ঘর ছাড়তে সামান্য দেরি হলেও ওরা দ্রুত হেঁটে সে দেরিটাকে নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেয়। জানগুরুর ঘরের সামনে এসে ঝারি ঢোঁক গিলে বলল, সাহস করে চলে এলাম বটে তবে এখুন বুকটা আমার থিরথির করে কাঁপছে। মনে হচ্চে কাজটা ঠিক হল না।
ভিকনাথ ঝারির মুখের দিকে ভরসার চোখে তাকাল, এসে যখন পড়েছি তখন অত ভেবে আর কি হবে? চলো যাওয়া যাক।
দাওয়ার উপর শিব হয়ে বসেছিল জানগুরু। ঝারি আর ভিকনাথ বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে লুটিয়ে পড়ল তার পায়ের উপর। ঝারি তার মোহনী সুরে বলল, গুরুজী, আমরা বহু দূর থেকে বহু আশা করে তুমার কাছে এয়েচি। তুমি আমাদের মেরেচো, ইবার তুমি আমাদের বাঁচাও।
–আমি তুদের মেরেচি। কে তোরা? জানগুরু গৌরচন্দ্র ঊর্ধ্বমুখী তাকাল।
ভিকনাথ গাঁয়ের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে, হাতজোড় করে সে বলল, বাবা গো, তুমার দিব্যি দিয়ে বলচি, আমাদের ঘরে কুনো ভূত-প্রেত নেই। তুমার রায় তুমি ফিরিয়ে নাও, আমাদের বাঁচাও।
-আমি বাঁচাবার কে? বাঁচাবে যে সে তো উপরে উঠে বসে আছে। সে ব্যাটা তো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অদ্ভুত মুখ করে হেসে উঠল জানগুরু।
ঝারি তার পা ছাড়েনি তখনো, জেদ ধরে বলল, না বাঁচালে আমি তুমার পায়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকব। আমি আমার এ জীবন তোমার এখানেই হারাব
-আরে না, না। বলেই জানগুরু গৌরচন্দ্র ঝারির ফুলেল উন্মুক্ত বাহু দুটো দু হাত দিয়ে চেপে ধরল, অমনি তার মুঠো দুটো ঝারির মাখন শরীরে ঢুকে গিয়ে শরীরে উষ্ণপ্রবাহ বইয়ে দিল। এই এত বয়সেও চার টুকরান মাছের মতো অস্থির হয়ে উঠল জানগুরুর শ্যাওলা ধরা মনটা। ঝারির মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে থ হয়ে গেল তার চোখের তারা। ধাওড়াপাড়ায় এমন যাত্রাদলের সখী-চেহারার মেয়ে থাকে? আহা, কতদিন নজরকাড়া সুন্দরীর মুখ দেখেনি সে। বউটা সাত তাড়াতাড়ি পটল তুলে তার যৌবনকে সাপের মাথার মতো থেতলে দিয়ে চলে গেল। কিন্তু সাপ মরল, বিষ রয়ে গেল মনের ভেতর। সেই বিষ দিনে দিনে কাল হল, কাল থেকে হল মহাকাল। কুলবেড়িয়ার বউটার ভূত খেদাতে গিয়ে বদ্ধ ঘরে সবে বউটাকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই ভূতে ধরা বউটাই তার মতিগতি বুঝে না চেঁচিয়ে কামড়ে দিল পুরুষাঙ্গে, খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলেছিল, যা ঢ্যামনার ছা, তোরে আমি ক্ষামি করে দিলাম। এবার থেকে যার গায়ে হাত দিবি এই ক্ষামি তোকে বারবার চেতন দেবে। নিজেকে না সামলালে মরবি তুই, মরবি। বলেই লাথ মেরে আছড়ে ফেলে দিয়েছিল বাটের উপর, ঘন ঘন শ্বাস ফেলে বাঘিনীর তেজে বলেছিল, যা পালা, দেরি হলে তোর পিঠের চামড়ায় গাঁয়ের মানুষ ঢাক বাজাবে। পড়িমড়ি করে দরজা খুলে জান বাঁচিয়েছিল জানগুরু গৌরচন্দ্র।
