না খেয়েই বাঁধের উপর উঠে এল শুভ। রঘুনাথের সঙ্গে দেখা হলে হাল্কা হত মনটা। অনেকদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। মাঝে মাঝে বারোয়ারি তলার বাজারে রঘুনাথের দেখা পেয়ে যায় সে। মেহনতী শরীরের প্রায় সবখানেই লেগে থাকে ধুলোমাটির চিহ্ন। শুভ কিছু জিজ্ঞাসা করলে পায়ের কাছে হাতের কোদালটা নামিয়ে রেখে রঘুনাথ বলত, বিলমাঠে ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান তুলতে গিয়েচিলাম। জানিস মিতে, আজ বরাত মন্দ তাই বেশি ধান পাইনি। তবে আজ একটা ধেড়ে ইঁদুর ধরেচি। ঘরে গিয়ে ভাবচি পুড়িয়ে চাখনা করে খাবো।
ঘেন্নায় শিটকে ওঠে শুভ, কী বলিসরে, ইঁদুরও খাবি? কোনো কিছু বাদ দিবি না বুঝি?
-ইঁদুর আমরা আজ থেকে নয়, বহুকাল আগে থেকে খাই। রঘুনাথের সরল হাসির মধ্যে কোনো পাপ নেই। এখানে জাতিতে জাতিতে খাদ্যাভাস বদলে যায়। শুভ ঘাড় তুলে বেলা পরখ করার চেষ্টা করে। দুটোর বাসটা ছাড়ার সময় হয়ে এল। বাসের হর্ন বাজাচ্ছে সিটে বসে থাকা ড্রাইভার। যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার এই এক ফন্দি।
যত বেলা বাড়ছিল ততই দুঃশ্চিন্তার মধ্যে হাঁপিয়ে উঠছিল অবনী। মুহূর্তের ভুলের জন্য তার এই হেনস্থা। হাসপাতালের মাঠটা কম বড়ো নয়, গাছগাছালিতে ভরা। বিশেষ করে খেজুরগাছগুলো ঝাঁকড়া মাথার পাহারাদারদের মতো দাঁড়িয়ে। এই শীতে এখনও ঘাসগুলো সতেজ। তবে রোদ উঠলে ঘাসফুলগুলো মুড়ি মিয়াননার মতো মিইয়ে যায়। তখন মনে হয় ওদের বুঝি অসুখ করেছে।
এতক্ষণ যা করেনি, শেষ পর্যন্ত তাই করল অবনী। গলা ফাড়িয়ে সে ডেকে উঠল। মাঠ ফিরিয়ে দিল প্রতিধ্বনি। এবড়ো-খেবড়ো চেহারার খেজুরগাছগুলো যেন দাঁত বের করে বিদ্রুপের হাসিতে ফেটে পড়ল।
বার দশেক ডাকার পরেও সাড়া পেল না অবনী। টিকাদারবাবুর কোয়ার্টারের কাছে সরকারি কল। সেখানে এসে অবনী গো-হাঁপান হাঁপায়। বালতিতে জল ঢেলে স্নান করছিলেন টিকেদারবাবু। তার বেঁটেখাটো চেহারাটা গোল করে কাটা মাখনের মতো। তিনি যে চোখে লাগার মতো বেঁটে এখন আর কাউকে বলে দিতে হয় না। সবুজ তার ছেলে। শুভর সঙ্গে পড়ে। খেলা পেলে সে শুভর ধারে কাছে যায় না, তখন পড়াশোনা সব শিকেয় তুলে দিব্যি টো-টো করে ঘোরে। এই ফালতু ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করেন না টিকেদারবাবু। গলা সপ্তমে তুলে বলেন, যে সময়ের হিসাব বুঝে নেয় না তার জীবনে কষ্ট আছে। সময় হল ভগবান। তাকে প্রতিক্ষণে স্মরণ করা উচিত।
অবনী জল খাবার জন্য কলপাড়ে দাঁড়াতেই গায়ে জল ঢালা অবস্থায় সরে দাঁড়ালেন টিকেদারবাবু, জল খাবে? আসো। আমি কল টিপে দিচ্ছি।
জল খাওয়া শেষ হলে টিকেদারবাবু অবনীর মুখের দিকে তাকালেন। হালকা হাসিতে ঠোঁট ভরিয়ে বললেন, তোমার ছেলে তো মারভেলাস রেজাল্ট করেছে অবনী। ক্লাসের মধ্যে সেকেন্ড হয়েছে, এ কী কম কথা।
