সুফল ওঝা ঢের সময় পার করে একটা বিড়ি ধরায়, গলা খেঁকারি দিয়ে শ্লেষ্মটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে। হলুদ হয়ে যাওয়া কফটা উঠোনে পড়ে জড়িয়ে নেয় ধুলো। বিশু ঘেন্নায় চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সুফল ওঝার দিকে তাকায়, দাদা গো, কিছু এট্টা বেবস্থা করো। আমাদের বাঁচাও।
-বললাম তো ঘাসুরিডাঙার জানগুরুর কাছে যেতে হবে। এত কঠিন কেস আমাকে দিয়ে হবে নি। সুফল ওঝা বিড়িতে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছিল। দুলাল তার কাছে সরে এসে বলল, সুফলদা, জানগুরুকে আমরা তো চিনি নে। তার কাছে যাবো, তবে তুমি এটা হাত চিঠি লিখে দাও।
–ও সবের কোনো দরকার হবে নি। ওখানে গিয়ে শুধু আমার নাম বললেই হবে। সুফল ওঝা গোঁফ নাচিয়ে নির্ভরতার হাসি হেসে উঠল।
পাড়ায় এসে প্রেতাত্মার খবরটা রাষ্ট্র করে দিল দুলাল। বিশু তার সঙ্গে থাকল। টগরীর চিকিৎসার চেয়ে পাড়া থেকে বদ-আত্মার অপসারণ তার কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়ে বসল। সেই দলে বুড়োদের সঙ্গে যোগ দিল লুলারাম কেন না নূপুরও কদিন থেকে সর্দি-জ্বরে ভুগে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেলেছে।
ঝারি আর ভিকনাথ ভয়ে মরছে কেন না তাদের উঠোনের জামগাছটা গত ক’ বছরে লকলক করে বাড়ছে। উঠোনে জামগাছ থাকা নাকি শুভ নয়। দুলাল গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছে সব। শুধু লুলারামের ভয়ে সে কথাটা নিজের ভেতর চেপে আছে।
লুলারামের রাগ হলদিপোঁতা ধাওড়ার অনেকেরই জানা। ওর স্বভাব হল সব কিছু চুপচাপ শুনে যাওয়া। তারপর মওকা মতো সব ধারাল তীরগুলো জায়গা মতো ছুঁড়ে দেওয়া। শুধুমাত্র বুদ্ধির জোরে মানুষটা এখনও চাষের কাজে খাটতে গেল না, সে যদি মন করে তাহলে অনেক বাবু-ভাইকে তার নিজের ঘরে খাটাতে পারে। না হলে থানার পুলিশ প্রায় ওর দোরে আসবে কেন? এমন কী দারোগাবাবু পর্যন্ত লুলারামকে সমীহ করে।
নূপুরের অসুখের পর মন ভেঙে গিয়েছে লুলারামের। মুনিরাম খনখনে গলায় বলে, বাপরে এখুনকার জ্বর জ্বালাকে হেলাফেলা করবিনে। হাসপাতালে নিয়ে যা, মেয়েটারে এট্টু ওষুধ-বিষুধ এনে দে।
নূপুর বিছানা নিলে এ ঘরে হাঁড়ি চড়াবে কে? মোলক এখনও হাঁড়িশালে যায় না, ভাত ঝরাতে গেলে প্রায়ই গরম ফেন তার পায়ে পড়ে কাহিল করে দেয় তাকে।
ঘাসুরিডাঙার জানগুরু গৌরচন্দ্র মানুষ হিসাবে মন্দ নয়। তার বিকটদর্শন চেহারাখানা মানুষের মনে প্রথমেই ত্রাসের সৃষ্টি করে। মাঝারি গড়নের জানগুরুর চেহারাটা অল্প মোটা, তবে ডানদিকের গালের খুবলান দাগটা তাকে ভয়াবহতার চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। এক নজর দেখলে অনেকেরই পিলে চমকে যাবার যোগাড়া কালো মানুষটার সারা গায়ে চন্দ্ৰবোড়া সাপের মতো ছোপ ছোপ দাগ। কালো-সাদার সংমিশ্রণে সে এক বীভৎস চেহারা। শুধু শিশু নয়, এ চেহারা দেখলে বয়স্কদেরও পিলে চমকে যেতে বাধ্য। গৌরচন্দ্র তার কটা চোখের মণি ঘুরিয়ে শুধোল, তুমরা কারা গো, কুন গাঁয়ের লোক?
