সেদিন একটা শ্যামা সংগীত শুনিয়েছিল রঘুনাথ। সব শোনার পর শুভর মুখে কোনো কথা নেই। আবেগতাড়িত স্বরে সে বলেছিল, একটা কথা বলব, রাখবে?
-বলে ফেলো।
–আমাকে বাঁশি বাজানো শিখিয়ে দেবে।
-বাঁশি বাজানো শেখানো যায় না, রঘুনাথ নিবিষ্ট চোখে তাকিয়ে বলেছিল, রক্তে যদি সুর থাকে তাহলে তা বাঁশি বা গলা ফুঁড়ে বেরবে। কেউ তাকে আটকাতে পারবে না। তবে সবার আগে তোমার একটা বাঁশি থাকা দরকার। আগে জানলে তোমার জন্য একটা বাঁশি সংগ্রহ করে রাখতাম। তা যখন হয়নি, তখন একটা কাজ করতে পারো।
-কি কাজ?
–তোমার বাবার বেতের বাঁটের ছাতা থাকলে নিয়ে এসো, আমি বাঁশি বানিয়ে দেবো।
সত্যি সত্যি বাঁশি বানিয়ে দিয়েছিল রঘুনাথ। বাঁশিতে ফুঁ দেওয়াও শিখিয়ে দিয়েছিল তাকে। শুভ চারা আনা আটআনা যখন যা পারত রঘুনাথকে দিত। রঘুনাথ ইতস্তত করলে সে বলত, আমি তো তোমার বন্ধু। বন্ধু কিছু দিলে নিতে হয়। না করতে নেই।
নেব, কিন্তু তার আগে চলো সই পাতাই। রঘুনাথ জোর করে হাত ধরে ছিল শুভর, চলো, আমরা জুড়ানপুরের মা কালীকে সাক্ষী রেখে মিতে হই। তাহলে আমাদের সম্পর্ক কেউ জ্বালিয়ে দিতে পারবে না। কান ভারি করতে গেলে সবাই ভয় পাবে।
সই পাতানোর পরে এ-ওর হাত ধরে ঘুরেছিল মন্দির চাতালে। শুভ বলেছিল, আজ থেকে আমাদের তুই-তোকারির সম্পর্ক। চল, আজ আর ঘরে যাবো না। তোর সাথে ঘুরব। যেখানে মন চায় যাব।
-তোর মা যদি খোঁজে।
-খুঁজুক। কিছু হবে না। শুভর কণ্ঠস্বরে জেদ। এ পৃথিবীকে সে যেন নতুনভাবে দেখতে চায়। রঘুনাথ তার চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়িয়ে দেয়। শক্ত মুঠোর মধ্যে শুভর হাতটা চেপে ধরে বলে, এতদিন তুই একা ছিলিস। এবার আমি তোর পাশে থাকব। কিছু হলে আমাকে তুই ডাক পাড়বি। আমি ঠিক চলে আসব।
-তোকেও বলা থাকল। তোর আপদে-বিপদে যেন দৌড়ে যেতে পারি। সেই সুযোগ যেন ভগবান আমাকে দেয়।
শুভর কথাগুলোয় আবেগ থাকলেও এ তার মনের কথা। রঘুনাথকে তার মনে ধরেছে। এ গাঁয়ে তার বন্ধুর অভাব নেই, তবু রঘুনাথ যেন সবার চাইতে আলাদা। বছর পাঁচেক আগে তার সাথে আলাপ হলে কী ভালোই যে হত। রঘুনাথ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। সে গাছে উঠে পাখির বাচ্চা ধরে আনতে পারে, দ্রুত গতিতে চলে যাওয়া হেলেসাপের লেজ বনবন ঘুরিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। এক নিঃশ্বাসে ডুব দিয়ে সে মাটি তুলে আনতে পারে পালপুকুরের। খেপা শেয়ালকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে গ্রামের বাইরে বের করে দিয়ে আসে। এত যার সাহস, সেই রঘুনাথের নাম রঘুবীর’ হওয়া উচিত ছিল। গত দু-বছরে রঘুনাথ শুভর অনেক কাছাকাছি। সময় পেলে শুভ হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় ওদের বাড়ি। কিন্তু হাজার ডাকলেও রঘুনাথ আসতে চায় না তাদের কোয়ার্টারে। একটা ভয়, সঙ্কোচ তার ভেতরে সবসময় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু রঘুনাথ কেন, তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও এই একই রোগে আক্রান্ত। শুভ বুঝিয়ে বললেও কথাগুলো বুঝি বোধগম্য হয় না।
