শুভ ঘাড় নাড়লে অতসী পিসি বলবেন, আর একটু পরে পেসেন্ট-পার্টির সবাই চলে আসবে। তখন তোর ঠিক সাইকেলের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
.
৩৩.
এমন কোনোদিন যায়নি যেদিন হাসপাতালে এসে সাইকেল না চালিয়ে ফিরে গেছে শুভ। আজ যে কত কথা মনে ভিড় করে আসছে কে জানে। শুভ ভাবল ওভাবে ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা তার উচিত হয়নি। বাবা কিছু বললেও মা তো তাকে কিছু বলেনি। সে তো রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছিল ছেলের গর্বিত মুখখানা দেখবে বলে। কিন্তু তা আর হল কই? সব কিছু মুহূর্তের মধ্যে কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। সরস্বতীর কিছু করার ছিল না, সে শুধু কাঠের পুতুলের মতো হা-করে দাঁড়িয়ে থাকল এক পাশে। একটা ঝড়ো হাওয়ার মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শুভ। ছেলের এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহার তাকে সামান্য হলেও ধাক্কা দিয়েছে। কই এর আগে শুভ এমন ব্যবহার তো করেনি।
রঘুনাথদের ঘরখানা শুভর মনে হয় ঠাকুরমার ঝুলির ঘরগুলোর মতো। বাঁধের পা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া নদীটাকে মনে হয় স্বপ্নে দেখা কোনো এক শান্ত নিরীহ নদীর মতো। নদী আছে বলে বাতাসও কত ভদ্র। এক রাশ শীতল বাতাস মানুষের ক্লান্তি দূর করার জন্য সব সময় বুঝি মুখিয়ে আছে। শুভ চোখ মেলে তাকাল দুরের দিকে। নদীর জল ডিঙিয়ে তার দৃষ্টি চলে গেল আখ খেতে। এত আখ চাষ এ এলাকা ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো প্রান্তে হয় কি? জানা নেই শুভর। সে শুধু ভাবল–আর ক’দিনের মধ্যে আখ কাটা শেষ হয়ে যাবে। আখগাছে ফুল এলে হালকা হয়ে যায় আখ, অনেক সময় কমে যায় তার মিষ্টতা।
রঘুনাথদের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে শুভ ডাকল, এই রঘু, রঘু।
ভরদুপুরে চেনা কণ্ঠস্বর শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এল দুর্গামণি। তার পরনে এক ফেরত শাড়ি, গায়ে ব্লাউজ নেই, খোলা চুল পেঁপে রঙের পিঠের উপর টেকির পাড় দিচ্ছে হাওয়ায়। সে এসে অবাক করা চোখে শুভর মুখের দিকে তাকাল। মা-মন নিয়ে আঁচ করতে চাইল এ সময় আসার কারণটা কি। কিছু অনুমান করতে না পেরে অমায়িক আত্মীয়তার গলায় বলল, বসো বাবা, বসো। রঘু তো ঘরে নাই। দুর্গামণি শুভর চিন্তাভরা মুখের ভাষা পড়তে চাইল। কী বুঝে বলল, তুমি বসো। আমি তুমার জন্য টুকে ঠাণ্ডা জল নিয়ে আসি।
ঠাণ্ডা জল আনতে গেলে চাপা কলের জল আনতে হবে। চাপকল আছে সেই অশ্বখতলায়। যেতে আসতে কিছু সময় তো যাবেই। শুকনো ঢোঁক গিলে শুভ বলল, দরকার নেই, মা। ঘরে যা জল আছে তাই দাও। আমি বেশিক্ষণ বসব না। ফিরে যাবো।
-সে কি গো, বাছা! দুফুরবেলায় এলে। না খেয়ে গেলে রঘু যে আমার মাথা খেয়ে নেবে। দুর্গামণি পেতলের গ্লাসে জল ভরে এনে শুভর পাশে বসল।
সই-পাতানোর পর থেকে শুভ তাকে মা বলে ডাকে। আর এই মা ডাক শুনলে তার বুকের ভেতরটা গর্বে ভরে যায়। শুভর গায়ে মাথায় পিঠে জললাগা হাত বুলিয়ে দুর্গমণি বলল, এসেছে যখন না খাইয়ে যেতে দেব না। তুমাদের ঘরে গেলে রঘু আমার কত কি খেয়ে আসে। তা বাছা, তুমরা হলে গিয়ে বড়োলোক মানুষ। মাস গেলে তুমার বাবা কত্তো টাকা মাহিনা পায়। আর আমাদের কথা বলোনি গো, কুনদিন হাঁড়ি চড়ে, কুনদিন আবার আঁখা জ্বলেনি।
শুভ সব জানে, এসব কথা তার কাছে কোনো নতুন নয়। তবু সে দুঃখী চোখ মেলে তাকায় দুর্গামণির দিকে, সরলতায় ভরা এ মুখখানার দিকে তাকিয়ে সে শুধায়, মা, রঘু কোথায় গিয়েছে?
