পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সরস্বতী প্রতিবাদ করেছে, দেশ যাব বললে তো আর যাওয়া হয় না! দেশ তো তোমার দেবগ্রাম নয় যে বাসে চড়লেই পৌঁছে দেবে! দেশ যাওয়ার জন্য গাড়ি-গাড়ি টাকা দরকার। কোথায় পাবে তুমি?
হাওয়া খুলে দেওয়া সাইকেল টিউবের মত চুপসে যায় মুখ, মিনমিনে গলায় অবনী যুক্তি দেখিয়েছিল, পয়লা তারিখ বেতন হয়ে যাবে। বাবু বলেছে! বেতন হয়ে গেলে আর চিন্তা কি!
বেতন কি ঘর অব্দি আসবে? সরস্বতীর গলায় ঠেলে ওঠে বিদ্রূপ, তোমাকে আমি চিনি নে। তুমি হলে ধার মাস্টার। চালের দোকান থেকে নিয়ে একেবারে মাছ-দোকান…সবখানে তোমার ধার।
–ধার কার নেই বলো তো? ধার আছে বলেই তো পৃথিবী সবার। কেমন বোকার মতো হাসতে থাকে অবনী। সরস্বতীর বদ্ধমূল ধারণা হয়–মানুষটা বোকার বোকা। ঘটে একফোঁটা বুদ্ধি নেই। ওর থেকে ছেলেটার বুদ্ধি হাজার গুণ ভালো। ভালো হলে কি হবে, ও তো কারোর কথা শুনবে না। মুখ মানুষের গোঁ শিং উচানো মহিষের গোঁ-এর চেয়েও মারাত্মক। কালিদাসের গল্প শুনেছে সরস্বতী। সেই লোকটা যে ডালে বসে আছে, সেই ডাল নাকি কাটছিল। আঃ, মরণ! অনেকদিন পরে জোড় মিলেছে মানুষটার। সরস্বতী বুঝে পেল না সে কাঁদবে না হাসবে! শুধু কপালে করাঘাত করে ডুকরে উঠল, এর পাল্লায় পড়লে আমার জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। আমাকে কিছু করতেই হবে। না হলে নিস্তার নেই।
খাকি ফুলপ্যান্টের উপর অবনীর হাতকাটা সাদা জামা। নীল বড়ি ছোপ ছোপ লেগে আছে তাতে। সরস্বতী কলপাড়ে গিয়ে বল সাবানে ঘষে ঘষে ধুয়েছে। এসব কাজে তার জুড়ি মেলা ভার, শুধু মুখটুকু যদি একটু মিঠে হত। মিষ্টি কথায় আজকাল কি না হয়। আসলে সরস্বতীর মুখের ভাষাটাই বুঝি নিম-তেত। জন্মের সময় ওর মা-বাবা বুঝি ওর মুখে নিমপাতার রস ঢেলে দিয়েছে, নাহলে অমন হবে কেন? বউটার শরীরে তার জন্য একটুও কি দয়া-মায়া নেই। কী নিষ্ঠুর বাপরে, বাপ! পারলে যেন গলা টিপে ধরে, দম আটকে মারে। আজই তো হয়ে যাচ্ছিল দফারফা। প্রোগ্রেস কার্ডটা নিয়ে শুভ যখন খুশিতে টগবগিয়ে ঘরে ঢুকল তখন হাসপাতাল থেকে ফিরে মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়েছিল অবনী। খোলা জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়েছিল তার পিঠের উপর। মন্দ লাগছিল না। আরামে জুড়ে এসেছিল চোখ। ঠিক সেই সময়, শুভ এল বিশ্ব জয় করে, খুশিতে ডগমগিয়ে বলল, বাবা, ওঠো। এই দেখ আমি সেকেন্ড হয়েছি।
মুখের পাশটা হাতে রগড়ে নিয়ে উঠে বসেছিল অবনী, চোখ ডলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিল সে। আসলে জড়িয়ে যাওয়া ঘুম, আর জড়িয়ে যাওয়া শুয়োফল চট করে শরীর থেকে বিদেয় হতে চায় না। তবু অবনী আড়মোড়া ভেঙে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, কই দেখি, তোর রেজাল্ট দেখি।
ভাঁজ করা রিপোর্ট কার্ডটা এগিয়ে দিল শুভ, বাবা, আমি বলেছিলাম ফাস্ট সেকেন্ড থার্ডের মধ্যে হবো–হয়েছি। তুমি বলেছিলে যদি স্ট্যান্ড করতে পারি সাইকেল কিনে দেবে। এবার কিন্তু তোমাকে কিনে দিতেই হবে। আমি আর কোনো কথা শুনব না।
