শরীর ভাঙে না, শরীর গড়ে। ক্রমশ উজ্জ্বল হয় ঝারির দেহশোভা। সেই সুখের দিনটার জন্য শরীরের ঝর্নায় ছিপ পেতে বসে থাকে ঝারি। উন্নত সুগঠিত বক্ষদেশের স্পন্দনে সে অনুভব করে খরার আকাশেও বিন্দু বিন্দু মেঘের সঞ্চার ঘটেছে, সময়ে বৃষ্টি নামবে, ভিজে যাবে কঠিন মাটি, একটি অপাপবিদ্ধ অকুর মাথা তুলে দাঁড়াবে তার নাভিজুড়ে।
ঝারি বুঝতে পারল তার সাধারণ দেহসৌষ্ঠব আজ অসাধারণ হয়ে উঠছে কিসের যাদু ছোঁয়ায়, তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে তার এতদিনের শরীর সাধনা। আগুন কি ঘিয়ের দিকে ছুটে যায় নাকি ঘি-ই আগুনকে জড়িয়ে ধরে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঝারি আরও কয়েক জন্ম নারী হয়ে জন্মাতে চায়।
তার অনুভূতির কথা বিছানায় টের পেয়ে যায় ভিকনাথ। প্রমত্ত বাসনায় অস্থির ঝারিকে সে পাগলের মতো লেহন করতে থাকে, আঁধারে তার হাত থেমে যায় ঝারির নাভির কাছে। ঝারি খিলখিলিয়ে ফুলভর্তি গাছের ডালের মতো হেসে ওঠে, তুমারে এট্টা খপর দিব, তবে এখুন নয়, আরও কিছুদিন পরে, খবরটা শুনে তুমি নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যাবে বলে দিলাম।
এ রহস্য ধাঁধার উত্তর জানে না ভিকনাথ, সে অন্ধকার খায়, অন্ধকারে হাতড়ায়। তারপর ঝারির শরীরে নিজের শরীর নোঙর করে বলে, আমার মন বলছে তুমার মরা গাঙে আবার বান আসবে। আমার পুড়া সার আবার নতুন করে শ্বাস লিয়ে বাঁচবে।
পরের দিন সকালে ঝারি তাকে টানকে টানতে নিয়ে যায় শীতলাতলায়। তারপর দণ্ডবত করে বলে, মনে মনে যা চাওয়ার চেয়ে নাও। আজ যা চাইবা সব পাবা। শীতলাবুড়ি আজকের দিনে কাউকে খালি হাতে ফেরায় না।
ভিকনাথ বুঝেই ঘোরের মাথায় হাতজোড় করে দাঁড়াল। বিপদ কেটে গিয়ে সুখের রোদ উঠছে। মুহূর্তে পাল্টে যাচ্ছে রোদ্দুরের রঙ। রোদ্দুরের রঙ বদল হলে এ শরীরের রঙ বদল হতে কতক্ষণ।
ঝারি হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। তার প্রায় উন্মুক্ত দেহশোভা প্রকৃতি মুগ্ধ হয়ে দেখল। তৃপ্তি ওদের সারা শরীরে চুঁইয়ে নামছে। এমন সংবাদ গায়ের সবাইকে বিতরণ করা প্রয়োজন। বাতাস মেতে উঠল সেই আনন্দযজ্ঞের একজন যথার্থ সাক্ষী হয়ে।
লুলারাম খবর পাঠিয়েছিল রাতের বেলায় ঝারিকে কদমতলায় আসার জন্য। আসব না আসব না করেও দ্বিধা সরিয়ে চলে এসেছে ঝারি। বুড়িগাঙের সুস্থির জলের দিকে তাকিয়ে তার নিজেকে বড়ো চঞ্চলা মনে হল। চঞ্চল মন, পাপের বন। অনেকদিন পরে ঝারির মনে হল–সে ভুল করছে। এ পথে তার আর না হাঁটাই উচিত। ঢিলি বউদি অভিমান নিয়ে চলে গিয়েছে। ভিকনাথও অভিশাপ দিয়ে চলে যাক সে চায় না। আত্মশুদ্ধির অনেকপথ এখনও তার জন্য খোলা আছে।
লুলারাম নেশায় টলতে টলতে অন্ধকার চিরে এগিয়ে এল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল ওর। ঝারির হাত ধরে জোরে চাপ দিয়ে বলল, আমি মরে যাব, আমি মরে যাব। তুমারে না পেলে আমার জেবন খড়ের চেয়েও শুকনা হয়ে যাবে। ঝারি, আমি তুমার পায়ে ধরি। চলো ইখান থিকে আমরা পালিয়ে যাই। ইখানে থাকলে বেচারা ভিকনাথ অঘোরে আমার হাতে মারা পড়বে। ঝারির শরীর কেঁপে কেঁপে উঠল। স্তনাভারে ন্যুজ হয়ে বলল, এ গাঁ ছেড়ে আমার আর কুথাও যাওয়া সম্ভব নয়। বুড়িগাঙ কী কুথাও গিয়েছে যে আমিও যাবো?
