অবনী শুভর ফেরার পথের দিকে তাকিয়ে ছিল। টিকেদারবাবুর মুখের উপর সে কোনো কথা বলার সাহস পায় না। মানুষটা রাশভারী। রেগে গেলে আর রক্ষে থাকে না। সেই ডাকাবুকো মানুষটি খেদের সঙ্গে বললেন, দুটো ভালো মাস্টার দিলাম তবু দেখো কেমন বিশ্রি রেজাল্ট করল। বলতে গেলে টেনেটুনে পাশ। হেডমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে বাজারে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি সাবধান করে বললেন, ছেলেটার দিকে নজর দিতে। ওর একদম পড়াশোনায় মন নেই। ওর মাকে বললে ছেলেটাকে শাসন করে না। শুধু বলে, বয়স হলে ঠিক হয়ে যাবে দেখা যাক কি হয়?
বেলার দিকে তাকিয়ে অস্থির হচ্ছিল সরস্বতী, অবনীকে কনুই দিয়ে ঠেলা মেরে বলল, শীতের বেলা ঝটপট ফুরিয়ে যাবে। যাও একবার ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে ঘুরে এসো। বলা যায় না, ওখানেও যেতে পারে। আজ যেন রোদের ভীষণ চড়া মেজাজ। পায়ের চড়া পড়া পথে রোদ হাওয়ার সে কি চিরন্তনী খেলা। হাসপাতালের মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোরু চরছে, রাখালের গলা শোনা যাচ্ছে মাঠের কোণ থেকে। অবনী দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। ডাক্তারবাবুর বাড়িটা বাসরাস্তার কাছাকাছি। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে প্রশ্ন করল অবাক মাধুরী, কাকু, বাবাকে কি ডেকে দেব?
না। আমি শুভকে খুঁজতে এসেছি।
-কেন শুভ আবার গেল কোথায়? মাধুরীর বিস্ময়ভরা গলা, এক সাথে তো ঘরে ফিরলাম। সঙ্গে আরো অনেকেই ছিল। জান কাকু, আজ শুভ আমাদের হাসপাতালের নাম বাড়িয়ে দিয়েছে। হেডমাস্টার মশাই ওর প্রশংসা করছিলেন। আমার এত ভালো লাগছিল যে তোমাকে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। মাধুরীর লাবণ্য ভরা মুখখানা কথা বলার সাথে সাথে ভোরের শিউলি ফুলের মতো তরতাজা হয়ে উঠল। হা-করে তাকেই দেখছিল অবনী। তার মনে হল মা দুর্গার জীবন্ত কিশোরী ছায়া তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ডাক্তারবাবুর স্ত্রী বনশ্রী ভেতর থেকে শুনছিলেন তাদের কথাবার্তা। ঘরের ভেতর থেকে তিনি মাধুরীকে প্রশ্ন করলেন, কে এসেছে রে, মাধুরী?
–অবনী কাকু।
-বসতে বল, আমি যাচ্ছি।
ঘর গুছিয়ে বনশ্রী যখন বাইরে এলেন, তখন অবনীর বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠছিল শুভর জন্য চিন্তা করে। শুভকে খুঁজে না নিয়ে গেলে সরস্বতী যে পাড়া মাথায় তুলে তার সঙ্গে ঝগড়া করবে এ বিষয়ে সে একশ ভাগ নিশ্চিত।
বনশ্রীর নজর এড়াল না অবনীর অস্থিরতা, কি ভাবছ অবনী? কোনো সমস্যায় পড়েছ নাকি?
