.
২৮.
পরপর তিন রাত ঘুমাতে পারেনি বিশু।
মেয়েটা বিছানায় কাতরাচ্ছে, সে ঘুমাবে কী করে? মমতা অস্থির হয়ে বলল, ওগো, কিছু একটা করো। মেয়েটার এ ছটফটানী আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। মমতা কথা বলছিল না, যেন ওর গলা ঠেলে বেরিয়ে আসছিল কান্না। বিশুও সংক্রামিত হল মমতার চোখের দিকে তাকিয়ে। কালীগঞ্জ হাসপাতালের বড়ো ডাক্তার বললেন, ওষুধ দিয়ে দিলাম। পেটের ব্যথা না কমলে আবার নিয়ে আসতে হবে। তেমন দরকার পড়লে কৃষ্ণনগরে পাঠিয়ে দেব।
কৃষ্ণনগরের নাম শুনে মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল মমতার। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুচ্ছিল না। আঁচলে মুখ ঢেকে সে ফুঁপিয়ে উঠেছিল ডাক্তারবাবুর সামনে।
তার কান্না দেখে বড়োডাক্তারবাবু বললেন, ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। চিকিৎসা চললে আশা করি ভালো হয়ে যাবে।
-তাই যেন হয় ঠাকুর। বিশু হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠেছিল। তখন শীতের দুপুরে রোদ চড়াও হয়ে ঢলিয়ে পড়ছে ঘাসের গতরে। ঝকড়া মাথার খেজুর গাছগুলো আকাশকে ভয় দেখানোর জন্য ব্যস্ত, যেন আকাশের মেঘ নেমে এলে সুঁচলো কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত করে দেবে তাদের দেহ। টগরী কোনো মতে হেঁটে এসেছিল পতাকা তোলার সিমেন্টের বেদী অবধি। ভ্যান রিকশা বা টাঙায় আনার ক্ষমতা ছিল না বিশুর, তাই দড়ির খাটিয়ায় মেয়েটাকে শুইয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত এনেছে সে। এটাই আশেপাশের দশটা গ্রামের নিয়ম।
ওষুধে কাজ দিচ্ছে না–এটা বুঝতে পেরে বিশু কেমন সকাল থেকে মনমরা। মনের কথা সে মনেই চেপে রেখেছে ইট চাপা ঘাসের মতন। কেন না মমতা ঘাবড়ে যায় কথা শুনে, চোখের জল আটকে রাখতে পারে না সে, পাতাঝরা গাছের মতো তাকে তখন উদাস দেখায়। দূরের অনেক কিছু বুঝি দেখতে পায় বউটা।
বিশু মমতার মুখোমুখি দাঁড়াল, নিগুঢ় দৃষ্টিতে বউটাকে দেখে মনটা ম্যাদা মারা হয়ে গেল তার। কোনোমতে বলল, অতো ভাবার কিছু নেই। শরীল থাকলে রোগজ্বালা হবেই।
মমতা যেন কথা শুনছে না এমন ভ্যালভেলানো চোখে তাকাল, ক’দিনে মেয়েটার কেমন দশা হয়েচে দেখো-ওর দিকে তাকানোই যায় না। আহা, কী সোন্দর চেহারা ছিল মেয়েটার। এখন মনে হয় বাজপড়া তালগাছ। বিশু চুপ করে গেল।
মমতা যা বলছে তা বানানো নয়। ও মা। মা’র চোখকে ফাঁকি দেওয়া কি সম্ভব। মনে মনে হাঁপিয়ে উঠছিল বিশু। ভয়ে সে আর হাসপাতালে যায় নি। এবার নিয়ে গেলে ডাক্তারবাবু নির্ঘাত কৃষ্ণনগরে নিয়ে যাবার কথা লিখে দেবেন। একটা ভয় তাকে কুণ্ডলী পাকানো সাপের মতো ঘিরে আছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই ছোবল খাবার আশঙ্কা।