এমন ঘটনা তার জীবনে প্রথম নয়। ভূষণী বুড়িও তার যৌবনে শিকার হয়েছিল। ঝাঁড়ফুকের নাম করে গৌরচন্দ্র তার উপর চড়ে বসেছিল ষাঁড়ের মতো। চিকিৎসার অঙ্গ ভেবে মুখে কুলুপ এঁটে সব সয়ে নিয়েছিল ভূষণী। পরে শরীরের তাপ শরীর শুষে নিতেই সে টের পায় বাঁধ ভেঙে গেছে দুজনের। সে যাত্রায় ভুষণী রক্ষা পায় ভাগ্যের জোরে। সব বীজে যে ফসল হয় এমন নয়। ভুষণী দয়ালের চোখে সতীত্ব না হারালেও মনে মনে সে নিজেকে একটা নষ্ট মেয়েমানুষ ছাড়া আর কিছু ভাবত না। দয়াল যখন সরল মনে বলত, তুমি আমার ঘরের নক্ষী গো, তুমি আমার টুসু তুমি আমার ভাদু গো? তখন নাকের সকড়ি টেনে চোখের জলের ছায়ায় উদাস হয়ে যেত ভূষণী। দয়াল তার গায়ে গতরে ভালোবাসার হাত বুলিয়ে দিয়ে বলত, কেঁদো না গো, কেঁদো না, তুমি কাঁদলে আমার দেশ-দুনিয়া আধার হয়ে যায়।
ঝারিকে দু-হাতের ভরে মুখোমুখি দাঁড় করাল গৌরচন্দ্র, ওর চন্দ্রিমাভরা মুখের দিকে তাকিয়ে মরাগাঙে জোয়ার আসা গৌরচন্দ্র বলল, তুই ভাবিস নে, ঘর যা। আসচে অমাবস্যায় আমি তোর ঘর যাবো। যা করার গাঁয়ের দশ মাথাকে শুনিয়ে করতে হবে। এখান থেকে আমি রায় তুলে নিলে চলবেনি। মানুষ তা মানবেই বা কেনে?
ঝারি তার চোখের জল মুছে নিয়ে বলল, তাই যেন হয় গুরুজী। যে শেল আমার বুকে বিঁধে আচে, সেই যন্ত্রণা থেকে আমরা যেন সাত তাড়াতাড়ি রেহাই পাই। আমি জানি তুমি ছাড়া আমাকে কেউ এ যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে পারবে না।
বাঁচাবো রে, বাঁচাবো। ধৈর্য ধর। গৌরচন্দ্র জানগুরু ঝারির মাথায় ভরসার হাত বুলিয়ে দিল।
অমাবস্যার দিনে সভা বসল পাকুড়তলায়। জানগুরু গৌরচন্দ্র তার ঝোলা নেড়ে বলল, আমার কথা নড়চড় হবে নি। আজ আমি হলদিপোঁতায় এয়েচি ভূত নামাব বলে। সবার অনুমতি যদি থাকে তাহলে আমি ভূত খেদিয়ে রাতে রাতেই ঘাসুরিডাঙায় ফিরব।
সবাই হৈ-হৈ করে অনুমতি দেয় গৌরচন্দ্রকে। ভিকনাথ তার ঝোলা বয়ে নিয়ে যায় ঘর অবধি। আঁধার নেমে আসে চারধারে। ভয় এসে ভিকনাথকে ঝাঁকায়। ঝারির শরীরের ভূতটা নাকি ভয়ঙ্কর। অনেকক্ষণ ধরে ঝাড়ফুঁক করার দরকার। ঘরের ভেতর হোম- যজ্ঞ-পূজাপাঠ সব হবে।
গৌরচন্দ্র ঝারিকে ঠেলা দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দরজার খিল তুলে দেয়।
চাপা গলায় বলে, আমার দিকে তাকা। লাজ করবি নে।
ঝারি থরথর করে কাঁপছে। বেলকাঠের ধুয়োয় ভরে যাচ্ছে ঘর। মাটির ঘরটায় হাওয়া বাতাস খেলার একটাও খিড়কি নেই। কী ভাবে যেন একটা চামচিকি ঢুকে গিয়েছে ঘরের ভেতর, শুধু ফরফর করে উড়ছে, মাঝে মাঝে নেমে আসছে মেঝের কাছাকাছি।
