মমতা বলল, লোকের শোক বুকে নিয়ে বয়ে বেড়াতে-বেড়াতে তুমি যে একদিন পাথর হয়ে যাবে। এখনও সময় আছে গাঁয়ে ফিরে আসো। আবার ভাঙাঘর নতুন করে জোড়া লাগাও।
হরনাথ মলিন হেসে জবাব দেয়, তা আর সম্ভব নয়। যে ঢেউ চলে যায়, সেই ঢেউ কি ফেরানো যায়?
টগরী শুয়ে শুয়ে হরনাথকে দেখছিল, যত দেখে তত আজব মনে হয় মানুষটাকে। শিউলি বেঁচে থাকতে এই মানুষটা তাদের মেলায় নিয়ে যেত হাত ধরে। পাঁপড়, শুকনো মিষ্টি কিনে দিত খুশি হয়ে। বলত, তোরা খা। আরও লাগলে আরও দেব। বেলুন নিবি, মা?
-না গো, বেলুন নিবোনি। বেলুন নিলে ফেটে যায়। টগরী ঘাড় নেড়ে বলত, বেলুন ফেটে গেলে আমার খুব মন খারাপ করে। বেলুন ফেটে গেলে বেলুনের জান চলে যায়। তখন কিছু আর ভালো লাগে না।
কথায় কথায় হরনাথ জেনে যায় টগরীর অসুখের কথা। সব শুনে হরনাথের মন খারাপ করলেও সে সাহস দিয়ে বলে, বোগজ্বালা কার নেই? ওসব ঠিক হয়ে যাবে গো। গোরা সাধু ইখানে থাকলে তার হাতে-পায়ে ধরে আমি তুমাদের কাছে ঠিক নিয়ে আসতাম। সে তো খপর না দিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল। এখন মা গঙ্গাই জানে সে কুথায় আছে। তবে এট্টা কথা বলি গো, ওই মানুষটার জন্যি আমার বুকটা প্রায় দিন হাহাকার করে। খুব মনে পড়ে ওর কথা।
গোরা সাধুর কথা মমতার কানে গিয়েছে, কিন্তু সময় করে তাকে দর্শন করার সৌভাগ্য হয় নি তার। ওই নির্লোভ মানুষটার কথাতেই অনেক মানুষ আরোগ্যের পথ পেয়ে যেত। কী ভাবে পেত, কেমন করে পেত-এসব তথ্য এখনও অজানা।
হরনাথ টগরীর মুখের দিকে তাকিয়ে আফসোস করে বলল, সবই ভাগ্য! নাহলে তোরই বা কেন এমন হবে। তবে ভাবিস নে মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।
টগরী কথা না বলে বোবার মতো তাকাল। হরনাথ শুধালো, বিশুকে দেখছি না তো, সে কথায় পালালো?
পালাবে কেন দাদা, সে তার ধান্দায় গিয়েছে। পেট তো কথা শোনে না, তার জন্য যোগাড় তো চাই। ঘরে বসে থাকলে সে জোগাড় হবে কি করে?
তা ঠিক। তবে হরনাথ থামল, টগরীর চিকিৎসার জন্য ভেবো না, টাকা যা লাগে আমি দেব। দরকার পড়লে আমার এই ভিটেবাড়ি সব বেচে দেব। মেয়ে আগে না ভিটেবাড়ি আগে বল তো?
মমতার হাঁ হয়ে যাওয়া দৃষ্টি, দাদা, তুমি আমার মেয়েটারে এত ভালোবাস?
