অতসী দিদিমণি সহজে কঠিন কথা বলেন না। রাগেনও না চট করে। তবে রেগে গেলে আর রক্ষে নেই। যতক্ষণ না রাগ পড়ছে-ততক্ষণ কেবল মনের ভেতর গজ গজ। আসলে সাদা মনের মানুষগুলোই এইরকম। অবনী চুপ করে থাকলেও তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ভালো মানুষদের চটিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তাছাড়া এই বয়সে আর রাগঝাল মানায় না। রাগ করবে কার উপর? দায়ের উপর কুমড়ো পড়লে কুমড়োই কেটে দু-ফাঁক হয়ে যায়। কোথায় দিদিমণি আর কোথায় সে! আসমান জমিন ফারাক। অবনী হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এল হাসপাতালের মাঠটা। এই সময় চাড় বেঁধে আছে ঘাস। ঘাসমুখে ফুল এসেছে নাকছাবির মতো। কত অজস্র ফুটে আছে। কেউ দেখে, কেউ দেখে না। কিন্তু এসব চোখ এড়ায় না অবনীর। ঘাসকে মনে হয় লতায়-পাতায় আত্মীয়। কত বছর ধরে এরা বেঁচে আছে সাক্ষী থাকছে মানুষের বেঁচে থাকার। আহা, কি মমতায় মাটি আঁকড়ে রেখেছে তাদের। দেখলে আর চোখ ফেরান যায় না। কী ভেবে মাথা নীচু করে অবনী মাটির দিকে তাকাল। শুয়ে থাকা মাটি যেন উঠে বসল, বলো, ডাকছ কেন?
শুভটা কোথায় গেল বলো তো? অবনীর চোখের কোণ আর্দ্র হয়ে উঠল। বেলা তখন কত হবে, বড়ো জোর বারোটা। শীতের রোদ দুধদাঁতের কামড় ছেড়ে রাগী কুকুরের দাঁতের মতো কামড়াচ্ছে গতর। আজ যে বাতাসে কি ছিল কে জানে-অবনীর মনে হল আজ বড়ো আনন্দের দিন। সকালে কলতলায় ছাই দিয়ে দাঁত মাজতে গিয়ে সে দেখেছিল দুটো শালিক ঘুরঘুর করছিল হেলেঞ্চা ঝোপের পোকা খাওয়ার জন্য। রোজই আসে শালিক দুটো। খুব ভাব ওদের মধ্যে। সামনের ছোট্ট মাঠটাতে চরে বেড়ায়, কখনও উড়ে যায় পালপুকুরের পাড়ে। ওদের দেখলে শুভর শরীরে খুশির দেবতা বুঝি ভর করে। হাত নেড়ে, চোখ নাচিয়ে গলা ফাটিয়ে সে বলবে, মা, দেখে যাও দুই শালিক।
সরস্বতী বাইরে বারান্দায় এসে টুকি মেরে দেখবে সত্যিই তো দুটো শালিক পাশাপাশি চরছে। ওরা কত সুখী। তারা কেন শালিক পাখি দুটোর মতো পাশাপাশি থাকতে পারে না। অবনী এমনিতে শান্ত, হাবাগোবা। তার শরীরে রাগ বলে যে কোনো বস্তু আছে এটা খুব কমই টের পায় সে। তবে যারা রাগে না, হঠাৎ রেগে গেলে তাদের রাগ আর চট করে নামানো যায় না। এ-ও এক অসুখ। সরস্বতী ছেলের আবদার মেটাতে ড্যাবডেবানো চোখে দেখে জোড়া শালিক। জোড়া শালিকের মাহাত্ম তার মগজে ঢোকে না। সে মুখ মানুষ। পড়া লেখা শেখেনি। নাম সই করতে পারে না। শুভ তাকে হাজার চেষ্টা করেও নাম লেখা শেখাতে পারেনি। হাল ছেড়ে দিয়ে সে বলেছে, মাত্র তো কটা অক্ষর, তাও ঠিক করে লিখতে পার না?
