দু’জন প্রতীক্ষারত মহিলা তাদের সমস্যার কথা বলে বুক হালকা করে উঠে দাঁড়াল। সুফল ওঝা তাদের আশ্বস্ত করার জন্য বলল, চিন্তা করো না মা জননীরা, আমি গিয়ে ফুরসৎ মতো তোমাদের ঘরে দেখা করব। তোমাদের আর আমার এখানে কষ্ট করে আসার দরকার নেই।
মহিলা দুটি চলে যাওয়ার পর উশখুশিয়ে পেছন ঘেষড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল দুলাল। সুফল ওঝা দুলালকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখল, তা বাবা অনেকদিন পরে এলে যে! তা তোমার মেয়ের ঝামেলাটা মিটে গিয়েছে তো? মেয়ে নিশ্চয়ই এখন জামাইয়ের ঘর করচে?
দুলাল কিছুটা অপ্রস্তুত তবু লজ্জিত ঘাড় নেড়ে সায় দিল। সুফল ওঝা কৃতিত্ব নেওয়ার ভঙ্গিতে ডানে-বাঁয়ে নিজেকে আন্দোলিত করে বলল, আমি জানতাম জট খুলে যাবে। বিচুটির বিচি গায়ে রগড়ে দিলে গা কুটকুটায়। তা বাপ তোমার জামাই বাবাজীবনের কুটকুটানির রস আমি মন্ত্রের জোরে শুকিয়ে দিয়েছি। সে শালাকে আমি বেঁধে দিয়েছি। এবার যতদিন সে বাঁচবে, শ্বস নেবে তোমার মেয়ের পা-চাটা কুকুরের মতো বাঁচবে। আর তা যদি না হয় তাহলে তোমরা এই সুফলের নামে কুকুর পুষো।
দুলাল সর্বশরীর দুলিয়ে পাতা ভরা ডালের মতো হায়-হায় করে উঠল, কী যে বলো, সুফলদা! তুমার দয়ায় আমরা এ গাঁয়ে বেঁচে আছি। তুমি না দেখলে আমাদের কে দেখবে বলো। তুমি আমাদের ভগবান গো…!
সুফল ওঝা এমন তোমোদর কথা শুনে রে-রে করে উঠল, মারব এক ধাপ্পড়, অমন পাপ কথা মুখে আনবে না। শোন ভাই, আমি কেউ নই গো, আমি কেবল হাঁড়ির ঝি চণ্ডীর সেবক, মা কামরূপ কামাক্ষ্যার আজ্ঞাবহ দাস। তেনারা আমাকে পেঠিয়েছেন মানুষের সেবা করার জন্য। যতক্ষণ এ ধুলোয় আছি, ততক্ষণ ধুলো মেখে যাবো। তা বলো কিসের জন্য এই অধমের কাচে আসা?
দুলাল তার দৃষ্টিকে মাখা ময়দার চেয়েও নরম করে বলল, অনেকদিন হয়ে গেল, মা’র জ্বর ছাড়চে নি! বড়ো ঝামেলায় আচি, মুনিষ খাটতেও যেতে পারচিনে।
-তুমার আর মুনিষ খেটে কী লাভ, যা কামিয়ে এনেচো? সুফল ওঝা দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে হেসে উঠল, তারপর নিমেষে গম্ভীর হয়ে বলল, ও জ্বর ছাড়বেনি, ও কী সাধারণ জ্বর? তোমাদের পাড়া থিকে মেলা লোক আসছে। সবার মুখে ওই এক কথা। কার গোরু মরচে, কার ছাগল মরচে, কার গাছ শুকোচ্চে! আমি কী করব বলতো?
