হরনাথ তার জমানো টাকাগুলো বিশুর হাতে তুলে দিয়ে বলল, একদিন এই টাকা জন্য গাঁ ছেড়ে ভিন দেশে গিয়েচি। এত করেও মেয়েকে, বউকে বাঁচাতে পারলাম না। আমার এই টাকা যদি টগরীর কিছু কাজে লাগে তাহলে আমার চাইতে আর কেউ বেশি খুশি হবে না।
কথাগুলোয় এত দরদ ছিল বিশু আর চোখের জল আটকে রাখতে পারল না, নিজেকে সামলে সে বলল, আগের জন্মে তুমি আমার আপন দাদা ছিলে গো। নিজের দাদা না হলে এভাবে ভাইয়ের বিপদে কেউ এগিয়ে আসে!
হরনাথ বলল, ওসব কথা বলে আমাকে আর লজ্জা দিও না। আমি শ্মশান-ডোম। আমার চিন্তা আর কত ভালো হবে বলল। শ্মশানের ধোঁয়ার চেয়েও কুচুটে আমার মন। তবে কি জানো, মা গঙ্গাবুড়ির দয়ায় আমাদের টগরী ভালো হয়ে যাবে। আর দেরি না করে কালই তুমি ওকে কৃষ্ণনগরে নিয়ে যাও।
শহরের হাসপাতালটা মস্ত বড়ো। দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বড়ো জায়গায় বড়ো ব্যবস্থা। মমতা বলল, টাকা খরচ হল তো কি আছে? হাতি যেমন খায় তেমন নাদে।
রিপোর্ট দেখে বড়ো ডাক্তার খুশি হয়ে বললেন, ভয়ের কিছু নেই। অপারেশনের দরকার হবে না। ওষুধেই পেটের ব্যথা সেরে যাবে।
হাসপাতালের গেট থেকে বেরিয়ে বড়ো হালকাবোধ হচ্ছিল বিশুর। এতদিনের পাথরচাপা দশাটার যেন মুক্তি ঘটল। মমতা খুশি হয়ে বলল, ডাক্তারবাবু বলেচে-তিন দিন পরে টগরীকে ছেড়ে দেবে। তুমি ঘরে ফিরে যাও। আমি তিন দিন তিন রাত্রি হাসপাতালে কাটিয়ে দেব।
-তা কি করে হয়? ঘরে আমার মন টিকবে? যা হয় হোক-আমি এখানেই থাকব। বিশুর কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল জেদ।
মমতা তাকে চাঙ্গা করার জন্য বলল, চলো, আজ মাটির ভাঁড়ে চা খাবো। রোজ তো ঘরে চা খাই, আজ দোকানের চা-খেয়ে দেখি কেমুন এর সুয়াদ। মনে মনে খুশি হল বিশু। মমতার এত খুশি খুশি ভাব এর আগে তার নজরে পড়েনি। মানুষ কত ছোট ছোট ব্যাপারে আনন্দ পায়, আর সেই আনন্দের ভাগ সে সবাইকে দিতে পারে। এ যেন অনেকটা ফুলের গন্ধ ছড়ানোর মতো।
চা-খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা চলে গেল স্টেশনের কাছে। রেলিঙ ঘেরা জায়গাটায় ঝকমক করছে আলো। ওরা কেউ এর আগে ট্রেন দেখেনি। ট্রেনের গল্প শুনেছে দুলুর মুখে। সেই রোমাঞ্চকর গল্প গেঁথে আছে মগজে।
শেয়ালদা থেকে লালগোলা ট্রেন এসে থেমেছে কৃষ্ণনগর স্টেশনে। মাইকে সে কথাই বারবার বলছে ঘোষক।
মমতা সেই লাল চুবানো গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল বিস্ফারিত চোখে। বিশুরও অবস্থা তথৈবচঃ। স্টিম ইঞ্জিনের হুসহাস শব্দ রাগী সাপের নিঃশ্বাস হয়ে আছড়ে পড়ছে বাতাসে।
মমতার মন কেমন করে উঠল, ওগো শুনচো, যাওয়ার সময় দেবগ্রাম অব্দি টেরেনে গেলে হয় না?
