.
৩২.
খাঁচা ভাঙা পাখির মতো চোখ মেলে দরজা ধরে দাঁড়িয়েছিল সরস্বতী, যা শুনেছে তা মেনে নিতে কোথায় যেন বাধ বাধো ঠেকে। ডাক্তারবাবুর মেয়েকে হারিয়ে দেওয়া মুখের কথা নয়। মেয়েটা শুধু পড়াশোনাতেই নয়–দেখতেও চমৎকার। সপ্তাহে একবার হলেও সে এখানে আসবেই। ডাক্তারবাবুই বলেছেন, লেখাপড়া কনসাল্ট করে পড়লে ব্রেন খোলে। একা না থোকা।
মাধুরী আসত। শুভও যেত। মাধুরীর সব বই কেনা আছে। শুভ পাঠ্যপুস্তক কিনলেও মানে বইগুলো কিনতে পারেনি। মাধুরীই বলেছে, তুই আমার কাছ থেকে নিয়ে পড়বি যখন যা দরকার নিয়ে যাবি।
অবনী পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে হাত চেপে ধরল শুভর, ভালো করে পড়। সেকেন্ড হয়েছিস, এবার তোকে ফার্স্ট হতে হবে।
–সে আমি হবোখন। শুভর কণ্ঠস্বরে আত্মবিশ্বাস, স্ট্যান্ড করলে আমাকে সাইকেল কিনে দেবে বলেছিলে। কথাটা মনে আছে তো?
কেমন ভ্যাবাচেকা খাওয়া চোখে তাকাল অবনী, ঢাক গিলে বলল, স্ট্যান্ড করা মানে?
-ফাস্ট সেকেন্ড থার্ডের মধ্যে হওয়া। আমি হয়েছি। এবার তুমি আমাকে সাইকেল কিনে দাও। আমি আর পরের সাইকেল চালাব না। শুভ আশার চোখে তাকাল।
অবনী ছেলেকে আশ্বস্ত করতে পারল না, বরং ভোল পাল্টে গেল তার, বললাম তো ফার্স্ট হ, ফার্স্ট হলে কিনে দেব। এখন সাইকেল চালাতে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে। তোর আর পড়া হবে না তখন।
–তাহলে দেবে না?
–বললাম তো দেব।
-মিথ্যুক। শুভর চোখ জলে ভরে এল অভিমানে। সরস্বতী নীরব দর্শক। ঘরে চাল নেই সেদিকে খেয়াল নেই অবনীর। অথচ কথা ছিল চাল এনে দিয়ে সে বাজারে যাবে। পরীক্ষার ফল বেরবে, আজ মাছের ঝোল খেয়ে যাবে শুভ। মনে মনে এমনই একটা ইচ্ছে ছেলেটারও ছিল। কিন্তু যে এসব করবে–সেই মানুষটি যে নির্বিকার। তার নিঃস্পৃহতায় মনে মনে দুঃখ পেয়েছে সরস্বতী। অভাবের ঘরে টাকা হল চাঁদের আলো। যার টাকা আছে, তার জ্যোৎস্না আছে। কোনো কিছুই ব্যবস্থা করতে পারেনি সরস্বতী। সময় নষ্ট না করে ইস্কুলে চলে গিয়েছিল শুভ।
অবনী হাঁ করে তাকিয়ে আছে শুভর মুখের দিকে, কি বললি তুই, আমি মিথ্যুক?
মাথায় রক্ত উঠে যাওয়া শুভ বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ তুমি মিথ্যুক। তোমার কথার কোনো দাম নেই। কথার দাম থাকলে আমাকে ঠিক সাইকেল কিনে দিতে।
শুভর হাতটা ধরে রাগের ঘোরে মুচড়ে দিল অবনী। ঠেলা মেরে বলল, বেরো আমার ঘর থেকে। মার রক্ত পেয়েছিস, তাই অমন জানোয়ার হচ্ছিস। বাঁচতে চাস তো পালা। নাহলে মেরে তোর হাড় সার বানিয়ে দেব।
কি বলছ তুমি? পাগল হলে নাকি? সরস্বতী ছেলের সমর্থনে রুখে দাঁড়াল, লজ্জা করে না শিক্ষিত ছেলের গায়ে হাত তুলতে?
-আহা রে, কী আমার শিক্ষিত। ঠোঁট-মুখ উল্টে অবনী বলল, ক লিখতে কলম ভাঙে সে আবার শিক্ষিত। ছ্যা!
