চুনারাম বুঝতে পারছিল ভিকনাথের কথার সত্য। কিন্তু বুঝতে পারলেও তার যে কিছু করার নেই এটা সে হাবভাবে বুঝিয়ে দিল। এদিকে কেরোসিন ফুরিয়ে এসেছে হ্যারিকেনের, আর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই সব তেল পুড়ে গিয়ে দপদপ করবে আলো। ফিতে পোড়ার গন্ধে নাক কুচকাবে অনেকেই। তার আগেই আলো থাকতে থাকতে কথাটার ফায়শালা হয়ে যাওয়া ভালো। চুনারাম গলা চড়াল, তুমরা সব কি চাইচো গো?
ফিসফিস আলোচনা সেরে ভিড়ের মধ্যে থেকে দুলাল বলল, দোষ করলে সাজা তো পেতেই হবে। যারা দশের কথা ভাবে না, তাদের কথা আমরা কেনে ভাবব। ওদের একঘরে করে দেওয়া হোক।
সেই ভালো, সেই ভালো। সবাই একবাক্যে সায় দিল।
বিশু বলল, ওরা সরকারি কলে জল আনতে যেতে পারবে নি। পাড়ার কুনো কাজে ওদের ঢোকা বারণ।
ভিকনাথ কাটা গাছের মতো সিঁটিয়ে গিয়ে শুনছিল, খুব অসহ্য লাগতেই এবার সে আর্তনাদ করে উঠল, উটি করবেন নি গো, মরে যাবো। পাড়ায় তো আমরা ক’ ঘর মাত্তর। আমাদের ভিনো করে দিলে বউটারে নিয়ে আমি যাবো কুথায়?
–তোর বউয়ের কি যাওয়ার জায়গার অভাব? সোঁদর মুখের জন্য তো অনেক কপাট খোলা থাকে। পেছন থেকে কথাটা কে যেন ঢিল মারার মতো ছুঁড়ে দিল। ভিকনাথের কান্না পাচ্ছিল ভীষণ তবু সে কাঁদল না। দম ধরে থাকল অনেকক্ষণ।
চুনারামের মাজাটা কনকন করছিল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। সে হাত নেড়ে নেড়ে বলল, হারকেনের কেরোচিন ফুরিয়ে এল। ইবার আমাদের সভাও শেষ। তাহলে এই কথাই থাকল কাল ভোর হওয়ার পর থেকে ভিকনাথ একঘরে হয়ে যাবে। এ কথার যেন নড়চড় না হয়। নড়চড় হলে আরও কঠিন সাজা দেওয়া হবে। কথাটা যেন মনে থাকে।
তালাই গুটিয়ে সবাই যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন ওদের সামনে এসে মা দুর্গার মতো দাঁড়াল ঝারি, এ তুমরা কি করলে গো? এর চেয়ে আমাদের মেরে ফেললে ভালো হত। আমরা নির্দোষ। তুমাদের পায়ে ধরি গো, বুড়িগাঙের ঘাটটা আলাদা করে দিও না। মাঠ আর ঘাট আলাদা হলে মানুষের যে আর কিছু থাকে না।
একঘরে হওয়ার অভিশাপ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল ঝারি। পিঠে-পরবের দিনে হাঁটুর ফাঁকে মুখ গুঁজে বসে ছিল ভিকনাথ। ঝারি তাকে বলল, যাও না গাঁয়ের ভেতর থিকে ঘুরে আসো। গেল সালে তো কত পিঠে গামছায় করে বেঁধে আনলে এ বছর গেলে নেশ্চয়ই কেউ তুমারে ফেরাবে না।
ছোটকাল থেকে গাঁয়ে ঘুরে পিঠে খেত ভিকনাথ। সবাই মন খুশ করে পিঠে দিত। বলত-পেট ভরে খাও, লাগলে আরো দেব। পোড়া-পিঠের স্বাদ আলাদা। সেই পিঠে দশজনে মিলে না খেলে তার স্বাদ বাড়ে না। বোস বাড়ির বউটা হর সাল গুড়পিঠা আর সরুচাকুলি বানায় ভালো। সরাপিঠা আর ভাপাপিঠা মকর-পরবে সবার ঘরে হবেই হবে। সেদ্ধপিঠা আর পুরপিঠাও হবেই হবে। ও পিঠা না হলে মকরসংক্রান্তির আনন্দ যে ফিকে হয়ে যাবে।
ঝারি নিজেও পিঠে খেতে ভালোবাসে। তবু গাছ পুজোয় পিঠে না দিয়ে এলে তার শান্তি নেই। ভিকনাথের মাথা একেবারে পাগল করে দেবে, কই গো, নুয়াচাল আনলে না যে! মকর পরবের আর বেশি দেরি নাই। কাল নারকেল নুয়া চাল আর নলেন গুড় নিয়ে এসো। আর হ্যাঁ মনে করে কাঁচা দুধ এনো। তুমার বাহ্যি হয়েছিল, মানত করেচি ঠাকুরের কাছে। সে ধার এবার শোধ দিতে হবে।
গায়ে গা লাগিয়ে পরবের দিনগুলো বুঝি শেষ হয়ে এল। ঝারি ভিকনাথকে ঠেলা মেরে হু-হু কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার চোখের জলে বেরিয়ে এল ঘামের গন্ধ। নিজের ভেতর সে খুঁজতে লাগল ভূতের গন্ধ।
.