-ও শুধু তোমার বা বিশুর মেয়ে নয়, ও সবার মেয়ে। ও আমার শিউলির জোড়া। ওকে দেখলে আমি শিউলির দুঃখ ভুলে যাই। হরনাথ স্মৃতির পুকুরে ডুব দিল। মেয়েটা আমার ভাগ্যে সইলো না। বড়ো চোট দিয়ে চলে গেল। ওর কথা আমি এখনও ভুলিনি। ও আমার মনটাকে বড়ো দুবলা করে দিয়ে গেল।
হরনাথ চলে যাওয়ার পর মমতা সংসারের কাজে মন দিতে পারে না। টগরীকে নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। কালীগঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তার মুখের উপর বলে দিল, আর দেরি না করে ওকে একবার কৃষ্ণনগরে নিয়ে যাও। গ্রামের হাসপাতালে এর চেয়ে বেশি কিছু করা যাবে না।
বিশু ঘাড় কাত করে শুনল। মমতা বলল, চিন্তা করে আর কী হবে। ডাক্তারবাবু যখন বলচে তখন একবার নিয়ে যাওয়াই দরকার। বাবারও বাবা আচে।
বিশু শুন্য চোখে তাকাল, নিয়ে যাওয়ার কথা আমিও ভাবছি কিন্তু হাত একেবারে ফাঁকা। বাসভাড়া নেই। তাছাড়া আমি একা গেলে চলবে না। সঙ্গে আর কাউকে নিতে হবে। কৃষ্ণনগর মস্ত শহর। সেখানকার আমি কিছু চিনি না।
বাঁধ ধরে ফেরার সময় মমতার মুখে কোনো কথা নেই। ভূত-প্রেতের গল্প এখন ফিকে হয়ে গেছে পাড়ায়। যারা জ্বরে পড়েছিল তারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে হাওয়ায়। সবার সব ঠিক হয়ে গেল শুধু টগরীর শরীরটাই যা সারল না।
বিড়ি ধরিয়ে বিশু বলল, টাকার জন্যি কার কাছে যাওয়া যায় বল তো?
অনেক ভেবে মমতা লুলারামের নামটা বলল। কিন্তু খুশি হল না বিশু। লুলারামকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। ওর মতন ধান্দাবাজ মানুষ এ পাড়ায় আর দুটি নেই। ও একটা শয়তানের গাছ। মন্দবুদ্ধিতে ওর সঙ্গে পেরে উঠবে কে? অমন মানুষের কাছে টাকা ধার নেওয়ার অর্থ বিপদকে ঘরে এনে তোলা। বিশু তাই নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, লুলারামের কাছে টাকা ধার আমি নিবোনি। ও মানুষ ভালো নয়, মতের মিল না হলে ও আমাকে বিপদে ফেলে দেবে। তখন আমও যাবে, ছালাও যাবে।
-তাহলে হরদার কাছে চলে যাও।
মমতার কথা শুনে খুব অবাক হল বিশু, হরদার কাছে যাবো-তার মানে?
-হরদা নিজে ঘর বয়ে এসে বলে গেল টগরীর চিকিৎসা খরচা সে দেবে। দায়ে অদায়ে তাকে যেন খবর দেওয়া হয়।
তবু ইতস্তত ভাব কিছুতেই ঘুচল না বিশুর। সে শ্বাস নিয়ে কিছু সময় অন্যমনস্ক হয়ে ভাবল। তারপর নিজের মনেই বলল, তুমি যখন বলচো তখন আমি যাব। লুলারামের চেয়ে হরদার মন আরও অনেক বেশি সাদা। ভালো মানুষের কাছে হাত পাতলে পাপ হয় না।
বিপদের সময় পাপ-পুণ্য বিচার করতে যেও না। মমতার অসহ্য লাগছিল বিশুর যুক্তিগুলো, আমরা নিজেরা পাপ না করলেই হল। পরের হাঁড়ির খোঁজ নিয়ে নিজেদের হাঁড়ির তলা ফাঁসানো উচিত হবে না। মমতা বিশুর সামনে থেকে উঠে গিয়ে টগরীর বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল।
টগরী তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দুম করে বলে বসল, মা, তুমরা আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি ঠিক ভালো হয়ে যাব। আমার মন বলচে আমার খারাপ কিছু হয়নি।
–তাই যেন হয়। ঠোঁট থরথরিয়ে উঠল মমতার।
