সকালের ঝামেলাটা মাথা থেকে যায় নি তখনও। শুধু শুধু কেউ কথা শোনালে এ বয়সেও রাগ হয়। সরস্বতী ঘর সামলাতে ব্যস্ত। সে এসবের ধার ধারে না’ এক কাপ চা চেয়েছিল সরস্বতীর কাছে, মাথা ধরেছে বলে। সে দেয়নি। উল্টে মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছে, ছেলেটা না খেয়ে ইস্কুলে গেল। ঘরে দুটো বিস্কুটও তো আনো না।
–আনব কি করে, এ সংসারে আগুন লেগেছে। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পশুর মতো হাঁপাচ্ছিল অবনী। সরস্বতী তার রাগের পারদ চড়িয়ে দিল, অমন কাছা খোলা মানুষ জীবনে আমি দেখিনি, বাপু। হাড়-মাস জ্বালিয়ে খেল।
-চুপ কর। শুয়োরের মতো চেল্লালে দাঁত ভেঙে দেব।
-কই ভাঙো? এক বাপে জন্ম হলে ভাঙো। তোমার মায়ের দিব্যি রইল। ভাঙো। ধেয়ে আসা ঝড়ের মতো সরস্বতী আছড়ে পড়ল অবনীর নিঃশ্বাসের এলাকায়। চুলের মুঠি ধরতে চেয়েছিল অবনী, কিন্তু ধরল না। এ তো রোজকার নাটক। অভাবের সংসারে এর চেয়ে আরও কত কী ঘটে যায়। খুনখারাপি যে ঘটে না তা নয়। মেজাজ তেতো হয়ে গেলে হাতের সামনে যা পায় তাই দিয়ে রাগ শান্ত করতে চায় অনেকেই। অবনী সে পথে হাঁটল না। শুধু ঢোঁক গিলে বলল, আমার সংসারের ভাত তোমার কাছে তেতো লাগছে বুঝতে পারছি।
ঠোঁট মুখ বেঁকিয়ে সরস্বতী বলল, শুধু তেতো নয়, গলা দিয়ে বমি ঠেলে উঠছে। দাঁড়াও আর বেশিদিন নেই, যেদিন তোমার সংসারে লাথ মেরে চলে যাব।
-হ্যাঁ, হ্যাঁ যাও। তুমি গেলে আমি মা বুড়োমার কাছে পুজো দেব। অবনী কথাগুলো বলল বটে, কিন্তু বলতে গিয়ে বুকের কাছে তার খচ্ করে উঠল। সরস্বতী চলে যাওয়ার অর্থ এ সংসারের প্রদীপ নিভে যাওয়া। এর আগে একবার ঝগড়ার জের ধরে ফলিডল খেয়েছিল সে। সে যাত্রায় ডাক্তারবাবু তাকে বাঁচিয়ে দেন। হাসপাতালের বেডে শুয়ে সরস্বতী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, বাবু, আমি বাঁচতে চাইনে। আমাকে এমন ওষুধ দিন যা খেয়ে আমি মরে যাই।
তোমার ছেলে আছে। তার মুখ চেয়ে তোমাকে বাঁচতে হবে। ধমকের সুরে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, যে ভুল করেছ তা আর দ্বিতীয়বার করতে যেও না। স্টমাক-ওয়াশ করার ঝামেলা কত তা তো নিজের চোখে দেখলে। প্রায় দশ-দিন হাসপাতালে কাটিয়ে সরস্বতী যেদিন ছাড়া পেল, সেদিন ডাক্তারবাবু অবনীকে ডেকে বলেছিলেন, দাঁত থাকতে যারা দাঁতের মর্ম বোঝে না তাদের আমি কী করে বোঝাব। মেয়েমানুষ ছাড়া ঘর-সংসার অচল। বুঝলে অবনী, মেয়েদের শ্রদ্ধা করতে না পারো তবু অবহেলা করো না। এবারের মতো সরস্বতী বেঁচে গেল ভাগ্যের জোরে। মনে রেখো-ভাগ্য সবসময় সঙ্গ দেয় না। তখন কিন্তু সারাজীবন কপাল চাপড়াতে হবে।
