-গাঁয়ের ভেতর। বিশুর জবাবে দুলাল আশ্বস্ত হয়ে বলল, আমিও তো গাঁয়ে যাচ্ছি, ভালোই হল। চল, এক সাথে যাই
-কার ঘরে যাবা গো দুলালদা? বিশু ছেলেমানুষের মতো শুধালো। দুলাল একটু থামল, সুফল ওঝার ঘরে যাবো রে, মার শরীলটা ভালো যাচ্চে না।
-আমিও তো সুফল ওঝার ঘর যাবো।
–কেনে তুর আবার কি হল?
টগরীর পেটে ব্যথা। বেশ কদিন হয়ে গেল। সারচে না।
–তাহলে তো ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার। দুলালের মুখে চিন্তার রেখাগুলো ফুটে উঠল, পেট বলে কথা, কোনো কিছু তো বাইরে থেকে দেখা যাবে না। দেখা না গেলেই তো যত ঝামেলা রে! ভয় হয়, কিচু আবার হয়ে গেল না তো!
এ কথায় বিশুর ঝিমুনিভাবটা কাটল না বরং বেড়ে গেল। সে আবার ঢোক গিলে ভীতু চোখে দুলালের দিকে তাকাল। দুলাল বলল, ভয় পাবার কিছু নেই। রোগ যেমন আছে তেমনি তার অসুধও আচে। এখানে না হলে কাটোয়া-বহরমপুর নিয়ে যা। ওখানে শুনেচি বড়ো বড়ো ডাক্তার-বদ্যি আছে। ওরা পেট টিপে রোগ ভালো করে দেবে।
বিশুর মুখে কোনো কথা নেই, সে এসব কথা অনেক আগে থেকেই জানে। জেনেও সে এখন ঠুটো জগন্নাথ। ঘরে টাকা থাকলে সে কি মেয়েটাকে ফেলে রাখত। কবে বাস ধরে চলে যেত শহরে। নিরুপায় বিশুর গলার স্বর বুজে এল, দুলালদা, তুমি তো মুনিষ খাটাতে ভিন দেশে গিয়েচিলে। তুমার কাছে কিছু কি হবে গো?
দুলাল গলা ফাড়িয়ে হাসল না, কেমন দুঃখ-দুঃখ মুখ করে তাকাল, তা গিয়েচিলাম রে ভাই। কিছু টাকা কামিয়ে নিয়ে এলাম আমি আর তোর বউদি মিলে। কিন্তু এমন ভাগ্য–সে টাকা বানের জলের মতো বয়ে গেল। যেদিন ঘরে এলাম ভাই, সেদিন শুনি মার অসুক। হাসপাতালে ধুকছে। তারে নিয়ে কেসনগর যেতে হল। না হলে বাঁচত নি। শুধুমাত্র টাকার জোরে মা’টারে ঘুরোণ আনলাম।
দুলালের গলা ছুঁয়ে নেমে এল দীর্ঘশ্বাস। আশাহত বিশু আর কোনো কথা বলার সাহসই পেল না। বাঁক পেরিয়ে দুলাল বলল, মাকে নিয়ে আবার আমি ঝামেলায় পড়েছি। কী যে জ্বর ধরেছে, সে আর ছাড়চে না রে। ভুগে ভুগে মা আমার হাড় লিকলিকে হয়ে গিয়েছে। কেমুন চিঁ চিঁ করে কথা বলে। তার কথা শুনে আমি আর তোর বউদি ভয়ে মরি। মনে হয় মা-রে কেউ ধরেছে।
-ধরেচে মানে? বিশু চমকে উঠল। ওর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল।
দুলাল খুঁকখুঁকিয়ে কাশতে কাশতে বলল, তোর বউদি বলছিল মার উপর মনে হয় কুনো আত্মাটাত্মা ভর করেচে নাহলে জ্বর ভালো হবে নি কেন?
