আগে গাঁয়ের লোকে তার দাদুদের ধরে নিয়ে গিয়ে গাছে বেঁধে মারত। কারণে-অকারণে মার খেয়ে খোঁড়া হয়ে ফিরে আসতে হোত ওদের। গাঁয়ের কোন কিছু হারালে যেন ওরাই চোর, ওরাই ডাকাত। বিনা বিচারে চলত বেদম প্রহার। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত উঠিয়ে ছাড়ত। সে কষ্ট চোখে দেখা যায় না। অতীতের গল্প করতে গিয়ে চোখে জল এসে যেত চুনারামের, সেদিন কি পুরাপুরি গিয়েছে দাদুভাই। এখুন ও মানুষকে বিনা কারণে মারে। এখানে যার যত গায়ের জোর তার তত প্রসার। লাঠি যার মোষ তার–এই নীতিতে গাঁ-সমাজ চলছে আজও।
এই সমাজের বদল চায় রুদ্রাক্ষ, কুশল মাস্টার। কপোতাক্ষ তাদের দলে নেই তবে ওর লড়াইও অসাম্যের বিরুদ্ধে। বিদুর রাজোয়ার, লাবণি–ওরাও পিছিয়ে নেই এই চর্চায়।
সবাই বদলের কথা বলে। বদল কখন হবে? রঘুনাথ হা করে শোনে তাদের ভাষণ। ভাষণ শুনে ভরে যায় মন। যারা কেরোসিন খায়, রাস্তা খায়, টিউবওয়েলের টাকা খায় তারা কেমন মানুষ? তারা তো রাক্ষস।
ভোরের আলো ফোঁটার আগে রুদ্রাক্ষ ফিরে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, কমরেড, আবার দেখা হবে। আমরা সাম্যবাদের লাল সূর্যটাকে তোমাদের ধাওড়াপাড়ায় ওঠাব। জগত রেশন-ডিলারের কালো হাত আমরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব। আমাদের দীক্ষিত কমরেডরা গায়ে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন চলছে শুধু বুর্জোয়া-চিহ্নিতকরণ পর্ব। চিহ্নিতকরণ পর্ব সমাপ্ত হলে শুরু হবে শুধু রক্তাক্ত সংগ্রাম। রক্তাক্ত সংগ্রাম ছাড়া ভিক্ষে করে জয় আসবে না। মনে রাখতে হবে–আমাদের এই স্বাধীনতা ঝুটা। আমরা প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেব। এ বিষয়ে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
রুদ্রাক্ষ চলে যাবার পর মন খারাপ হয়ে গেল রঘুনাথের। ওই মানুষটার কথায় আঁচের আগুন লুকিয়ে আছে। এই আগুনটাকেই ভালো লাগে তার। কিন্তু অভাব তাকে পথ হাঁটতে দেয় না। দুর্গামণির মতো পথ আগলে দেয়, যাবিনে বাপ, ও পথ তোর পথ নয়। বাবুরা যে পথে হাঁটে সে পথ তো আমাদের হাতে বানানো। হাঁসে ডিম পাড়ে, খায় দারোগাবাবুতে। দুর্গামণির চোখে ফুটে ওঠে ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের ভেতর কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে অভাবের হিমকালো সাপ। এমন বিষধর সাপ জ্ঞানপড়ার পর থেকে সে আর দেখেনি। এই সাপকে বশ মানাতে গেলে গাছের শিকড়িতে হবে না, এর জন্য চাই চাদির জুতো। চাঁদির জুতোয় অভাব অনটন বাপ বাপ বলে গাঁ ছেড়ে পালাবে। তাহলে চাদির জুতো আসবে কোথা থেকে? এই প্রশ্নটাই এখন বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে রঘুনাথের ভিতরে। লুলারামের প্রস্তাবগুলোর তার মনে পড়ছে। চাইলে কেউ দেবে না, জোর করে নিতে হবে। যার অনেক আছে তার কাছে জোর করলে কোনো পাপ হয় না। না বলে নিলে তা চুরি করা হয়। কিন্তু ….? রঘুনাথের মন দোটানায় ঝুলে রইল।
বাঁধের গোড়ায় তার দেখা হয়ে গেল লুলারামের সঙ্গে। কী একটা ভাবতে ভাবতে সে যেন পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইছিল। রঘুনাথ পেছন ঘুরে ডাকল, কাকা? ডাকটা আর্তনাদের মতো শোনাল লুলারামের কানে। সে দাঁড়িয়ে পড়ল। গলায় মাফলারটা ফাসের মতো জড়িয়ে সে বলল কে, রঘু নাকি?