জনমজুর খাটতে গিয়েছে, বাছা। বেলা না গড়ালে সে তো ফিরবে নি
–অতক্ষণ আমি থাকতে পারব না। আমাকে যেতে হবে। ঘরে অনেক কাজ। শুভ আরো কিছু অজুহাত খাড়া করতে যাচ্ছিল দুর্গামণি তাকে থামিয়ে দিল, হাজার কাজ থাকলেও মায়ের কাছে এসে ছেলে কি খালি পেটে ফিরে যায় বাছা! আমি তেল-গামছা দিই। তুমি ভুস করে ডুব দিয়ে আসো লদী থেকে। ততক্ষণে রঘু, রঘুর বাপ-সব্বাই এসে যাবে। রোদ মাথায় তো এলে। রোদ না গড়লে আমি তুমাকে যেতে দিবোনি।…
কী অদ্ভুত মমতায় দুর্গামণি তাকিয়ে আছে শুভর কুচকুচে মণির দিকে। শুভর সারা শরীরে অদ্ভুত একটা শ্রদ্ধার শহর বয়ে গেল, মা, আজ আমার পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। আমি পাশ করেছি।
কার্পাস তুলোর মতো খুশিতে উথলে উঠল দুর্গামণি, আমার ছেলে পাশ হবে নি তো কি ফেল হবে? তারপরই কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল তার চোখ জোড়া, আমার ঘরের রঘুটা শুধু চার ক্লাস অব্দি পড়ল, তারপর আর ইস্কুলে গেল না। ওর বাপ বলল–পড়া- লিখা শিখে আর কাজ নেই। জনমজুরের কাজে লেগে যা। আমি আর একা সনসারের হাল টানতে পারচি নে। তুই আমার সঙ্গে কাঁধ দে। ব্যস, পড়া ছেড়ে গেল রঘুটার! গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ছুঁয়ে বেরিয়ে এল দুর্গামণির। তবু তার দুঃখে ভরে ওঠা চোখ দুটো শুভর মধ্যে যেন খুঁজে পেতে চাইল রঘুনাথের সার্থক পরিণতি। খিদে ছিল তবু খাওয়ার প্রতি কোনো মন ছিল না শুভর। দুপুর তাতছে শীতের রোদে। বাতাস ভারী হয়ে আছে এখনও। ক’পা হাঁটলেই তো বুড়িগাঙ। বিঘার পর বিঘা আখ খেতের দিকে তাকিয়ে আখের খসখসে পাতার মতো তার বুকের ভেতরটাও জ্বালাপোড়া করে ওঠে। রঘুনাথ তার চেয়ে ক’বছরেরই বা বড়ো হবে, তবু সামান্য জ্ঞানপড়ার পর থেকে তাকে উপার্জনের পথে হাঁটতে হচ্ছে। সেদিক থেকে শুভ অনেক ভাগ্যবান। দেশ-গাঁয়ে থাকলে তার অবস্থাও রঘুনাথের মতো হত। হাসপাতালের কোয়ার্টারগুলোয় বিদ্যা অর্জনের একটা চাপা প্রতিযোগিতা আছে। এদের স্বচ্ছলতা না থাকলেও শিক্ষার প্রতি আগ্রহটা অনেক বেশি। সরস্বতী মনে প্রাণে চায় শুভ লেখাপড়া শিখে বড়ো হোক। তার জন্য যত কষ্ট স্বীকার করতে হয় সে করবে।