ভয়টা টাকার জন্য। এত টাকা আসবে কোথা থেকে। যাওয়া-আসার ভাড়া যোগাতেই জান কয়লা হবার অবস্থা। টগরীর অসুখ বলে মুনিষ খাটতে যেতে পারেনি সে। অন্য সময় হলে মমতাই তাকে ঠেলেঠুলে পাঠাত। আশ্চর্য, এ কয়দিন মমতা কোনো জোরই করল না। যেমন যাচ্ছে যাক, শুধু মেয়েটা সুস্থ হয়ে উঠুক, এই তার মা শীলতাবুড়ির কাছে প্রার্থনা। সকাল থেকে টাকার অভাবে কেয়োর মতো নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে বিশু। লাল চা বানিয়ে মমতা তার কাছে এসে বসল। কাচের গ্লাসটা বিশুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, চা খেয়ে দেয়ে একবার সুফল ওঝার ঘর থিকে ঘুরে এসো। আমার মন বলচে–সিখানে গেলে টগরী আমার ভালো হয়ে যাবে। বিশুর চোখ থেকে তখনও সংশয় পুরোপুরি মেলায় নি।মমতা সামান্য জোর গলায় বলল, হাসপাতালের কড়াকড়া বড়ি-ইনজিসিনে যা না হয় অনেক সময় জড়িবুটি শিকড়িতে তা হয়ে যায়। তাছাড়া সুফল ওঝার ঝাড়ফুকে অনেকের ভালো কাজ হয়েচে। ওর জলপোড়া খেয়ে কত লোকের পেটের ব্যায়ো সেরেচে।
মমতার বিশ্বাসে আঘাত করতে মন চাইল না বিশুর। গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে সে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। গা-হাত-পায়ের হাড় সশব্দে ফুটিয়ে বলল, সুফল ওঝা কি খালি হাতে ওষুধ দিবে গো, ওরও তো সনসার আচে।
ধার-বাকি কথা বলবে, যদি না শোনে এটা সাথে করে নিয়ে যাও। কাঁসার একটা ছোট থালা বিশুর হাতে তুলে দিল মমতা। বিশুর হাত কাঁপছিল থালাটা নিতে গিয়ে। এই কাঁসার থালাটা টগরীর মুখে-ভাতের সময় পয়সা জমিয়ে কিনেছিল বিশু। এটাই তার ঘরের একমাত্র দামী জিনিস। আপদে-বিপদে এই কাঁসার থালাটাকে দেখে অনেক শক্তি আর দুর্মর মনের জোর খুঁজে পায় বিশু।
থালাটা ধরল বটে কিন্তু ওর মন চাইছিল না ওটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে। তার দ্বিধা দেখে মমতা বলল, দিন এলে অমন থালা ঢের হবে। কালীগঞ্জ বাজারের কাঁসারি দোকান তো আর উঠে যাবে নি। যাও, আর ভেবোনি। দেরি হয়ে যাচ্চে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এল বিশু। বাঁধের গোড়ায় কদম গাছটাকে এ সময় বড়ো মন মরা দেখায় অথচ মাস চারেক আগেও এই গাছটার রূপ-যৌবন কত নজর কাড়া ছিল। এখন গাছটার সেই চোখ ধাঁধানো চেহারা নেই, অনেকটাই বিশুর মতো এলোমেলো দশা।
কদমগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে সেঁক গিলল বিশু, ওর দু-কানে অদ্ভুত একটা শব্দ এসে ধাক্কা মারল। নিজেকে সামলে নিয়ে বিশু দেখল দুলাল হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছে।
পেছন থেকে দুলালকে ডাকল না সে, এতে যাত্রা খারাপ হয়ে যেতে পারে। সেই কারণে সামান্য জোরে হেঁটে দুলালকে ধরে ফেলল সে।
দুলাল হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করল, কুথায় যাবিরে?
