গৌরচন্দ্র তাদের যেতে বললেও কেউ যায় না, সবাই মাটি কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘাড় নীচু করে। আতঙ্ক ছড়িয়ে গিয়েছে ওদের চোখে-মুখে। কার এত সাহস যে মানুষের ক্ষতি করার জন্য ভূত পুষে রেখেছে।
গৌরচন্দ্ৰ কপাল কুঁচকে বলল, যার ঘরে ভূত-প্রেতের বাস তার ঘরে বাচ্চা-কাচ্চা থাকবেনি। তারা হবে আটকুড়ো, বাঁজা। ঝাড়া হাত-পায়ের মানুষ ছাড়া কার বুকে এত সাহস হবে বল?
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বেড়ে গেল সন্দেহ। হলদিপোঁতা ধাওড়ায় এমন মানুষ কে আছে যার ছানাপোনা নেই? আটকুড়া, বাঁজা।
বিশু বলল, আমাদের ভিকনাথ গো, ওর তো কুনো ছেলেপুলে নেই!
দুলাল সবিস্ময়ে বলল, ঠিক কথা। তবে
সন্দিগ্ধভাবে তাকাল লুলারাম, তার মুখে আটকে গেল কথা। জানগুরু গৌরচন্দ্র বলল, কার পেটে কী আচে, আমি ছাড়া আর কে জানবে বাপ। নিজেদের মধ্যে খেওখেয়ি করো না, ঠাণ্ডা মাথায় কাজ নিও। তুমাদের হাতে কুনো প্রমাণপত্তর নেই। থানা পুলিশ হলে তুমরা সব জেলে যাবা। আমাকেও পুলিশ ছেড়ে কথা বলবে না। তাই বলছিলাম কী কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলো, কাঁটার বদলে মুড়ো ঝাটাও চলতে পারে তবে ঝাটার বদলে যেন খাড়া না চলে। মনে রেখো রক্তারক্তি হলে ভূমি নষ্ট হয়। ভূমি নষ্ট হলে শান্তি নষ্ট হয়।
খরাবেলায় ফিরে এসে সাঁঝেরবেলায় সালিশি সভার ডাক দিল হলদিপোঁতার মোড়ল। গায়ে কম্বল জড়িয়ে কোনোমতে সভায় এল চুনারাম। মুনিরামের আসার কোনো উপায় ছিল না। তার ঘা-গুলো থেকে রস কাটছিল অনবরত। সে তার অনিচ্ছার কথা জানিয়ে দিল সবাইকে।
সভা শুরু হতেই হ্যারিকেনের বাতি উসকে লুলারাম বলল, ধাওড়াপাড়ার বেপদ গো। মানুষগুলোকে এ বিপদ থেকে বাঁচাতে হবে।
দুলাল রাগে ফুঁসছিল, ছাগল-গোরু না পুষে মানুষে ভূত-প্রেত পুষেচে। যে পুষেচে তারে গাঁ থেকে পগারপার করতে হবে, নাহলে নিস্তের নেই।
ভূত-প্রেতের প্রসঙ্গ উঠতেই বাকি মানুষ যেন শূন্য থেকে পড়ল, এ কেমুন ধারা কথা গো? মানুষ আবার ভূত-প্রেত পোষে নাকি?