-না, তেমন কিছু নয়। আমি বাবুর কাছে এসেছিলাম একটা দরকারে। অবনী হাত কচলে গদগদ চোখে তাকাল।
বনশ্রী বললেন, তোমার ছেলের রেজাল্টে আমরা গর্বিত। তোমার বাবু বলছিলেন, ওর মধ্যে ট্যালেন্ট আছে। একটু নজর রেখো।
একটা কাঠের টুলের উপর বসেছিল অবনী।
বনশ্রী বললেন, তুমি বসে বসে মাধুরীর সঙ্গে গল্প করো। আমি গিয়ে ওকে ডেকে দিচ্ছি। আর একটা কথা। আজ বিকেলে তোমাদের কোয়ার্টারের দিকে যেতে পারি। সরস্বতীকে বলে–
মিনিট দশেক পরে পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে বারান্দায় এলেন ডাক্তারবাবু। ফর্সা, টুকটুকে চেহারা। প্রায় ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা। ডাক্তারবাবুকে দেখে টুল থেকে উঠে দাঁড়াল অবনী। মাধুরী সঙ্গে সঙ্গে বলল, কাকু, এবার তুমি বাবার সাথে কথা বলো। আমি যাই। মাধুরী ঘরে ঢোকার আগেই তুলে রাখা পর্দাটা নামিয়ে দিল।
একটা চেয়ার টেনে আরাম করে বসলেন ডাক্তারবাবু। সিগারেট ধরিয়ে বললেন, কি ব্যাপার, কোনো দরকারে এসেছ বুঝি?
অবনী ঢোঁক গিলে ইতস্তত স্বরে বলল, ছেলেটার রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমার শ’পাঁচেক টাকা ধার চাই। তিন মাসে শোধ করে দেব।
ডাক্তারবাবু সিগারেটে টান দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন, এতগুলো টাকা নিয়ে কি করবে, বই কিনবে বুঝি?
অবনী প্রশ্রয় পেয়ে সত্যি কথাটা বলল, না বাবু বই আমি পরে কিনব, আগে ওর একটা সাইকেল কেনার দরকার।
কেন এত আর্জেন্ট কিসের? ডাক্তারবাবু বাঁকা চোখে তাকলেন। অবনী পানসে হেসে বলল, ছেলেকে কথা দিয়েছিলাম, ভালোভাবে পাশ করলে একটা সাইকেল কিনে দেব। ছেলে তো শুধু পাশ করেনি, সেকেন হয়েছে। সেইজন্য টাকাটা দরকার। বাজারের সাইকেল দোকানী নিখিল পোন্দারকে বলেছি, সে বলেছে কমসম করে একটা নতুন সাইকেল দিয়ে দেবে।
বেশ ভালো কথা। ডাক্তারবাবু বাক্যহারা চোখে তাকালেন, তার মনের গভীরে যে ঝড় উঠছে, সেই ঝড়কে সামাল দিতে তিনি অপারগ। সামান্য ঝাড়ুদারের ছেলের কাছে মাধুরী এমনভাবে হার স্বীকার করে নেবে যা স্বপ্নেও ভাবা যায় না। এ গ্রাম কেন, আশেপাশের দশটা গ্রামে তাঁর একটা মানসম্মান আছে। সেই মানসম্মানে সামান্য হলেও টোল খেল। পরীক্ষার ফলাফল তিনি দু-দিন আগেই শুনেছেন। মাথুর স্যার হাসপাতালে ওষুধ নিতে এসে ক্লাস এইটের রেজাল্ট সব বলে গিয়েছেন। মাধুরী মাত্র চার নাম্বার কম পেয়েছে শুভর থেকে। শুভ এই চার নাম্বার বেশি পেয়েছে অঙ্কতে। শুভ কেন বেশি পাবে এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না ডাক্তারবাবু। তাই একথা সে কথার পর তিনি একটা অনুরোধ রেখেছিলেন মাথুর স্যারের কাছে। বড়ো আজব আর স্পর্শকাতর সেই অনুরোধ। ডাক্তারবাবু খুব অসহায় স্বরে বলেছিলেন, মাস্টারমশাই, একটা অনুরোধ আছে। আমি এই হাসপাতালের ডাক্তার। অবনী এই হাসপাতালের ঝাড়ুদার। শুভর কাছে মাধুরী যদি পিছিয়ে পড়ে সেটা কখনও ভালো দেখায় না। আমার মান সম্মান নিয়ে টানা হিচড়া হয় তাহলে। তাই বলছিলাম–একটু যদি এদিক ওদিক করা যেত, তাহলে মনে হয় সাপও মরত, আর লাঠিও ভাঙত না।
