল অনুশোচনায়। সেই কখন থেকে সে পুড়ছে, আর পোড়াতে চায় না নিজেকে। এবার মলমপট্টি করা দরকার।
শান বাঁধানো মেঝেতে পাশাপাশি খেতে দিয়েছে সরস্বতী। ছ্যালার উপর ফুল ভোলা আসন। সুতো দিয়ে আঁকা লাল ফুলগুলো যেন সুগন্ধ ছড়াচ্ছে ঘরের ভেতর। খেতে বসেও শান্তি পায় না অবনী। আজ নানা কারণে তার বাজারে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ঘরে কি ছিল কে জানে!
অভাবের সংসার তো তলা ফুটো নৌশে, কখন ভুস করে ডুবে যাবে কে জানে। আজকের এই বিশেষ দিনে পোয়াখানিক মাছ আনা তার উচিত ছিল। তা যখন হয়নি তখন আর কি করা যাবে! মুখ নীচু করে সে সরস্বতীর জন্য অপেক্ষা করছিল। রান্নাঘর থেকে দুটো থালায় ভাত বেড়ে আনল সরস্বতী। কাঁসার থালায় তরকারি সে সাজিয়ে দিয়েছে। শুধু ডালের বাটিটা পাতের গোড়ায় বসিয়ে সরস্বতী বলল, খাও, বেলা অনেক হল।
পাশাপাশি বসে খাওয়া শুরু করল ওরা। খেতে খেতে আড়চোখে ছেলের দিকে তাকাচ্ছিল অবনী। এত কাছে আছে তবু যেন মনে হয় কত দূরের সম্পর্ক! তার যেন ভয় করছে ছেলের দিকে তাকাতে। ছেলের জন্য যে গর্ববোধ এতক্ষণ তার বুকে জোয়ারের ঢেউয়ের মতো বয়ে যাচ্ছিল তা হঠাৎ এক জায়গায় থেমে যেতে সে কেমন অসহায় চোখ-মুখ করে তাকাল।
আজ ডাল দিয়ে খাওয়া সাঙ্গ করতে হবে এমন যখন ভাবছে অবনী তখন ডিমের ঝোল নিয়ে এল সরস্বতী। ডিমগুলো বেশ বড়ো বড়ো। বোঝা গেল হাঁসের ডিম। অন্যদিন হলে এই হাঁসের ডিমের জন্য সে ঝগড়া বাধিয়ে বসত, আজ তার ঐ ডিমটাকে মনে হল আকাশের তারা। হাঁসের ডিম খেলে নাকি বাতের ব্যথা বেড়ে যায়, শরীরের গাঁটগুলোয় যন্ত্রণা শুরু হয়। আজ আর কোনো যন্ত্রণা বা ভয় নয়–অবনী আলতো আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল ডিমটা, আর সঙ্গে সঙ্গে ভালো লাগার অনুভূতিগুলো বসন্তের হাওয়া লাগা পলাশগাছের মতো তাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। খেতে খেতে অবনী শুধাল, ডিম কোথায় পেলে, ঘরে ছিল বুঝি?
সরস্বতী জানত অবনী এই প্রশ্নটা করবে, তাই বিনা সঙ্কোচে বলল, পাশের কোয়ার্টার থেকে চেয়ে এনেছি। শুভ যে আমিষ ছাড়া খেতে পারে না।
বুক ভরে একটা শ্বাস নিল অবনী। বুকের ভেতর একটা তিরতিরে সুখের স্রোত বয়ে যাচ্ছে টের পেল সে।
খাওয়া শেষ করে উঠে যাওয়ার সময় সরস্বতী বলল, শোন, ডাক্তারবাবুর মেয়ে মাধুরী এসে পাঁচশ টাকা দিয়ে গেছে। দুপুরবেলায় এসেছিল সে। বসতে বললাম এত করে, বসল না। চলে গেল।
পর্দার আড়ালে সেই ছলছলে চোখ দুটোর কথা মনে ভেসে উঠল অবনীর। সত্যি, এ পৃথিবীতে কত কি যে খেলা চলে বোঝা মুশকিল।
শীতের রোদ যতই নম্র হোক তবু তারও একটা জ্বলন আছে। জানলা খোলা থাকলে এ ঘরে রোদ্দুর সরাসরি এসে হা-ডুডু খেলে বেড়ায় মেঝেয়। নানা ধরনের চিহ্ন, প্রতিকৃতি তৈরি হয় এই রোদ খেলায়। তক্তপোষে শুয়ে হা-করে সেই সবই দেখছিল শুভ। সরস্বতী কথায় ফেঁড় তুলতে যাওয়ার সময় বলেছে, খেয়েছিস দেয়েছিস, এবার একটু ঘুমো। বিকেলে একবার মাধুরীদের ওখানে যাস। কেন পাঁচশ টাকা দিয়ে গেল-সেটা জিজ্ঞেস করা দরকার।
শুয়ে শুয়ে ঘাড় নাড়ল শুভ। এ ঘরে তেমন দামী কোনো আসবাবপত্র নেই, কমা কাঠের তক্তপোষের উপর ছেঁড়া কাঁথাগুলো যত্ন নিয়ে পেতে দিয়েছে সরস্বতী। একটা তোষক কেনার কথা ভাবলে স্বপ্ন বলে মনে হয় শুভর। সরস্বতীর এতে কোনো আক্ষেপ নেই। সে জোর গলায় বলে, যা আছে তা নিয়ে মানুষকে সুখে থাকতে হয়। যতটুকু সুখ আমার প্রাপ্য ততটুকু আমি তো পাবই। আমার ভাগেরটা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
.
৩৪.
সুখ কাকে বলে জানে না শুভ। জানার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন। তবে তাদের ক্লাসের সুপ্রিয় পোদ্দারকে দেখে তার মাঝে মধ্যে ভীষণ মন খারাপ করে। ওদের টাকা-পয়সার অভাব নেই, তবু ব্যবহারে ওকে কেমন গরীব বলে মনে হয়। ডাক্তারবাবুর মেয়ে মাধুরী ওকে একটু ভয় পায়, তাই সাবধানে এড়িয়ে চলে। সেদিন ইস্কুলে সুপ্রিয় বলেছিল, শুধু পয়সা থাকলে হয় না, তা খরচ করার মতো মনও থাকতে হয়।
তার এই হালকা কথায় অহঙ্কারের ছোঁয়া ছিল। তিলের খাজা বিক্রি করতে আসা সহদেব ওই অতটুকু ছেলের কথা শুনে তাজ্জব। পরে সুপ্রিয় চলে যাবার পর সহদেব সতর্ক গলায় বলেছিল, এ ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যার বাবা কেরসিন তেল ব্ল্যাক করে তার ছেলে আর কত ভালো হবে। কাটা বাঁশের কঞ্চিতেও বিষকাটা থাকে।