-সে কি গো? বিশুর চোখের তারা ভয়ে কুঁকড়ে গেল, তুমার মা তো টুকটাক এসব বিদ্যে জানত। ভূত-প্রেত তো তারে ভয় পায় শুনেছি। তার যদি এমন হয় তাহলে তো ভয়ের কথা।
-সুফল ওঝার কাচে না গেলে এসব সঠিক ভাবে জানা যাবে না। গভীর আস্থায় দুলালের গলা বুজে এল, কোনোমতে সে বলল, দিনকাল খুব খারাপ পড়েচে। এখুন খেয়ে পরে বেঁচে থাকাই দায়। এর মধ্যে যদি অসুখ-বিসুখ করে তাহলে গোদের উপর বিষফোঁড়া। আমি আর পারচি নে রে ভাই, হেঁপসে উঠেছি।
সুফল ওঝার মাটির ঘরখানায় যেন সব সুখ-শান্তি-সমাধান লুকিয়ে আছে। ধাওড়া- পাড়ার মানুষগুলো এখানে এলে বুঝি ভরসার গঙ্গামাটি খুঁজে পায়। মানুষটা বেঁটে-খাটো কিন্তু ওর নাম-যশ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো। ওর কীর্তি কলাপের কথা বলে শেষ করতে পারে না গ্রামের মানুষ। কর্মের সঙ্গে কিছুটা গুজব মিশে সুফল ওঝা মানুষের চোখে হয়ে উঠেছে পরিত্রাতা।
মাটির ঘরের টিনের চালে রোদ পড়ে ঝিলিক মারছে বহুদূর পর্যন্ত। বিশুর মনে হল যেন ঢেউ খেলানো টিন নয়–কেউ আয়না বিছিয়ে রেখেছে ওর ঘরের চালে। সেই আয়নায় রোদে পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে জ্যান্ত চ্যাং মাছের মতো। উঠোনোর উপর কাঠটগরের গাছটার থোকা থোকা ফুলগুলো আকাশের তারার চেয়েও উজ্জ্বল। ওই একটা গাছই উঠোনের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুণ।
বিশু আর দুলাল উঠোন পেরিয়ে মাথা হেঁট করে দাওয়ায় গিয়ে বসল। আগে থেকেই খেজুরপাতার চাটাই বিছিয়ে রেখেছে সুফল ওঝা। সকালবেলায় লোকজনের ভিড় কম হয় না। আশেপাশের গাঁ থেকেও লোক আসে তার কাছে। এখানে না এলে বোঝা যাবে না-মানুষের এত রকমের সমস্যা আছে। সবার সমস্যার কথা শুনে সাধ্যমত বিধান দেয় সুফল ওঝা। তবে সব কেস নিজের হাতে রাখে না। তেমন বুঝলে কেস চালান করে দেয় ঘাসুরিডাঙার জানগুরুর কাছে। জানগুরু কিছু বলা মানে সেটাই গুরুবাক্য, মহাবাক্য। অতএব বিনা সঙ্কোচে শিরোধার্য।
অনেক আগে থেকেই চাটাই জুড়ে বসেছিল ছ-সাত জন। বিশু দেখল এর মধ্যে চেনা জানা দু-জন মেয়েমানুষও আছে। এদের পাশ কাটিয়ে সে আর দুলাল কিছুটা তফাৎ-এ বসে সুফল ওঝা কোথায় গেল দেখছিল।
লোকজন এলেও সুফল ওঝার আসতে একটু দেরি হয়। রোজ সকালে স্নান সেরে সে কামাখ্যা মা এবং মনসাদেবীকে প্রণাম জানায়। শীতলাবুড়ি তার সঙ্গে সব সময় ঘোরে। হাঁড়ির ঝি চণ্ডীর আজ্ঞায় তার এই বাড়বাড়ন্ত। দেব-দেবীদের অস্বীকার করলে তার এই মন্ত্রব্যবসা ধাপে টিকবে না। ভক্তির চাইতে ভড়ং বেশি না হলে মানুষের মনে রঙ ধরে না।
জয় মা চণ্ডী, জয় মা শীতলা, জয় কামাক্ষ্যা’ বলতে বলতে খাটো ধুতি পরে কাঁঠালকাঠের চেয়ারে এসে বসল সুফল ওঝা। বিশু দেখল ওর কপালে মা কালীর হাড়িকাঠের মতো একটা তিলক আঁকা, গোলা সিঁদুর চকচক করছে কপালের চামড়ায়। ওকে না সাধু, না তান্ত্রিক, না মন্ত্রসাধক কোনো বিশেষরূপে চিহ্নিত করতে পারে না বিশু। ওর সরল, বেদনা ভারাক্রান্ত দুই চোখ যথাসম্ভব মুগ্ধতার রেশ লাগিয়ে দেখতে থাকে অপলক। একটা সাধারণ মানুষ নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিজেকে কি ভাবে বদলে নেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সুফল ওঝার মতো বুঝি আর কেউ নেই।