-পোষে, আলবাত পোযে। জানগুরু বলেচে। সুফল ওঝা বলেচে। ওদের কথা ভুল হবার নয়। ভিড়ের মধ্যে থেকে কথাগুলো উঠে এল।
রাতের অন্ধকার ছাপিয়ে ভেসে এল ঝিঁঝি পোকার ডাক। আতঙ্কগ্রস্থ একদল মানুষ টিমটিমে আলোয় মাথার চুল ছিঁড়তে বাধ্য হল। বুড়িগাঙের জলের চেয়েও কালো হয়ে আছে ওদের মুখ। চোখ থমথমে।
সভার মাঝখানে উঠে দাঁড়াল বিশু, গলা খেঁকারি দিয়ে বলল, আমার মেয়েটার পেটে অসহ্য ব্যথা। সে বেচারী সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। দাঁড়াবে কি করে? ওর শরীলে কোনো ওষুধ কাজ দিচ্ছে না। যা খাচ্চে সব বমি হয়ে বেরিয়ে যাচ্চে। সচরাচর এমন হয় না। এসব হচ্ছে সব কু-আত্মার জেরে।
জানগুরু আর কী বলল তা শোনার জন্য লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল চুনারাম। দুলাল গলা চড়িয়ে বলল, তাহলে শোন-জানগুরু বলেচে-এ পাড়ার কেউ ভূত-প্রেতনী পুষে রেখেছে। সেই ভূত-প্রেতনী গাঁয়ের মানুষের ক্ষতি করচে। রোগ-জ্বালা সেই জন্য কমচে না। যার হচ্ছে আর সারচে না। মানুষ গোরু ছাগল হাঁস মুরগি সব ফলিডল দেওয়া পুকুরের মাছের মতো মরচে। এমন চললে পুরো ধাওড়াপাড়া সাফা হয়ে যাবে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। চুনারাম কাশি আটকাতে পারল না, মিনিট দুয়েক কাশতে কাশতে তার চোখ থেকে বেরিয়ে এল জল। খড়খড়ে হাতে সেই জল মুছে নিয়ে চুনারাম শুধোল, এ পাড়ায় কার ঘরে ভূত আছে বলে তুমাদের বিশ্বেস।
বিশু কোনো রাখ-ঢাক না করে বলল, জানগুরুর কথা মতো ভূত-প্রেত তো ভিকনাথের ঘরে থাকার কথা। জানগুরু বলেচে-ভূত আছে তার ঘরে যার ঘরে কুনো ছানাপুনা নেই। সভায় উপস্থিত ছিল ভিকনাথ নিজেও। কথাটা শোনার পরে তার সারা শরীর চিড়বিড়িয়ে উঠল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কী ভেবে সে চুপ করে গেল। সভার মধ্যে গুঞ্জন উঠল ধীরে ধীরে। ঢিল মারা পাহাড়ী-মৌচাকের মৌমাছির মতো ছড়িয়ে গেল মানুষ। সবার ক্রোধী চোখ গিলতে লাগল ভিকনাথকে। এতদিনের চেনা মানুষটা এক নিমেষে শত্রু হয়ে গেল সবার। রাগে-ঘেন্নায় অনুশোচনায় থ’ হয়ে গেল ভিকনাথের শরীরখানা।
চুনারাম মুখ উঠিয়ে বলল, সবাই তো শুনলে, কারোর কিছু বলার থাকলে দশের মাঝখানে বলতে পারো। তারপর দশে যা রায় দেবে সভা তা মেনে নেবে। হঠাই হল্লা ফুঁসে উঠল, হাতের মুঠি বাগিয়ে বলল, দোষীর শাস্তি চাই। যে দশের সর্বনাশ চায়, আমরা তারও সর্বনাশ চাই।
চুনারাম সবাইকে শান্ত হতে বলে ভিকনাথের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল, তুর কিছু বলার থাকলে বল। দশে জেনে-বুঝে যে রায় দিবে সেটা তুকে মানতে হবে। এ ব্যাপারে আমার কুনো রায় নেই। আমি সমাজের দাস, দশের কাছে হাত-পা বাঁধা।
ভিকনাথের কাঁদো কাঁদো চোখ-মুখ, কিছু বলতে গিয়ে গলা বেজায় কেঁপে উঠল তার, নিজেরই পেট চলে না, ভূত-প্ৰেতনীর পেট পালবো কি করে গো? বিশ্বাস না হয় তুমরা সব্বাই মিলে আমার ঘরে চলো, নিজের চোখে সব দেখে আসবা। কথা-কানি আর দু-চারটে হাঁড়িকুঁড়ি ছাড়া আমার ঘরে কিচু নাই গো।
তুর বউটা গলায় সোনার হার পরে ঘুরে বেড়ায়, আর তুই বলছিস তুর ঘরে কিছু নাই–এ তো বড়ো তাজ্জব কথা! হাসির ঢেউ উঠল সভা জুড়ে। অসহায় ভিকনাথ বলল, ওটা সোনার হার ন্য গো, ওটা গিল্টি-গয়নার। চকচক করলে কি সোনা হয়ে যায়? আমার বাপ-ঠাকুরদা কুনোদিন সোনার আংটি পরে নি। আমার মার গায়েও কুনোদিন সোনার কুঁচি ছিল না। থাকবে কি করে, রেজা-কামিনের কাজ করে কি সোনার জিনিস পরা যায়?
