সুপ্রিয় হার মানার পাত্র নয়, এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মাধুরীকে সে উচ্চ কণ্ঠে বলল, তোর থেকে কেউ বেশি নাম্বার পাক এটা আমি সহ্য করতে পারি না। আমার যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে আমি তোকে একশোর মধ্যে একশ দিয়ে ফার্স্ট করিয়ে দিতাম।
–এতে তোর কি লাভ হোত?
মাধুরীর প্রশ্নে সুপ্রিয় ঢোঁক গিলে বলল, সে তুই বুঝবি না। কথাগুলো বলে মুখ নীচু করে দাঁড়াল সুপ্রিয়। সেও ঘামছিল কোনও কারণে, মনে মনে চাইছিল মাধুরী তাকে সমর্থন করুক। মুখ ফুটিয়ে না যোক অন্তত চাহুনিতে তা প্রকাশ পাক। তেমন কোনো কিছু প্রতিক্রিয়া পরিস্ফুট হল না মাধুরীর হাবভাবে। সে গভীর কুয়োর মতো দৃষ্টি মেলে চলে যেতে চাইল ক্লাস রুমে। সুপ্রিয় তাকে বাধা দিল, এখন যাস না, একটু থাক। তুই কাছে থাকলে আমি শক্তি পাই।
–আজেবাজে বকিস না। বিন্দু দিদিমণিকে বলে দেব তাহলে। যা, সরে যা। আমাকে যেতে দে। বিরক্তি উথলে উঠল মাধুরীর চোখে। সুপ্রিয়কে পাশ কাটিয়ে সে দেখল থামের আড়ালে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে শুভ। সব কথা শুনেছে হয়ত, নাহলে কেন ছলছল করছে ওর চোখ জোড়া। এইরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে মাধুরীর কি করা উচিত ভেবে পেল না। ক্লাসরুম থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি বাইরে ছুটে আসছে। এখনও রেজাল্ট হাতে পায়নি কেউ। ঘন্টা পড়লে ক্লাস-টিচাররা প্রোগ্রেস-কার্ড নিয়ে যে যার ক্লাসে ঢুকে যাবেন। প্রথানুযায়ী প্রেয়ারের লাইনে। হেডমাস্টারমশাই যারা ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড হয়েছে তাদের নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। তার সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষ হবার পরেই জনগণমন’। এই সোরগোলের পিছনে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া প্রচ্ছন্নভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে যা আজকের দিনে স্বাভাবিক।
ক্লাস এইটের ক্লাস-টিচার মাথুরবাবুর আসার সময় হয়ে গেল। মাধুরী কিছু ভেবে না পেয়ে বোকার মত শুভর মুখোমুখি দাঁড়াল। সে কিছু বলার আগে শুভ চোখ রগড়ে নিয়ে বলল, আমি সব শুনেছি। যা সত্যি সুপ্রিয় তো তাই বলেছে। অমন কথা শুনে শুনে আমার আর এখন কোনো কষ্ট হয় না। আসলে কি জানিস, এত কষ্ট পেয়েছি–এগুলো আর কোনো কষ্ট বলে মনে হয় না। শুভ’র চোখ চঞ্চল হয়ে উঠল সামনের দিকে তাকিয়ে, চল, মাথুর স্যার আসছেন।
মাধুরী ফ্যাকাসে চোখে শুভকে দেখছিল, তুই এত মনের জোর কোথায় পাস?
