–আমি ঠিক বুঝলাম না ডাক্তারবাবু? মাথুর স্যার বিস্মিত চোখে তাকালেন।
এটা খুব সিম্পল ব্যাপার। ডাক্তারবাবু জোর করে হাসলেন, আপনি ওদের ক্লাস-টিচার। শুধু ক্লাস-টিচার নন, অঙ্কেরও স্যার। আপনি চাইলে মাধুরীর পাঁচটা নাম্বার বাড়িয়ে দিতে পারেন। এতে কোনো রিক্স নেই, লিক হবারও চান্স নেই।
-তার মানে? কঠিন চোখে তাকালেন মাথুর স্যার, আপনি যা বলছেন তা মেনে নেওয়া যায় না। আর তাছাড়া, এভাবে মেয়েকে স্ট্যান্ড করিয়ে আপনার কি লাভ হবে? মাধুরী যেমন আপনার মেয়ে, তেমনি শুভও আপনার ছেলের মতো। ওর বাবা আজ ভাগ্যদোষে ঝাড়ুদার পোস্টে এসেছে। তাছাড়া, ঝাড়ুদারের ছেলে যে কোনোদিন স্ট্যান্ড করতে পারবে না এমন কথা কোথাও কিন্তু লেখা নেই।
-না, আমি তা বলছি না। আমি জাস্ট বলছিলাম..যদি..
–যদির কথা নদীতে ফেলে দিন ডাক্তারবাবু। আগে পয়সা দিয়ে ডাক্তারীতে ভর্তি হওয়া যেত, এখন আর তা যায় না। এখন বুদ্ধি আর মেধার দরকার। মাথুর স্যার বললেন, আমি আপনার অন্যায় অনুরোধ রাখতে পারলাম না বলে দুঃখিত। তবে যাওয়ার আগে আমি একটা কথা বলে যাই। যুগ বদলাচ্ছে। যুগের সাথে আপনার মনটাকেও বদলান। দেখবেন-এসব সমস্যা কোথায় চলে গিয়েছে। মাথুরবাবু হনহনিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, ফিরে এসে বললেন, যাওয়ার আগে একটা কথা বলে যাই। আমি কেন, কোনো শিক্ষকই আপনার এই প্রস্তাব মেনে নেবেন না। আর যদি কোনো শিক্ষক লোভে পড়ে মেনে নেন, তাহলে সেটা হবে তাঁর আত্মহত্যার সমান। তবে আপনার এই প্রস্তাবটি আমি হেড মাস্টারমশাইয়ের কানে তুলে রাখব। তাতে তাঁর মানুষ চিনতে সুবিধে হবে।
অবনীর মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয় ডাক্তারবাবুর। তিনি শ্লেষের সঙ্গে বলেন, হ্যাঁ, শুনেছি তোমার ছেলে সেকেন্ড হয়েছে। বেশ আনন্দের কথা। গর্বে আমার বুকের ছাতি ফুলে যাচ্ছে। তোমারও অনেক গর্ব হচ্ছে বুঝতে পারছি। তবে মনে কিছু করো না, একটা কথা বলি। সেকেন্ড হয়েছে বলেই যে তাকে সাইকেল কিনে দিতে হবে তার তো কোনো মানে নেই। আজ সাইকেল চাইছে, কাল হায়ার সেকেন্ডারী পাশ করে বলবে, বাবা, এরোপ্লেন কিনে দাও–তখন পারবে তো ছেলের সখ মেটাতে?
এমন কঠিন উত্তর প্রত্যাশায় ছিল না অবনীর, তবু সে জোরের সঙ্গে বলল, যদি ক্ষমতা থাকে তাহলে অবশ্যই এরোপ্লেন কিনে দেব। ছেলের জন্য কিনব–এতে তো আমার গর্ব হওয়া উচিত।
-এত যখন গর্ব বুকে তখন আমার কাছে হাত পাতছ কেন?
–আপনি বড়োলোক। জানতাম-দয়ালু। সেইজন্য
-ঠিক আছে সন্ধেবেলায় এসে টাকাটা নিয়ে যেও। ডাক্তারবাবু বিরক্তির সঙ্গে বললেন, আর আমি বকবক করতে পারছিনে। এবার তুমি যাও। ফিরে আসার সময় অবনী দেখল, ঈষৎ পর্দা ফাঁক করে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে মাধুরী। তার জোড়া চোখে সহানুভূতির বান ডেকেছে। বোবা থেকে সে যেন অনেক না বলা কথা বলে দেয়। অবনী কার উপর অভিমান করবে? একটা ডাল শুকিয়ে গেলেও অন্য ডালে তো ফুল এসেছে। ফুল এসেছে যখন সুগন্ধ তো ছড়াবেই।
ফেরার সময় ডলি দিদিমণির সঙ্গে দেখা হল কিচেন ঘরের সামনে। অবনী দেখল তার পরনে এখনও ডিউটির পোষাক। ক্লান্ত পায়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন ঘরের দিকে। অবনীকে দেখে তিনি থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন হাওয়ায়, দুপুরবেলায় কোথা থেকে ফিরলে গো অবনী? বড়ো ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে! কি হয়েছে?
