ঝারির চোখে ধোঁয়া ঢুকে বের করে আনছে জল। সন্মোহনী কণ্ঠে গৌরচন্দ্ৰ হুংকার ছাড়ে, আর লয় রে, আর লয়, তুর ইবার চোখ মুদার পালা। চোখ বুজ, চোখ বুজ। চোখ বুজে তালাইয়ের উপর শুয়ে পড়। তুর সব অঙ্গে ভূত লকলকায়, যার জন্যি তুর ছানাপুনা হচ্চেনি, হলে সব মরে যাচ্ছে…। আমি ভূত খেদাব, তুই চটপট শুয়ে পড়।
লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ঝারি ছেঁড়া তালাইয়ে বিছিয়ে দেয় তার শরীর। তার মুখের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে জানগুরু। একটানা মন্ত্র আউড়ে সে তীব্র ফুঃ দেয় ঝারির চোখের উপর, চোখ থিকে যা, চোখ থিকে যা। ক্রমাগত চলতে থাকে ফু-য়ের মহড়া। ফুঁ দিতে দিতে গৌরচন্দ্র নেমে আসে ঝারির খোলা বুকে। ঝারি দু-হাত বুকের উপর চেপে লজ্জাকে ডিঙানোর চেষ্টা করে। গৌরচন্দ্র জানগুরু তাকে সেই সুযোগ দেয় না। ঝারির ভড়ন্ত গোলাপী বুকে সে জানোয়ারের মতন লেহন করতে থাকে জিহ্বা। ঝারি দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যেতে থাকে। কামাতুর হেসে গৌরচন্দ্র ফিসফিস করে বলে, এবার পেলুবে, এবার পেলুবে। তোরে ছেড়ে গেলে সে, আবার গর্ভ ভরবে তুর। শরীরটা নরম কর, আরো নরম কর। যত নরম হবে শরীল, তত ভুসভুসে হবে দেহ। বুরো মাটিতে চাষ ভালো হয়। বীজ খেলে রে…তুই আবার কানায় কানায় ভরে উঠবি। কথা ফুরোল না তার আগে জ্বলন্ত বেলকাঠের খণ্ডটা তুলে নিয়ে ঝারির নাভিদেশে একবার ছুঁইয়ে চকিতে তুলে নেয় জানগুরু। বিস্ফারিত নয়নে সে দেখতে থাকে ঝারির গোপন-সৌন্দর্য। কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ঝারি বাঁচার জন্য ঠোঁট কামড়ে ধরেছে নিজের, গুরুজী, ইবার আমাকে ছেড়ে দাও গো, আর পারি নে।
-হেরে যাবি, তুকে পারতেই হবে। এ ক্ষণ আর আসবেনি। পা-টারে ঢিলা ছাড়, আর এট্টু আর এট্টু।
ঝারির মাথার ভেতর পাহাড়ী মৌমাছির মতো বনবনিয়ে ওড়ে অপবাদ। অপবাদ তার জন্মগত। এ শরীর তার নিজের হয়েও নিজের নয়। হায় ভগবান। কেন এত রূপ দিলে গো দেহে। যদিও বা দিলে ধরে রাখার মন্ত্র দিলে না কেন?
ঝারি পা আলগা করে শুয়ে আছে আঁধারে, জানগুরু পা দিয়ে উল্টে দেয় ডিবরিটা। কেরোসিনে ভিজে যেতে থাকে মেঝে। চেনা গন্ধ। এ গন্ধ কি শুধু কেরোসিনের?
