নতুন বউ পুরনো হল তবু ভিকনাথের মন সায় দিল না। ঝারি নিজেও আর গা করেনি মাঠে যাওয়ার। মাঠ-ঘাটের কাজ সবার দ্বারা হয় না। সবাই যা পারে ঝারি তা পারে না। অবশ্য ভিকনাথও চায় না ঝারি ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াক। মুখে দোক্তাগুণ্ডি নিয়ে এখানে-সেখানে পিক ফেলুক। কিংবা নেশায় টলমল হয়ে ঘর ফিরুক। ঝারির ওসব হ্যাপা নেই। সেদিক থেকে ভিকনাথ অনেক সুখী মানুষ। ঝারির মুখের দিকে তাকালে তার পিয়াস মিটে যায়, গাঙধারের ঝাউগাছগুলোর মতো হালকা মনে হয় নিজেকে।
চড়া রোদে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল না ঝারি। ঘরে ভাত চড়িয়ে এসেছে। চুলার শুকনো কাঠ পুড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে একসময়। এ সময় এক কলসি জলের বড়ো দরকার ছিল। মানুষটা খেটেখুটে এলে তাকে অন্তত এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল দিতে পারত সে।
পাড়ার বউগুলো তাকে সরকারি কলটা ছুঁতে দিল না। ঠোঁট উল্টে ভেংচি কেটে বলল, খবরদার এদিকপানে আর আসবা না, এলে পরে তুমার কলসি আমরা আধলা ইটে ভেঙে দেব। মনে রেখো-ধাওড়াসমাজ তুমাদের একঘরে করে দিয়েছে। তুমার সাথে মিশে আমরাও কি মরব নাকি?
ভূত-প্রেতের গল্পটা এখন সারা পাড়াময় চরে বেড়াচ্ছে। জন খাটতে গিয়ে এখন আর শান্তি পায় না ভিকনাথ। আগের মতন ঠাট্টা ইয়ার্কি হাসি মস্করা হয় না মাঠের কাজে। সবাই যেন শামুকের মতো খোলবন্দী করে ফেলেছে নিজেকে। ভিকনাথকে ভাবছে বুঝি বিচুটিগাছ, ছুঁলে যদি গা কুটকুটায়।
এড়িয়ে যাওয়াটা সবার আগে নজরে পড়ে মানুষের। সামান্য ঘাসও বোঝে এড়িয়ে যাওয়ার মর্মজ্বালা। মাঠে এখন জল নেই, তবু বক উড়ে বেড়ায় সাদা ডানা মেলে। বকের ডানার মতো মানুষের মন কেন সাদা হয় না?
নূপুরের জ্বর ভালো হয়ে গিয়েছে চারদিন আগে। মেয়েটা এখন শীতের পালংশাকের চেয়েও তরতাজা। চিন্তা শুধু টগরীকে নিয়ে। ভিকনাথ আর ঝারি রাতের আঁধারে গিয়েছিল মেয়েটাকে দেখতে। মমতা তাদের বসার কথা বললই না। ওর চোখে-মুখে কেমন রাগ-রাগ ভাব। যেন টগরীর অসুখের জন্য ঝারি আর ভিকনাথই দায়ী।
মনখারাপ করে রাতেরবেলায় ফিরে এসেছিল ওরা। ঘরে এসে ঝারি আর কান্নার বেগকে সামাল দিতে পারল না। ভিকনাথের বুকের উপর লুটিয়ে পড়ে সে অঝোরধারায় কাঁদল। গাঁয়ে অপবাদ নিয়ে মাথা উঁচিয়ে বেঁচে থাকা বড়ো দায়। ভিকনাথ ক্লান্ত গলায় বলল, তুমার যদি ইখানে থাকতে মন না চায়, চলো আমরা ইখান থিকে পেলিয়ে যাই। ইখানে আমাদের আছে কি? না ঘর না জমি কিছু নেই। যেটুকু সম্পর্ক ছিল তাও অপবাদের ঘোলা জলে ভেসে গেল। একা একা কি কুনোমানুষ বাঁচতে পারে গো?