কঠিন শব্দগুলো বোলতার মতো তাড়া করে শুভকে। কালবিলম্ব না করে শুভ প্রোগ্রেস রিপোটটা দল্লা পাকিয়ে ছুঁড়ে দেয় তক্তপোষের উপর। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে এক ঝলক সে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। তারপর তীরের মতো ছুটতে লাগল বাঁধের দিকে।
জগৎখালির বাঁধ কোথায় যে গিয়ে শেষ হয়েছে তার শেষমুড়ো আর দেখা হয়ে ওঠেনি শুভর। তবে ভূগোলের মাস্টারমশাই সুদামবাবু একদিন ক্লাসে বলেছিলেন, জগৎখালির বাঁধ যদি কোনোদিন ভেঙে যায় তাহলে নদীয়া বর্ধমান আর মুর্শিদাবাদ জেলার বহু গ্রাম ভাগীরথীর জলে তলিয়ে যাবে। সে দৃশ্য চোখে দেখা যাবে না। মানুষের হাহাকার চাপা দিয়ে দেবে পাখির কলকাকলি।
কথাগুলো শুনতে শুনতে চোখ হাঁ হয়ে গিয়েছিল শুভর। বুনোপাড়ার রঘুনাথের সঙ্গে তার এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। রঘুনাথ বলেছে, দাঁড়া, একটা সাইকেল কিনি তারপর তোকে সাইকেলে চাপিয়ে বাঁধের কোথায শেষ দেখিয়ে নিয়ে আসব। তবে আমি এই বাঁধ ধরে পলাশী মনুমেন্টের কাছ অব্দি গিয়েচি। আঃ, কি সুন্দর জায়গা রে, দেখলে চোখ ভরে যায়। তুই যদি যেতে চাস তোকেও নিয়ে যেতে পারি।
রঘুনাথের কথাগুলোয় খোঁচা ছিল কিনা, তা বুঝতে পারে না শুভ। তবে একটা সরল বিশ্বাস থেকে সে যে এই কথাগুলো বলেছে তা অনুভব করতে পারে সে। যতদূর তার ধারণা রঘুনাথের মনে এত মার প্যাঁচ নেই, সে দেবদারু গাছের মতো সহজ-সিধা। কোনো উপর চালাকি নেই বলেই সে বোমভোলা শিবের মতো দেখতে। শিবঠাকুরের থানে মানত করে ছিল দুর্গামণি, ব্যাটাছেলে হলে ঢাকঢোল বাজিয়ে ঘটা করে পুজো দেবে। মানত করার বছর না ঘুরতেই রঘু পেটে এল। শুকিয়ে যাওয়া সংসারে আবার নতুন করে প্রাণ এল, রোদে পোড়া গাছগুলো বর্ষার জল পেয়ে যেমন তরতাজা হয়ে ওঠে তেমনই চনমনে আর ফুর্তিবাজ হয়ে উঠল গুয়ারাম। হাসি মস্কারা মেরে বলেছিল, মরা ডালে ফুল এয়েচে গো, এবার নের্ঘাৎ ফল হবে।
.
আপদে-বিপদে যে বাঁশি সাথ দেয় রঘুনাথের সেই বাঁশিকে চালে গুঁজে রেখে এসে সে শান্তি পায় না। মন খারাপের সময় এই বাঁশি তাকে সান্ত্বনার সুর শোনায়। চুনারাম যেন সুর হয়ে তার সারা অঙ্গে অদ্ভুত একটা যাদুছোঁয়া দিয়ে যায় যা ভাষায় সে প্রকাশ করতে অক্ষম। জ্যোৎস্না থকথকে রাত রঘুনাথের বাঁশির সুর হাওয়ায় ভর দিয়ে পৌঁছে যায় শুভর কানে। এত ভালো বাঁশির সুর সে রেডিও ছাড়া আর কোথাও শোনেনি। পড়া থামিয়ে বাইরে এসেছিল শুভ। সুরের টানে পৌঁছে গিয়েছিল হাসপাতালের বারান্দায়। যেখানে পনেরই আগস্ট, ২৬শে জানুয়ারি পতাকা তোলা হয় সেই সিমেন্ট বাঁধানো বেদিতে বসে বাঁশিতে এক নাগাড়ে ফুঁ দিয়ে চলেছে রঘুনাথ। জ্যোৎস্নার আলোর মতো সুর যেন গড়িয়ে নামছে ঘাসের পালঙ্কে। শুভ গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, রঘুনাথের তা খেয়াল নেই। বাঁশি থামতেই চোখাচোখি হল ওদের। শুভ দেখল রঘুনাথ তার চাইতে বছর দু-তিনেকের বড়া হবে। তবে তার পেটা চেহারায় মেহনতী মানুষের সব লক্ষণগুলো পরিস্ফুট। শুভই প্রথম বলেছিল, ভারী চমৎকার বাঁশি বাজাও তো তুমি। রঘুনাথ এ কথাকে তেমন পাত্তা না দিয়ে বলেছিল, আমি বাঁশিতে গান বাজাতে পারি। শুনবে?