ঝারি টের পায় শুধু মেঝে নয়, তার শরীরও ভিজে গিয়েছে পুরুষবর্ষণে। মুষলধারার বৃষ্টিপাতে প্লাবিত হতে থাকে সে। শুধু অমৃত নয়, গরলও উঠে আসে মন্থনে। ক্লান্ত শরীরে পেঁচিয়ে ওঠে ঘৃণার সাপ। তবু চুপচাপ হাত-পা এলিয়ে মাটির মতো শুয়ে থাকে সে। মাটিও মা হতে চায়।
গৌরচন্দ্র ধুতি সামলে বলে, মুখের ঘাম মুছে লে। তোর শরীরের ভূত আমি আমার নিজের শরীরে পুরে নিয়েছি। আজ থিকে তুরে আর এট্টা ভূত তাড়াবে। সে তুরে মা-মা বলে ডাকবে। কেউ জানবে না, শুধু তুই জানবি–সে ভূতটার বাপ গৌরচন্দ্র জানগুরু। একথা দুকান হলে তোরে আবার ভূতে ধরবে।
ঘরের খিলকাঠ আলগা করে দিয়ে ঝারিকে চুলের মুঠি ধরে বাইরে এনে হুমড়ি দিয়ে ফেলে দিল গৌরচন্দ্র জানগুরু, গর্জন করে বলল, আর ভয় নেই, ভূত পেলিয়েছে। পেলবে না মানে? বনের বাঘ জব্দ হয়, আর এতো এগার হাত কাপড়ে নেংটো হওয়া মেয়েমানুষ!
.
৩০.
বিশুর মন ভালো না থাকলে ঘুরতে ঘুরতে নদীর ধারে চলে যায় সে। গত রাতেও টগরী পেট আঁকড়ে কাদল। কাঁদতে-কাঁদতে হোক লেগে যাচ্ছিল মেয়েটার। মমতা মেয়ের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে কপাল চাপড়ে বলল, কার যে কু-নজর লাগলো বুঝতে পারছি না গো। মেয়েটার এত কষ্ট আমার চোখে সয় না। ওঃ ভগবান, তুমি ওর কষ্ট আমারে দাও।
টগরী দাঁতে দাঁত চিপে ব্যথা হজম করার চেষ্টায় ছিল। এ কাজে সামান্য সফল হতে সে বলল, মাগো, আজ বড়ো শিউলির কথা মনে পড়ছে।
আঁতকে উঠল মমতা, নিমেষে চুপসে গিয়ে বলল, ওর কতা মনে আনিসনেমা। ওর কথা ভাবলে আমি এখনও শিউরে উঠি। এত কষ্ট নিয়ে মেয়েটা মরল যা ভাবা যায় না।
ছাতিমগাছে ফুল ফুটেছে থোকা থোকা, ফুলগুলোর এমন শোভা যেন সাদা ফুলগুলো হালকা সবুজ জলে চুবানো। ছাতিমফুলের গন্ধটা হাওয়া বইলে বাড়ে। অনেকদূর পর্যন্ত তার যাতায়াত। অন্যসময় হলে এই সামান্য বিষয়টা নজর এড়িয়ে যেত মমতার। আজ যেন সে নিজেকে এর থেকে মুক্ত করতে পারে না। পথের পাশের ঝাঁকড়া মাথার ছাতিমগাছটাকে মনে হয় যেন তার ঘরের মেয়ে টগরী। এতদিন খেলত ঘুরত হাসত ফলে তার দিকে কেউ তেমন ভাবে ফিরে তাকায়নি। আজ বিছানা নেবার পর থেকে টগরীর গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে সবার কাছে।
বিকেলে হরনাথ এসেছিল তার ভিটেবাড়ি দেখার জন্য। গাঁয়ে ঢোকার আগে প্রতিবারই সে চুল্লরসে পেট ভরিয়ে আসে। ফলে কথা বলার সময় মুখ দিয়ে ভকভকিয়ে দুর্গন্ধ বেরয়, সামনে কেউ তিতে পারে না। মমতা দুর থেকেই কথা বলছিল, এট্টা কথা বলব দাদা, যদি কিছু মনে না করো।
মমতার লতানে কথায় হরনাথের মনে কোনো দাগ কাটে না, হ্যাঁ হ্যাঁ যা বলো।
কথা শোনার জন্যি তো গাঁয়ে আসি গো।
সাহস পেয়ে মমতা বলল, শ্মশানে কি মানুষ বাস করতে পারে গো। দু-চার দিন থাকলে এক কথা, মাসের পর মাস কি সিখানে থাকা যায়? তাই বলছিলাম ওসব ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে ঘরে চলে আসো। কাঁথ দেওয়াল তো ধসে ধসে পড়চে, আবার নতুন করে দেওয়াল গাঁথো।
-নদীর পাড় ধসে গেলে আবার কি পাড় জোড়া যায় গো? হরনাথের ব্যথাতুর চোখ।