-হ্যাঁ, কাকা।
-অসময়ে তুই কুথায় যেচিস?
রঘুনাথ বুঝতে পারল লুলারাম এখনও অব্দি গুয়ারামের কোনো কথাই শোনেনি। শুনলে সে নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন করত না। দাদার জন্য তার প্রাণটা কঁকিয়ে উঠত। রঘুনাথ কাকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঢোক গিলল, বাবার মাথা কে ফেটিয়ে দিয়েছে বাঁধের গোড়ায়। আমি ঘরে ছিলাম না, মানিকডিহি গিয়েচিলাম। ফিরে এসে দেখি ঘরে তালা মারা। নূপুর আমাকে সব কথা বলতেই আমি এখুন হাসপাতালে যাচ্চি। লুলারাম মরা গাছের মতো দাঁড়াল কিছুক্ষণ তারপর কপাল কুঁচকে বলল, দাদার মাথায় লাঠি মারার মানুষও দেখচি এ গাঁয়ে আচে। হায় ভগবান, আমরা এখুনও কুন দেশে আচি গো……।
তুমি ভেবো না। হাসপাতালে গিয়েচে যখুন সব ঠিক হয়ে যাবে। রঘুনাথ ব্যথায় প্রলেপ দিতে চাইল।
কিছুটা বিরক্ত হয়ে লুলারাম বলল, আমি ভাবব নাতো কি গাঁয়ের মোড়ল ভাববে? এইজন্য আমার সাথে কারোর কুনোদিন পটল না। আমি জানি–এরা আমাদের দাবিয়ে চলে, আমাদের মানুষ বলে ভাবে না। ওরা যখন আমাদের মানুষ ভাবে না, তখন আমি কেনে ওদের মানুষ ভাবব। তাই আমি ওদের শত্রু, ওরা আমার শত্রু। বাধ্য হয়ে আজ আমি রাতের-মুনিষ হয়ে গিয়েচি। তোকেও বলেছি, তুই আমার কথাটা ভেবে দেখিস। মনে রাখিস শুধু সাহেবমাঠে মুনিষ খেটে আমাদের পেট ভরবে না। কোনো নেতা মুত্রি আমাদের কথা ভাবে না। নিজেদের কথা নিজেরা না ভাবলে তলিয়ে যাবি। রঘুনাথ মন দিয়ে শুনল কথাগুলো, তারপর বাবার চিকিৎসার কথা ভেবে সে বলল, কাকা, তুমার কাছে কিছু টাকা হবে, থাকলে দাও। পরে আমি তুমাকে ঘুরোণ দেব।
ঢোলা জামার ভেতর থেকে কতগুলো ভাঁজ করা দশ টাকার নোট বের করে আনল লুলারাম, টাকাগুলো গুনল না, মুঠো করা অবস্থায় ওগুলো রঘুনাথের হাতে দিয়ে বলল, এগুলো নে। আরো লাগলে বলবি। আমি আরো দেব। আর শুন–এগুলান যে দিলাম তা ফেরত দেওয়ার দরকার নেই। এসব পরের টাকা, নিজেদের সেবায় লাগুক। রঘুনাথের মুখ হা-হয়ে গেল কথা শুনে। মানুষটা বলে কি-পরের টাকা? পরের টাকা মানে? মাথাটা কেমন গুলিয়ে গেল রঘুনাথের। লুলারাম তার মনের সংশয় দূর করে বলল, এসব টাকা আমার নয়, এ টাকা আমি রেতের বেলায় মুনিষ খেটে পেয়েছি। এ টাকাও আমার মেহনতের টাকা। এতেও আমার ঘাম মিশে আচে। তুই যা রঘু, দাদা কেমুন আচে জানাস।