-লেখা কি মুখের কথারে, বাবা! এর চেয়ে নকসা বড়ি দেওয়া আর জিলিপি ভাজা সহজ।
কী যে সহজ কী যে কঠিন–তা বোঝার বয়স হয়নি শুভর। সে শুধু পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু জানে না। মনের মধ্যে একটা জেদ এসেছে, জেদটা উইটিপির মতো নয়, একেবারে পাথরের মতো শক্ত। সে হারবে না। মন দিয়ে লেখাপড়া শিখবে। তাকে বড়ো হতে হবে। মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। এই এক অস্ত্র যার সঙ্গে সে যেতে পারবে অনেক দূর। ভয় পেলে, ঘাবড়ে গেলে চলবে না। লেখাপড়া শিখে যে করেই হোক তাকে একটা ভালো চাকরি পেতেই হবে। যাদের টাকা-পয়সা নেই, গরীব মানুষ–তাদের এ ছাড়া আর কী থাকতে পারে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য। পাতলা গোঁফের রেখা ফুটলেও শুভ বুঝে গিয়েছে–লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই তার জীবনে। খুব অল্প বয়স থেকেই দারিদ্রের দাঁত খিচুনি তার ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে ওঠে সে। এই তো, মাত্র কদিন আগে, বাবা তাকে অঙ্ক খাতা কিনে দিতে পারেনি। পারেনি তারজন্য কোনো আক্ষেপ নেই মানুষটার। শুভ লক্ষ্য করেছে–তার বাবার মুখখানা। কোনো আক্ষেপ বা দুঃশিন্তা নেই। বরং গলা উঁচিয়ে বলেছে, দাঁড়া, হাসপাতাল থেকে সাদা কাগজ এনে দেব। তখন লিখবি।
-এনে দেবো বলো। দাও না তো? শুভর মুখের দিকে তাকাতে পারে না অবনী, নিজের ছায়াকে যেন ভয় পায় সে। বুঝতে পারে–লেখাপড়া শেখা চোখ আগুনে তাতানো তীরের চেয়েও মারাত্মক। স্যাট করে মাথা নামিয়ে নেয় সে। শুভও এই সুযোগটা নিতে কোনো কসুর করে না, ধাতব শব্দ বের করে দেয় গলা থেকে, সুবীরকাকুর সঙ্গে তুমি বারান্দায় বসে কি খাচ্ছিলে আমি সব দেখেছি।
কি দেখেছিস তুই? অবনী ফুঁসে উঠতে চাইল। সে ভেবেছিল তার গলার জোরে ভয় পাবে শুভ, এবং চুপ করে থাকবে। কিন্তু তা হল না। শুভই যেন ছিটিয়ে দিল কাদা, বোতলে কী ছিল ভাবছ কেউ বুঝি জানে না। আমি মাকে সব বলেছি। মা বলেছে ডাক্তারকাকুকে বলবে। তখন দেখবে তোমার কি হয়! ছেলেকে খাতা কিনে দিতে পার না, আর বসে বসে মদ খাও, তোমার লজ্জা করে না?
-মারব তোকে। ফুঁসে ওঠে অবনী।
শুভ হার মানতে শেখেনি। মুখ বাড়িয়ে দেয় সে, মারো। মেরে শেষ করে দাও। আমি একটুও কাঁদব না। আমি মরে যাব। আমি আর বাঁচতে চাইনে।
শুভর চোখের জল আজ কী করে সব উথলে উঠছে অবনীর চোখে। দুপুরবেলায় এমন কাণ্ড না ঘটালেই তো পারত। সেই কবে থেকে শুনছে–সোমবার রেজাল্ট বেরবে। রেজাল্ট বেরনোর পর আবার দশদিনের জন্য ছুটি হয়ে যাবে স্কুল। ছোলাগাছে ফল এসেছে এখন। আর শীতটাও আছে জব্বর। খড়কুটো জড়ো করে গাছছোলা পুড়িয়ে খাবে বন্ধুরা মিলে। অবনী বলেছে, রেজাল্ট বেরলে দেশ যাব।