সাহস করে তার সামনে এগিয়ে গেল লুলারাম, হলদিপোঁতা ধাওড়া থেকে আসচি গো।
-অঃ, তা বেশ, তা বেশ। শয়রেটে চুলে হাত বুলিয়ে বাপের বয়সী গৌরচন্দ্র জিজ্ঞেস করল, তা বেটা, তুর নাম কি?
-আজ্ঞে আমার নাম লুলারাম রাজোয়ার।
-ওঃ বুঝেচি! তুর বাপের নাম মুনিরাম, তাই না? গৌরচন্দ্রের চোখ থেকে সংশয়ের মেঘ সরে গেল। বেশ খুশি খুশি মেজাজে সে দাপনা চুলকে বলল, তুর বাপের সাথে বয়সকালে কতবার হাডুডু খেলেচি তার কুনো গোনা গুনতি নেই। তবে মানতে হবে তুর বাপের মতো খেলোয়াড় এ তল্লাটে আর দুটি ছিল না। তা বাপ, তুদের সেই কালো ঘোড়াটা আচে না বেচে দিয়েচিস?
কালো ঘোড়ার প্রসঙ্গ উঠতেই সিঁটিয়ে গেল লুলারাম। কালো ঘোড়ার গল্প পাড়াগাঁয়ে কার না জানা। মুনিরামের অসুখের জন্য ওই কালো ঘোড়াই যে দায়ী একথা আড়ালে আবডালে অনেকে এখনও আলোচনা করে। পাপের শাস্তি মানুষকে এ জীবনেই পেয়ে যেতে হয়। স্বর্গ-নরক এই ধুলোতেই মিলে মিশে আছে।
যে মানুষটা এত জানে সে নিশ্চয়ই মুনিরামের আর সব গুণের কথা জেনে বসে আছে। তার সম্মুখে বেশি মুখ নাড়ানো উচিত হবে না। কেঁচো খুঁড়তে এসে সাপ বেরিয়ে পড়লে মুশকিল।
গৌরচন্দ্র তার কটা চোখ ড্যামা ড্যামা করে লুলারামের দিকে তাকাল, তা বাপ, তুর কি করা হয় শুনি?
লুলারামের যাবতীয় গাম্ভীর্য লুটিয়ে পড়ার দশা, কোনোমতে মাথা নেড়ে সে বলল, কি আর করবো গো, যখন যা পাই তখন তা করি। এসব করে দিন চলে যায় কুনোমতে।
-কুনোমতে কেন রে, তুর দিন তো বেশ ভালোই যাচ্ছে। তুই এখন অমাবস্যায় চাঁদ দেখচিস। তবে সাবধান। গৌরচন্দ্রের চোখ কঠিন হয়ে এক জায়গায় স্থির হয়ে গেল, যে হরিণের পেছনে তুই দৌড়োচ্ছিস সে তো হরিণ নয়, সে হল বাঘ। তুরে খাবে, তুর সনসার খাবে। সোনা ভেবে যারে তুই আঁকড়ে ধরেছিস সে হল কচা কাঠ।
লুলারাম ঘামছিল। সেয়ানা সেয়ানায় লড়াই জমে ওঠার আগেই বিশু এগিয়ে এল ওদের সামনে, জোড়হাত কপালে দুইয়ে বলল, আমাদের ঘোরতর বেপদ গো, আমাদের বিপদ থেকে বাঁচাও। সুফল ওঝা তুমার কাছে পাঠাল। সে খড়ি কেটে দেখেচে গায়ে নাকি প্রেতাত্মা ঘুরচে–
দাপনায় চটাস করে চাটি মেরে লাফিয়ে উঠল জানগুরু, প্রেতাত্মা ঘুরছে নারে ব্যাটা, দুটা মানুষ প্রেতাত্মা পুষে রেখেছে। তারা মানুষের সর্বনাশ চায়। তবে তাদের আমি বেশি বাড় বাড়তে দিবোনি। তাদের ডানা আমি হেঁটে দিব। তুরা যা–