২৯.
দশদিন কেটে গিয়েছে কাজে যায়নি ভিকনাথ। ঘরে চাল বাড়ন্ত। ঝারির আর হাঁটার ক্ষমতা ছিল না। বাঁধ গোড়ায় অনেকদিন পরে দেখা হল তার লুলারামের সঙ্গে। একটা জড়তা নিয়ে কুয়াশা ঢাকা ছাতারগাছের মতো গড়িয়ে ছিল লুলারাম।
ঝারি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, তুমিও কি মুখ ঘুরিয়ে নেবে এই অসময়? লোকের কথা বিশ্বেস করে এতদিনের সম্পর্কটাকে নষ্ট করে দিতে পারবে তুমি? অনেকক্ষণ পরে মুখ খুলল লুলারাম, অপরাধীর মতো বলল, আচ তুমাদের এই অবস্থার জন্যি আমি দায়ী। সবাই তোমার-আমার সম্পর্কটার কথা জেনে গিয়েছে। এটা কেউ সহ্য করতে পারে না।
পারবে না, এতো জানা কথা। ঝারি ঝকঝকে দাঁত দেখিয়ে হাসল।
–লোকের কুনো দোষ নেই। যত দোষ আমার। লুলারাম ঝারির দিকে মায়াবী চোখে তাকাল, ঝারির রূপ তাকে চুম্বকের মতো টানছে, আগুনপোকার মতো নিজেকে কিছুতেই সামলে রাখতে পারছে না লালুরাম, এক উন্মনা অস্থিরতায় বুজে এল তার গলা। পুরুষের এই মুহূর্তটিকে ঝারি খুব ভালোভাবে চেনে। সে যাবতীয় খেদ ভুলে লুলারামের হাত ধরে টানল বাঁধের নীচে। ঝোপের আড়ালে ঘাসের বিছানায় দেহবিছিয়ে দিল সে। লুলারামকেবলল, শোঁকো, ভালো করে শোঁকো–দেখো আমার গায়ে কুনো ভূতের গন্ধ আছে কি না।
লুলারাম পাগলের মতো শুকছিল। শুঁকতে শুঁকতে বহুদিন পরে সে ডুবে গেল আলোর গহ্বরে। তৃপ্তির ডিঙাটা তখন মাছে ঠুকরান ছিপের ফাতনার মতো নড়ছে। সুখের পলির ভেতর নিজেকে সঁপে দিয়ে সে খুঁজতে চাইল জীবনের আসল ঘ্রাণ।
দুটি শরীর দীক্ষা নিয়ে মাটির টানে ফিরে গেল। আকাশের গঞ্জনা শোনার জন্য শুধু জেগে রইল একাকী চাঁদ।
.
চাপাকলে জল আনতে গিয়ে প্রথম বাধা পেল ঝারি। মুখ বেজার করে কলসিটা নিয়ে পাশে সরে দাঁড়াল সে। মনে মনে ফুঁসছিল সে কিন্তু বাইরে তার কোনো প্রকাশ নেই। এ-গাঁয়ে বউ হয়ে আসার পরই তার ভাগ্যটা গাঙের জলের মতো নানা খাতে বয়ে গেছে। সেই প্রথমদিন থেকে তাকে মাঠের কাজে যেতে দেয়নি ভিকনাথ। মুখ ফুলিয়ে বলেছে, লোতুন বউ তুমি। তুমি খাটতে গেলে লোকে যে আমার মুখে চুনকালি দেবে।