কোন সংসারে অশান্তি নেই। ভাত যখন ফোটে তখন আগুন আর উত্তাপ তো থাকবেই। তবু মানিয়ে নেওয়াই মানুষের ধর্ম। সরস্বতী মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে বারবার হেরে গেছে। অবনীর মন কুকুরের লেজের মতো কখনও সোজা হতে চায় না, সোজা করলে কখন যে আবার বেঁকে বসে বোঝার সময়ও দেয় না। এসব কোনো কিছুই চোখ এড়ায় না শুভর। জ্ঞান হবার পর থেকে সে যেন ঘোরের মধ্যে ঘুরছে। হাসপাতালের টাইপ-ওয়ান কোয়ার্টারটাকে তার মনে হয় জেলখানা। এখানে ঢুকে এলেই তার যাবতীয় উৎসাহ, উদ্যম শাসকষ্টের রোগীর মতো ছটফট করে। সরস্বতী সব বুঝেও চুপ করে থাকে। ছেলের মাথায় স্নেহের স্পর্শ দিয়ে বলে, বড়ো হ। বড়ো হওয়ার আগে মনটাকে সবার আগে বড়ো কর। ব্যাঙাচির কাজে নিয়ে বেশিদূর যাওয়া যায় না। শুভ বুঝতে পারে মায়ের এই কথাগুলোয় খুবই সূক্ষ্মভাবে হলেও বাবার প্রতি একটা কটাক্ষ লুকিয়ে আছে। এটা কতটা প্রয়োজনীয় বা আবশ্যিক তা জানা নেই শুভর। এ সম্বন্ধে সে জানতেও চায় না। বড়োদের মাঝখানে তার উপস্থিতি খুব প্রয়োজন আছে?
দুপুরে শুভ যখন এল তখন ঝগড়াটা থিতিয়ে গেছে। অবনী মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছিল সব কিছু। কিন্তু এসব তো আর শ্লেটের ওপর দাগ নয় যে জল ন্যাকড়ার সাহায্যে তা মুছে যাবে সহজে। মনের দাগ কলার কষের চাইতেও ভয়ানক। সেই টানা- পোড়নে কিছুট ধ্বস্ত অবনী। ডাক্তারবাবুর ধমক তাকে বেশি দুঃখ দিয়েছে। কেন হঠাৎ এত নিষ্ঠুর হতে গেলেন ডাক্তারবাবু। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কারণ কোনো কিছুই নেই সেটা বারবার নিজেকে বোঝাতে চাইল অবনী। শুভ ঘরে ঢুকে এল মাথা উঁচু করে, আনন্দ আর গর্বে চকচক করছে তার কচি-কিশোর শ্যামলা মুখখানা। মুহূর্তে অবনীর মনে হয়েছিল ঐ মুখ যেন আঁটি না হওয়া কাঁচা হিমসাগর আম। ভালো লেগেছিল তার। শুভ যখন বলছিল, বাবা, আমি সেকেন্ড হয়েছি। এবার আমি ডাক্তারকাকুর মেয়েকেও হারিয়ে দিয়েছি। মাধুরীর চেয়ে আমি ছাব্বিশ নাম্বার বেশি পেয়ে সেকেন্ড হয়েছি।
যে সাড়া, আবেগ ও উত্তাপ অবনীর কাছ থেকে আশা করেছিল শুভ তা না পেয়ে বেশ কিছুটা বিমর্ষ দেখাল তাকে। অবনীর নীরব থাকার কারণ তার কাছে রহস্যময় ঠেকল। অবনী ভাবছিল সে যা কোনোদিনও পারবে না, শুভ ঠিক সেই কাজটা করে ঘরে এসেছে। ডাক্তারবাবুর মেয়েকে হারিয়ে দেওয়া মানে ডাক্তারবাবুকে কিছুটা হলেও হারিয়ে দেওয়া। মাথার উপর সব সময় যার ছড়ি ঘোরানোর অভ্যাস তিনি কি এই পরাজয় মেনে নেবেন? পরীক্ষার ফলাফলের খবর ডাক্তারবাবু কি আগে থেকে জানতে পেরেছিলেন? হতেই পারে। বড়ো মানুষদের লম্বা হাত। এ গ্রামের সব শ্রেণীর মানুষই তো ডাক্তারবাবুর জানাশোনা। তার পক্ষে আগেভাগে রেজাল্ট জানা কোনো কঠিন কাজ নয়।