-তুমাকেই তো সব করতে হবে সুফলদা। গায়ে পড়া হাসি হাসল দুলাল।
সুফল ওঝা আরাম করে বসে দুলালকে বলল, তোমাদের পাড়াটায় কু-নজর পড়েছে। পুরা শেষ হয়ে যাবে পাড়া। দাঁড়াও গণনা করে দেখচি, কার বিষ-নজরে এসব হচ্ছে।
চেয়ার ছেড়ে সুফল ওঝা বেরিয়ে এল বাইরে। উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গোল চক্কর কেটে চারপাশ দেখে নিল একবার। চোখে-মুখে চতুর হাসি ছড়িয়ে ধুতি গুছিয়ে সে ঝপ করে বসে পড়ল উঠোনের মাঝখানে। খামচা দিয়ে তুলে নিল এক মুঠো ধুলো। সেই ধুলো দিয়ে ছক কাটল উঠোনে। ছকের মাঝখানে আঙুল রেখে বিড়বিড়িয়ে উঠল সে, দেখা দে মা, দেখা দে। ডাকিনী-যোগিনী, প্রেত-প্রেতনী দেখা দে, দেখা দে। দোহাই তুদের দেখা দে। বিড়বিড়ানো মন্ত্রের সাথে সাথে ধুলো ওড়ে। ডানে-বায়ে মাথা ঝুঁকায় সুফল ওঝা।
এক সময় চোখ কপালে তুলে সে থেমে যায়। ধুলো ছুঁড়ে দিয়ে মুঠি করে ধরে রুদ্রাক্ষের মালাটা। মেয়েলি গলায় চিঁ-চিঁ শব্দ করে ওঠে, ছেড়ে দে, ছেড়ে দে রে! আর জ্বালাস নে বাপু, ছেড়ে দে।
দরদরিয়ে ঘাম নামে সুফল ওঝার মুখ আর কপাল চুঁইয়ে। একটু আগের শান্ত-শিষ্ট মানুষটা বুঝি অশান্ত হয়ে ওঠে। তার চোখের মণি লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে। হাঁপাতে থাকে সে। হাঁপানী থামিয়ে এক সময় গর্জে ওঠে সে, পেয়েছি, পেয়েছি তারে। সে তোদের পাড়ার মানুষ রে। বর-বউ মিলে করচে, মোট দু’জন। উঠোনে জামগাছ আছে। রাতে এট্টা পেঁচা বসে। মুখটা নারকোলের মালাইচাকির মতো, আর চোখ দুটো কাচ-টিপ্পির। সাবধান, ওরা সব খাবে। মানুষ গোরু ছাগল হাঁস মুরগি সব খাবে। শেষে মাটি খাবে, গু-গোবর সব খাবে। সাবধান।
–আমাদের কি হবে সুফলদা? অনেকক্ষণ পরে মুখ খুলল বিশ্বনাথ। সুফল ওঝা অর্ধেক ঘুরে সজোরে তার হাত চেপে ধরল, বিশুরে, গা ছেড়ে পালা। ওরা তোর মেয়েটারে ধরেচে। ছাড়বে নি, ছাড়বে নি। পেটে ব্যথা হয়?
বিশু ঘাড় নাড়ে। সমবেত মানুষের চোখে বিশ্বাসযোগ্যতার আলপনা ভেসে ওঠে। সুফল ওঝা গলা চড়ায়, ভয় পাবি নে। এর চিকিৎসে আছে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তবে খরচাপাতি করতে হবে। ঘাসুরিডাঙার জানগুরুর কাছে যেতে হবে সত্বর। তার বেচার নিতে হবে। আমি কিছু বলবনা। আমি প্রতিবেশী, আমার কিছু বলা সাজে না।
-কার কু-নজর পড়েছে শুধু তার নামটা বলল। বিশু তেতে ওঠে।
দুলাল উত্তেজিত, তোমাকে বলতে হবে সুফলদা। তুমার মেয়ের দিব্যি, না বললে চলবে না। সব রসাতলে যাবে। আমাদের ক্ষতি হোক–তুমি কি চাও? সুফল হাড় ফোটাল মটমটিয়ে, না রে ভাই, না। আমি মাটির মানুষ, মানুষের ভালো হোক এটাই চাই।
সুফল ওঝার স্বাভাবিক হতে আরও আধঘণ্টা সময় লাগে। বিশু গালে হাত দিয়ে হাঁটু মুড়িয়ে বসে আছে দাওয়ায়। দুলালের মুখে কোনো কথা নেই। তাদের পাড়ায় কার উঠোনে জামগাছ আছে? বর-বউ, ঘরে কোনো সন্তান নেই? কে সে? দুলালের মাথাটা গুলিয়ে যেতে থাকে। তার কানের পাশটা ঝাঁ-ঝাঁ করে। কপালটা অতিরিক্ত চিন্তায় ছিঁড়ে পড়তে চায়।