–অভাবই আমাকে বলবান করেছে। তুই দেখিস–আমি হারব না। আমাকে বড়ো হতেই হবে। শুভ লম্বা লম্বা পা ফেলে ক্লাস-রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই মাধুরী তাকে অনুসরণ করল।
যার মনে এত জেদ, এত সহজে তার ধৈর্য হারিয়ে ফেলা কি উচিত হয়েছে? সব ঘরেই কিছু না কিছু অশান্তি লেগেই থাকে। সবার মন-মেজাজ সব সময় এক থাকে না। বাবার সামান্য কথায় ধৈর্য হারিয়ে ফেলা উচিত হয়নি শুভ’র। এমন ব্যবহার যাদের পেটে বিদ্যে-বুদ্ধি নেই তারা করলেই শোভা পায়। লগি ঠেলে ঠেলে, পাকমাটি ঘেঁটে শিক্ষার নৌকো নিয়ে এগোচ্ছে শুভ। এ সময় এত উতলা হলে, আত্মকেন্দ্রিক ভাবনায় মগ্ন হলে চলবে না। লোকে তাহলে বলবে স্বার্থপর। অবনীর দুঃখটা ছেলে হয়ে সবার আগে তার বোঝা উচিত ছিল। সেকেন্ড হয়েছে বলে তো সে সুন্দরবন থেকে বাঘ মেরে আসেনি! সে শুধু একটা ভালো ছাত্রের দায়িত্ব পালন করেছে। অভাব কারোর কোনোদিন মাদুলি-তাবিজ হতে পারে না। বাবার প্রতি অভিমানে ঘর ছেড়ে এসে সে যে খুব বাহাদুরির কাজ করেনি–যত সময় যায় তা যেন হাড়ে হাড়ে টের পায় সে। মার দুঃখী মুখখানা চোখের তারায় ভেসে ওঠে। তারও তো দুঃখ কম নেই। সকাল থেকেই কথার বাণ সহ্য করতে হচ্ছে তাকে। যেন ক্লাসে সেকেন্ড হয়ে সে অপরাধ করে ফেলেছে। আজ তার এই সাফল্যের পেছনে বিন্দু দিদিমণির হাত আছে। শুভ স্কুলে টেরি কেটে ইস্কুলে গিয়েছিল। খারাপ বখাটে ছেলেগুলোর চাইতেও তাকে বাজে দেখাচ্ছিল। বিন্দু দিদিমণির ক্লাসে পড়া পারেনি সে। ডাস্টার দিয়ে ফোলানো টেরি ইস্ত্রি করে দিয়েছিলেন তিনি। সাবধান করে বলেছিলেন, সব ছেলের যা মানায় তোকে তা মানায় না। তোকে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ হয়ে উঠতে হবে। লেখাপড়া শিখে তোর বাবার হাতের ঝাড়ুটা তোকে কেড়ে নিতে হবে। এরজন্য কঠোর সাধনার দরকার। চুলের টেরি কেটে সময় নষ্ট করা তোর চলবে না।
কথাগুলোর বুঝি আত্মশুদ্ধির অ্যাসিড ছিল, পুড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল খাঁটি সোনা। সেদিনের পর থেকে সম্পূর্ণভাবে বদলে গেল শুভ। পড়া ছাড়া তার মনে আর কোনো চিন্তা নেই। কটা তো মাত্র বই, বারবার পড়ে আত্মস্থ হতে হবে। হাঁপিয়ে গেলে চলবে না। দম ধরে আরো ছুটতে হবে, আরো…আরো।
পরিশ্রমের ফল হাতেনাতে পেয়েছে সে। বিন্দু দিদিমণির কথা সে রাখতে পেরে খুশি। রেজাল্ট হাতে পেয়ে সে সবার আগে বিন্দু দিদিমণির কাছে গিয়েছিল। দিদিমণির পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই, তিনি আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, এই শুরু হল। আমি এর চেয়ে আরও অনেক বেশি কিছু দেখতে চাইছি। তোর চোখ বলছে, তুই তা পারবি।
বিন্দু দিদিমণি কথা শেষ করে শুভ’র হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটা নতুন জ্যামিতি বক্স।
সাইকেলের প্রতি শুভ’র ঝোঁক জ্ঞানপড়ার পর থেকে। অতসীপিসির ফুলবাগানে জল দিয়ে দিলে পেসেন্ট-পার্টিকে বলে সাইকেলের ব্যবস্থা করে দেন তিনি। সাধারণত বিকেলবেলায় সাইকেল চালাতে শুভর খু-উ-ব মজা লাগে। তখন রোদ পড়ে আসে, পাখির ক্লান্ত ডানায় ঘরে ফেরার আকুতি। এই সময়টাতে জোরে সাইকেল চালালেও হাঁপিয়ে পড়ে না শুভ। যার সাইকেল তিনিও বিরক্তিবোধ করেন না। অতসীপিসিকে তোয়াজ করে চললে তার রুগীর যত্নআত্তি ভালো হবে। তাছাড়া অতসীপিসির ব্যবহারটাই ব্যতিক্রমী। তার পোষা কুকুরের নাম বাঘা। অবিকল বাঘের মতো দেখতে। পিসি একা থাকেন বলেই তাকে পাহারা দেয় বাঘা বাঘা বাগানের ফুল ছিঁড়তে দেয় না কাউকে। সে সব সময়ের পাহারাদার। রোজ বিকেলে মনটা চনমনিয়ে ওঠে শুভর। যেন শান্ত নির্জন পুকুরে কেউ ঢিল ছুঁড়ে পালিয়েছে, ঢেউ…ক্রমাগত ঢেউ..এমন অনুভূতিময় মনের অবস্থা। কেউ যেন তাকে জোর করে টেনে আনে হাসপাতালের সামনে। অতসীপিসির ইভিনিং ডিউটি থাকলে একেবারে সোনায় সোহাগা। ডিউটি রুমের সামনে শুভ গিয়ে দাঁড়ালে পিসির যতই কাজ থাক, প্রচ্ছন্ন স্বরে বলবেন, আয় বোস। স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করেছিস তো?