বাইরের কুলগাছে বসে কাক ডাকছিল তারস্বরে। বাঁধের ওদিকে ঝগড়া বেঁধেছে বুড়িগাঙে মাছ ধরা নিয়ে। কড়া এবং অশ্লীল শব্দ বয়ে আনছিল বাতাস। অবনীর ম্যাজমেজানি স্বভাবটা শুধু শরীরে নয়, মনেও স্থায়ী তাঁবু গেড়েছে। অকারণে হাসপাতালে ডিউটি গিয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে গালিগালাজ শুনতে হল। দোষটা তার নয়, দোষটা যে নাইট ডিউটি করেছে তার। প্রমথ পাশের গ্রাম কুলবেড়িয়া থেকে আসে সাইকেল নিয়ে। তার জমিজমা আছে ফলে ব্যস্ততার শেষ নেই। মন দিয়ে ডিউটি করাটা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয় নাহলে প্রায় সে ভুলে যায়। দু-নৌকোয় পা দেওয়া মন আজও ভুল করেছে কাজ। কথা ছিল আউটডোরটা ঝাট দিয়ে ময়লাগুলো ফেলে আসবে পাঁচিলের ওপিঠে। সেটা সে করেনি। রাউন্ড দিতে এসে প্রথমেই এটা লক্ষ্য করেন ডাক্তারবাবু, তাঁর মাথায় তখন রাগের কাঁকড়াবিছে কামড়ে দেয়। এ হাসপাতালের সর্বময় কর্তা তিনি। তার কথার অবাধ্য হওয়া মানে নিয়মশৃঙ্খলা রসাতলে যাওয়া। এটা কোনমতেই মেনে নেওয়া যায় না। বেতন নেবার সময় কেউ এক পয়সা কম নেয় না। পয়সা যখন কেউ কম নেবে না-তখন কাজ বুঝে নিতেই হবে। কাজে অবহেলা একটা মহা-অপরাধ। ধারেকাছে কাউকে না পেয়ে ডাক্তারবাবু অবনীকেই ডাকলেন হাতের ইশারায়। বেশ চড়া স্বরে বললেন, আউটডোরের সামনেটা ঝাট দিতে বলেছিলাম, ওটা আজও হল না কেন? সামান্য ঘাবড়ে গিয়ে অবনী বলেছিল, নাইট ডিউটির স্টাফ ঝাট দিয়ে যায়, বাবু। প্রথম বলেছিল ঝাট দিয়ে যাবে, হয়ত ভুলে গেছে। ঠিক আছে আমিই দিয়ে দিচ্ছি।
সব কাজে তোমাদের একটা অজুহাত তৈরিই থাকে। যত সব রাবিশ। গট-মট কবে ফিমেল ওয়ার্ডের দিকে চলে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। তার রাগটা যে কার উপর সেটা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না অবনী। তবে তার মন খারাপ হয়ে গেল। রাগও হল প্রমথর উপর প্রচণ্ড। বড্ড কামচোর ছেলে। খালি ঘর যাবার ধান্দা। চাকরিটা ওর কাছে খেতের শাক তুলতে আসার মত। এ নিয়ে অনেকবার কথা কাটাকাটি হয়েছে ওদের। অন-ডিউটির দিদিমণিরাই আবার মিটমাট করে দিয়েছেন। এক জায়গায় কাজ করতে গেলে ঠোকাঠুকি তো লাগবেই।
আউটডোরের সামনের দিকটা শান বাঁধানো। রোগীদের বসার জন্য সিমেন্টের বেঞ্চি আছে দু-পাশে। রবিবার ছাড়া সপ্তাহের বাদবাকি দিন গ্রামের মানুষের ভিড় লেগে থাকে। কালীগঞ্জ ছাড়া আশেপাশের দশটা গ্রামে কোনো হাসপাতাল নেই। রুগীর চাপ তো থাকবেই। একা কুম্ভের মতো ডাক্তারবাবু একাই যেন একশ। টিকিটের উপর ঘ্যাসঘ্যাস করে ওষুধ লেখেন। ট্যাবলেট। মিক্সচার, ইনজেকশন আরও কত কী! ডিউটিতে এসে সব দেখেছে অবনী। মানুষটার ধৈর্যের কাছে মাথা নত করে সে। আসলে ধৈর্যটাই বড়ো কথা। ধৈর্য না থাকলে মানুষ বড়ো হতে পারে না। শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে মাঝে মধ্যে সে এমন স্বপ্ন দেখে বইকি। শুভই তার স্বপ্ন দেখা উসকে দিয়েছে। কুঁজোরও তো মন হয় চিৎ হয়ে শোওয়ার জন্য। এমন সখের মধ্যে দোষের কোনো গন্ধ নেই।