এত দূরে চলে এসেছে সে। এখান থেকে হাসপাতালের কোয়ার্টারগুলো ধোঁয়ায় ডুবে থাকা ছবির মতো দেখা যায়। আজ যেন পাগল হয়ে গিয়েছে হাওয়া। গাঙ-পালানো বাতাস যেন ভরপেট মদ খেয়ে মাতলামি করছে রোদেব সংসারে ঢুকে। ওই টালমাটাল বাতাস ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে খেজুরগাছের ঝাঁকড়া মাথা। যতবারই এদিকটাতে এসেছে ততবারই আনন্দে মন ভরে গেছে। শুভর। কোনোবারই তার মনে হয় না একই দৃশ্য দেখছে। পট পরিবর্তন ঘটেছে ঋতু আর দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে। এবছর আমের শাখায় মুকুল এসেছে সাত তাড়াতাড়ি, ফলে সুগন্ধে ম-ম করছে বাঁধের চারধার। আর সেই সুগন্ধ ধীরে ধীরে শরীরে ঢুকিয়ে নিচ্ছে তিরতিরে স্রোতের মৌরলা মাছের মতো রূপো চকচকে জলের বুড়িগাঙ।
শুভ কী করবে ভাবছিল, চেনা-জানা কারোর সঙ্গে এসময় দেখা হলে সে যে সমস্যায় পড়ে যাবে এই ভাবনা কিছুটা হলেও তাকে কাবু করে ফেলেছে। আজ ইস্কুলে রেজাল্ট আউট হবার পর সবাই কেমন তার দিকে ভ্যালভ্যাল করে দেখছিল। সে তত পড়াশোনায় ভালো, তবু, অমন করে ড্যামাড্যামা চোখে তাকে দেখার কি আছে–বুঝতে পারেনি সে। তবে একটা কথা তার আনন্দের প্রদীপটাকে ফুঃ দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছে। সুপ্রিয় পোদ্দার তাদের ক্লাসেই পড়ে, সে পড়াশোনাতে ভালো, ওর বাবার রেশন-দোকান আছে বাজারে। অবস্থা ভালো বলে একটা প্রস্ফুটিত অহঙ্কার তাকে শিমুলফুলের মতো রাঙা করে রাখে। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা তাকে বিশেষভাবে তোয়াজ করেন কেননা শিবশঙ্কর পোদ্দার এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার। সেই সুপ্রিয় মাধুরীকে বলছিল, একটা মেথরের ছেলের কাছে হেরে গেলাম। ও কি করে এত নাম্বার পেল জানি না। নিশ্চয়ই কিছু লণ্ডভণ্ড হয়েছে।
কথাটা শোনার পর মাধুরীর মুখের রঙটাই পাল্টে গিয়েছিল সহসা, কী উত্তর দেবে ভেবে পায়নি সে। অস্বস্তিতে ঘেমে উঠেছিল মাধুরী। নখ খুঁটে পায়ের দিকে তাকিয়ে সে ঠোঁট কামড়ে ধরল অজান্তে। কিছু শোনার জন্য সুপ্রিয় মাধুরীর ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়াল। মাধুরী নিজেকে সামলে নিয়ে সেঁক গিলে বলেছিল, তোর এত ছোট মন, আমার জানা ছিল না। ভালো জামা কাপড় পরলেই মানুষ যে ভালো হয় তা নয় দেখছি! শুভ আমাদের বন্ধু। ও পড়াশোনা করে সেকেন্ড হয়েছে। ওকে হিংসে করলে আমরা কেউই মহান হয়ে যাব না।