-কই, কিছু হয়নি তো? গলা ঝেড়ে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইল সে। ডলি দিদিমণি মিষ্টি করে হাসলেন, তোমার কাছে একটা খাওয়া পাওনা থাকল। শুভ সেকেন্ড হয়েছে শুনেছি। ওকে বলো পরের বছর ওকে ফার্স্ট হয়ে দেখাতে হবে।
ভগবানের যা ইচ্ছে তাই হবে। অবনী আকাশের দিকে মুখ করে তাকাল, তারপর মুখ নামিয়ে এনে বলল, আপনাদের সবার আশীর্বাদ থাকলে ও ঠিক পারবে। আমি তো মুখ মানুষ। ক-লিখতে কলম ভাঙে।
–গাদা গাদা বই পড়ে কি শিক্ষিত হওয়া যায় নাকি? ডলি দিদিমণি বললেন, মানুষ হতে গেলে কেতাবী শিক্ষা না থাকলেও চলে। মানবতা যে পাঠশালায় পড়ানো হয়, তার নাম হৃদয়। হৃদয় শুধুমাত্র পাঠশালা নয়, সেখানে ফুলের বাগানও থাকে। সুগন্ধে ম-ম করে মনের উঠোন।
কদবেল তলার পাশ দিয়ে বাজারে যাওয়ার পথ। আশে পাশের টালিখোলায় কাজ চলছে পুরোদমে। দু-একটা কুকুর ছন্নছাড়া মনোভাব নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। বাঁশবাগানে হাওয়ার শনশনানী। শুকনো পাতাগুলো শুন্যে ঘুরপাক খেতে খেতে নেমে আসছে মাটিতে। এ সময় সব থেকে বেশি পাখি ডাকে মনে হয় অবনীর। দুপুরবেলায় ঘুঘুর ডাক তার ক্লান্তিকে আরও যেন প্রকট করে তোলে।
বারোয়ারিতলা শুনশান। একটা কুকুর পেট থেবড়িয়ে শুয়ে আছে। তার গায়ে মিহি রোদ এসে পড়েছে। চারধার খুঁজে ক্লান্ত অবনীকে হতাশ দেখাচ্ছিল খুবই, বুকের ভেতরটা জ্বালাপোড়া করছিল অস্থিরতায়। বুক হালকা করে যে কথা বলবে–তেমন কাউকে খুঁজে পেল না। উল্টে একটা ভয় এসে ছোবল মারতে লাগল তাকে। শুভ যেন কিছু না করে বসে। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে। আর এখানে দেরি করা উচিত হবে না। বেলা ক্রমশ বাড়ছে। এবার ঘরে ফেরা দরকার।
পিচ রাস্তায় ধুলোর পুরু আস্তরণ, যেন কেউ মেটে রঙের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কালীগঞ্জ থেকে হরিনাথপুর। একটু হাওয়া দিলেই ধুলোগুলো সব প্রাণ পেয়ে উড়তে শুরু করে। সেইরকম একটি ঘূর্ণায়মান ধুলোর বৃত্তে অকস্মাৎ ঢুকে গিয়ে আঁকুপাকু করে অবনী। সর্বাঙ্গে ধুলোর স্পর্শ তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তবু হাঁটতে হাঁটতে তার মনে পড়ে ডাক্তারবাবুর নিষ্ঠুর কথাগুলো। মানুষটাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে মনে মনে তিনি এত বিষ ধরে রাখেন। সকালে আউটডোর ঝাড়ু করার ঘটনাটাও অন্যায়। অন্যের পাপ তাকে কেন খণ্ডন করতে হবে? শুভকে নিয়ে ঈর্ষার আগুন ডাক্তারবাবুর চোখে ধিকিধিকি করে জ্বলছে। ছেলেটার সাফল্য তিনি সহ্য করতে পারছেন না। এত বড় মাপের একজন মানুষকে হঠাৎ করে এমন বেঁটে দেখাবে–একথা স্বপ্নেও যে ভাবা যায় না।