বিশু ঘাড় নাড়তেই মমতা উৎসাহভরে বলল, মেয়েটা জীবনে কুনোদিন টেরেন দেখিনি। বে-থা হয়ে গেলে কুথায় গিয়ে পড়বে কে জানে! দু-বেলা খেতে পাবে কি না তাও সন্দেহ।
-তাহলে আমরা যাওয়ার সময টেরেনেই যাব। নাটকীয় গলা করে হেসে উঠল বিশু। মমতা কোন ফাঁকে তার হাতটা ছুঁয়ে দিয়েছে, খুব মজা হবে তাই না? দুলু বলেছিল-টেরেন গান গায় সব সময়।
মনোযোগ দিয়ে শুনল বিশু, টেরেন যে গান গায় এ আমি প্রথম শুনলাম।
–তুমি বুঝি জানতে না? মমতার শরীর ভার বুক সমেত ঝুঁকে এল, টেরেন যে গানটা গায়–সে গানটা আমার জানা। যাচ্ছি যাবো, যাচ্ছি যাবো। কাঁচা তেঁতুল, পাকা তেঁতুল। কু ঝিক ঝিক করমচা। ভয়ে ওড়ে কাদা খোচা। কু ঝিক ঝিক করমচা।
মমতার গান শুনে অনেকদিন পরে প্রাণ খুলে হেসে উঠল বিশু। মেঘ সরে গেল তার আকাশ থেকে।
.
খরার আকাশ যে এমন বৃষ্টির খবর বয়ে আনে কে জানত।
ঝারি শরীরে জাল বিছিয়ে ধরতে চাইছিল সেই সুখের মাছটাকে। মাছটা বারবার ফসকে যায় তার হাত থেকে। একেবারে পালিয়ে না গিয়ে কিছু দূরে গিয়ে সাঁতার কাটে। ঝারি টের পায়, স্পষ্ট টের পায়, তার শরীর জুড়ে সাঁতার দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে সেই দুষ্ট মাছটা। এটা কিভাবে সম্ভব-ঝারি বুঝতে পারে না কিছুতে। নিজের শরীরটাকে তার মনে হয় নিজের নয়। আশ্বিনের তুলো মেঘের মতো এই শরীর এখন হালকা তবু তার নজরকাড়া রূপভঙ্গি এক ফোঁটাও কমেনি।
জানগুরু যাওয়ার সময় একলা পেয়ে বলেছিল, তোরে আমি যে সুখ দিয়ে গেলাম সেই সুখ আমার বউও পায়নি। তবে একথাও ঠিক তুই আমারে যে সুখ দিলি আমার বউ আমাকে একদিনের জন্যি দিতে পারেনি। তোর কোল ভরবে, তুই কোলভরা হবি–আমার আশীর্বাদ রইল।
জানগুরু চলে যাওয়ার পর মনটা উদাস হয়ে গিয়েছিল ঝারির। লুলারাম বা ভিকনাথ যা এত বছরে পারেনি জানগুরু সেই জন্মদাগ রেখে গেল অনায়াসে। বদ্ধঘরে ঝারি টের পেয়েছিল তার শরীরে ভূমিকম্প হচ্ছে, মাটি ফাটিয়ে উঠে আসছে অমৃত, সৃষ্টিময় লাভা উদগীরণে কেঁপে যাচ্ছে সর্বসত্তা। পুরুষ হারে না, নারীও হারে না, এমন দ্বৈরথ এ ভূমিতে খুবই কমই সংঘটিত হয়।
যে ঘৃণা জানগুরুর প্রতি ঝারি জমিয়ে রেখেছিল তা অমৃতমন্থনের অন্তিম মুহূর্তে উবে যায়। ঝারির ক্ষুদ্র জীবন কানায় কানায় ভরে ওঠে, রাতের পদ্মফুলের চেয়েও কোমল হয়ে ওঠে তার তন্বী শরীর। মাটির ঘরে ছড়িয়ে দেয় অপ্রতিরোধ্য সুগন্ধ। তার নির্মেদ রমণীয় শরীর বক্ষদেশের আবরণ ভেদ করে শেষ বর্ষার ছাতুর মতো পুরুষের সুউন্নত বক্ষে লেপটে যায় অনায়াসে। শরীরের কমনীয় কুসুম পাপড়ি মেলে দেয় অজান্তে, এক চৌম্বকীয় ধর্মে সে আকর্ষণ করে পুরুষের আদিম রিপুর তাড়নায় মত্ত হয়ে ওঠা আগুন নদী। দীর্ঘ সাঁতারেও ক্লান্তবোধ করে না জানগুরু। মাটির গভীর থেকে তুলে আনে কামনার জল। ঝারির মুখের কাছে সে মুখ ঘষতে-ঘষতে বলে,এবার তুই মা হবি, জননী হবি। আমি তোকে দেগে দিলাম। তুই তোর নগ্ন স্তনের দিকে তাকলে আমার শরীলের গন্ধ পাবি। আজ থেকে তুই আমার বকুলগাছ।