খুব অবাক হল লুলারাম, তুমার জন্যি ঢিলিকে আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম পাগল বানিয়ে। বউটা আমার জন্যি মরল। তার মরণের জন্য তুমিও দায়ী।
–আমি কেনে দায়ী হতে যাবো। ঝারির চোখ থেকে রাগে তারা খসে পড়ল, সে তুমার পাপে মরেছে। আমি নিজে ভিখারী হয়ে তুমাকে রাজা সাজিয়েচি। রাজার ধর্ম তুমি রাখো নি। মানুষের ধর্মও তুমি রাখোনি। তুমি পাপী। তুমার ছায়ায় আমার এখন দাঁড়ানো উচিত নয়।
-মাগী, তুর এত বড়ো কথা? অন্ধকারে পশুর মতো হাঁপায় লুলারাম।
ঝারি তাকে দুহাত দিয়ে ধাক্কা মেরে গড়িয়ে দেয় বুড়িগাঙের পায়ের নীচে। অন্ধকারে সেগুন কাঠের খুঁটির মতো গড়িয়ে যেতে থাকে লুলারাম। তবু তার মুখে কোনো চিৎকার নেই। লোকলজ্জার ভয়টা তাকে বোবা করে দিয়েছে। বোবারা যদি ভয় পায় সেই ভয় মনের গহীনে শেকড় চালিয়ে দেয় আমৃত্যু। নিকষ আঁধারে লুলারাম খুঁজতে থাকে মৃত্যুর আদি রঙ।
০৭. চোখের জলের মূল্য
৩১.
এক ফোঁটা চোখের জলের মূল্য বুঝতে পারে না অবনী, মন কেমন করা চোখে সে তাকিয়ে থাকে দুরের দিকে যেন সে কিছু দেখছে না, তাকে দিয়ে জোর করে কেউ কিছু দেখিয়ে নিচ্ছে। ইচ্ছে না থাকলেও অনেককেই অনেক কিছু দেখতে হয়, চিনতে হয় পৃথিবীর ধুলো মাটি, আলো-আঁধার, ঘাসফুল অথবা বিছুটিলতার জ্বলন। জ্বলার বুঝি শেষ নেই! জ্বলতে জ্বলতে ওড়ে অঙ্গার, ছাই ওড়া দুপুরের মতো মন একবার হাহাকার করে ওঠে, হয়ত বা হাট্রি-ট্রি পাখির মতো গলা ফাটায়, ফিরে আয় রে, যাস নে, বাছা। এ ঘর ছেড়ে কোথায় যাবি? ফেরার জন্য পথে পা বাড়ায়নি শুভ। একথা অবনী ভালো মতন জানে। চৌদ্দ বছরে পা দেওয়া ছেলেটা এই টুটাফাটা হাড়জিরজিরে সংসারটাকে মনে করে বুড়ো ঘোড়া, যে দৌড়োতে পারে না, আর দৌড়ালেও কিছুটা গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে, লাল ঝরায় মুখ দিয়ে, ড্যামা ড্যামা দু-চোখে ফুটিয়ে তোলে খরায় শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের দুঃখ-দীনতা। অবনী তবু আনমনে বলে, যে দিনটা যায়, সে দিনটাই ভালো। দিনকে ভালো না বেসে উপায় কি। সে এক অক্ষম মানুষ। তার আর কিছু করার নেই। দু-মুখো সাপের মতো মনটা শুধু মোড়া মারে, ধড়ফড় করে। একটা ভয় এসে খামচে ধরে বুক। শুকিয়ে আসে গলা। বারবার সেঁক গিলেও স্বস্তি মেলে না। ক’দিন ধরে অবনীর যে কী হয়েছে তা সে বুঝে উঠতে পারে না। সব কিছু হচ্ছে, তবু না হওয়ার একটা বোধ বা অনুভূতি কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। মন বসছে না কাজে-কর্মে। ঝাট দিতে গিয়ে ময়লা ফেলে ভুল করে চলে যাচ্ছিল, ডলি দিদিমণি রুক্ষ স্বরে বললেন, অবনী কাজটা তোমার ঠিক হচ্ছে না। কাজ যখন করবে মন দিয়ে করবে। কাজে ফাঁকি দিলে তুমি আমার সঙ্গে ডিউটি নিও না।