ফার্স্ট-সেকেন্ডের কিছু বোঝে না অবনী, তবু টিকেদারবাবুর কথাগুলো তার ভালো লাগল। টিকেদারবাবু বললেন, ছেলেটা যতদূর পড়তে চায়, পড়িও। ওর পড়াশোনা বন্ধ করে দিও না। আমার মন বলছে এই ছেলে তোমার দশজনের একজন হবে। জলভরা বালতিতে মগ ডুবিয়ে গায়ে ঢালছিলেন টিকেদারবাবু, তা সত্ত্বেও তার কথাগুলো যে বানানো নয় তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল অবনী। এক ধরনের অপরাধবোধ বিপন্ন করে তুলল তাকে। ঝোঁকের মাথায় ছেলেটা আবার। কিছু করে বসল না তো। এই ভাবনাটা মনে আসতেই আঁতকে উঠল সে।
কলপাড় থেকে অবনীর কোয়ার্টারটা ছবির মতো দেখা যায়। সরস্বতী পেঁপেগাছটার পাশে এসে হাঁ করে তাকাল অবনীর দিকে। কথা বলারও ইচ্ছে নেই, কেমন একটা বিতৃষ্ণা। একটা ঘৃণার স্রোত ঠেলে উঠছিল তার চোখে-মুখে। আপাত শান্ত এই মানুষটাকে সে কি বুঝতে পেরেছে এখনও? হঠাৎ এমন সব কাণ্ড করে বসে লোকটা যা মেনে নেওয়া যায় না। তবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে মুখ নীচু করে হেঁটে এল কলতলায়। আজকের আনন্দের দিনটা মাটি করে দিয়েছে ওই লোকটা। ওর জন্য শুভ না খেয়ে ঘর থেকে চলে গেল। কথা ছিল পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করলে সার্কাস দেখার পয়সা দেবে সরস্বতী। তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল অবনীর উপর, তোমার কি কোনোকালে বিবেক বুদ্ধি হবে না? ছেলেটাকে ওভাবে কেউ দুপুরবেলায় তাড়িয়ে দেয়? অবনী শুধু একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তার মুখে কোনো উত্তর নেই। সে জানে আগুনে ঘি ঢাললে আরও আগুন বাড়বে।
সরস্বতী কথার সূত্র ধরে বলল, যাও, যেখান থেকে পার শুভকে খুঁজে আন। ওকে সঙ্গে না নিয়ে এলে আমি তোমাকে ঘরে ঢুকতে দেব না। জেদে ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে সরস্বতীর শ্যামলা মুখখানা। ভেতরে ভেতরে সে যে কতটা উত্তেজিত তা টের পাওয়া যাচ্ছে।
টিকেদারবাবু গায়ে জল ঢালা থামিয়ে ওদের দুজনের দিকে তাকালেন, কি হয়েছে, তোমরা ঝগড়া করছ কেন? শুভ কোথায় গিয়েছে? তবে যেখানেই যাক, খাওয়ার সময় ঠিক ফিরে আসবে।
পেটে টান ধরলে তখন দেখবে সব মান-অভিমান কর্পুরের মতো উবে গেছে।
অবনী একথায় কান দিল না, সে শুধোল, বাবু আপনাদের ঘরের সবুজ কোথায়?
টিকেদারবাবু তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বললেন, ও আর যাবে কোথায়? ঘরে গিয়ে দেখো-খাচ্ছে। যতক্ষণ ঘরে থাকে শুধু খা-খা করে বেড়ায় ছেলেটা। আগের জন্মে বুঝি রাক্ষস ছিল। টিকেদারবাবু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাঁর মনের কথাটা বললেন, ছেলেটার উপর অনেক আশা ছিল। ছেলে আমার সব আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। শুধু ভয় হয়, পড়াশোনা না করলে ওদের ভবিষ্যৎ জীবন চলবে কি করে? আমি তো আর চিরদিন থাকব না। এখন থেকে নিজেই যদি নিজেরটা না বোঝে তাহলে অন্ধকারের মধ্যে পড়ে যাবে। তখন আর পথ খুঁজে পাবে না।