–কুথায় যাবে তুমি? ঝারি চোখ মুছে শুধিয়েছিল।
সঙ্গে সঙ্গে ভিকনাথ জবাব দিল, কেনে বসন্তপুর-ধাওড়া। ও জায়গাটা মন্দ লয়। বড়ো গঙ্গার বাতাস আসে। ওখানে কাজের কুনো অভাব হবেনি।
-ওখানে গিয়ে শান্তিতে থাকতে পারবা? ঝারির চোখে সন্দেহ।
ঢোক গিলে ভিকনাথ বলল, শুনেচি ওখানকার মানুষ ইখানকার মতন নয়। ওরা পরের মুখে ঝাল খায় না, নিজে ঝাল খেয়ে চেখে দেখে।
–ওখানে গেলে ভাবছ বদনাম সঙ্গে যাবে না? ঝারি ধারালো চোখে তাকাল, বদনাম কখনো পিছু হাঁটে না, পিছু-পিছু যায়। তুমি ভাবছ ওখানে গেলে শান্তি পাবে তাই না? সে গুড়ে বালি বুঝলে?
ঝারির কথায় দুঃখ থাকলেও এই কঠিন সত্যটাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই ভিকনাথের। মাটি কামড়ে পড়ে থাকার নামই তো বেঁচে থাকা। চলতে চলতে জীবনটা যে হঠাৎ এমন কঠিন হয়ে যাবে সে বুঝতে পারেনি। যখন বুঝতে পারল তখন হাতের বাইরে চলে গিয়েছে নিয়ন্ত্রণ। এরজন্য সে কাউকে দায়ী করে না, দায়ী করে তার পোকায় ধরা ভাগ্যকে।
জলঢালা ভাত খেতে বসে ঝারি বলল, একটা কাজ করলে হয় না।
ভিকনাথ উৎসাহিত হল, কী কাজ?
ঝারি বলল, চলো আমরা জানগুরুর কাছে যাই। ওখানে গিয়ে তার হাতে পায়ে ধরে মত বদল করাব।
–সে মানুষটা সিধা নয়। কুকুরের লেজের মতন তার মনটা বাঁকা। ভিকনাথের ঝড়ে নুয়ানো বিধ্বস্ত গলা।
ঝারি তবু ঘাবড়াল না, সে হোক। তবু আমাদের যাওয়া দরকার। মানুষটার মন ভিজলে আমাদের জীবনটাও ভিজে নরম হয়ে যাবে গো।
সারারাত নানান উৎকণ্ঠা আর চিন্তায় ঘুম হল না ঝারির। এই ঝড় যে কবে থামবে কে জানে। শীতের সকাল দেরিতে মুখ দেখায়। বুড়িগাঙের পাড়ে গাঙশালিকের গলার আওয়াজ ঘরে বসে শুনতে পায় ঝারি। পাখিগুলো সারাদিন ঝগড়া করে, না নিজেদের মধ্যে ভাব জমায় কিছুই বুঝতে পারে না ঝারি। ওরা জন্ম থেকে জোড়ায় জোড়ায় ঘোরে। ওদের ভালোবাসা জল মাটির চেয়েও সত্য।
সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে বাসি মুখে বিড়ি ধরাল ভিকনাথ। কুয়াশার চেয়েও গাঢ় ধোঁয়ার রাশি ঘর পেরিয়ে দাওয়ায় ঝুলে রইল অনেকক্ষণ। এ সময় হাওয়া সব সাহেবমাঠের দিকে চরতে গিয়েছে, রোদ্দুর তাই হলুদ শরীর নাচিয়ে কিকিৎ খেলছে জগৎখালি বাঁধের উপর। রোজ এ সময় অর্জুনগাছের গোড়ায় কামরাঙা ফলের মতো শির-জাগানো কেঠো-ফলগুলো ধুলোয় লুটিয়ে থাকে। অন্যদিন হলে ঝারি যেত ঝুড়ি নিয়ে সেই ফল কুড়োতে। অর্জুনের শুকনো ফলে ভালো আগুন হয়। মাঝে মাঝে ঝারির ঐ একলা গাছটার সঙ্গে নিজের শরীরটাকে মিলিয়ে দেখতে মন চায়। ওর গায়ের রঙের সাথে অর্জুনগাছের ত্বকের রঙও বুঝি মিলে যায়। এত ফর্সা গাছ এ তল্লাটে আর কটা আছে।
