ময়ের টানে গ্রামে ফিরে এসেছে রুদ্রাক্ষ। কিন্তু দুর্ভাগ্য ও ঘর পর্যন্ত যেতে পারেনি। সাদা পোশাকের পুলিশ ওদের বাড়িটাকে লক্ষ্য রাখছে সবসময়। পুলিসের কাছে খবর আছে-রুদ্রাক্ষ ওর মাকে দেখতে একবার আসবেই-আসবে। সেই সুযোগ নতুন দারোগা ছাড়তে নারাজ। যে কোনো মূল্যে রুদ্রাক্ষকে ধরা চাই। বুর্জোয়া সমাজকে বাঁচাতে গেলে এদের ধরে ধরে জেলে ভরা দরকার। এরা নিজেদের বলে প্রলেতারিয়েত। এরা জোর গলায় বলে-শৃঙ্খল ছাড়া এদের আর হারাবার কিছু নেই। এরা ডাক দিয়েছে–দুনিয়ার মজদুরকে একত্রিত হবার জন্য। এরা সর্বহারাদের পক্ষে বিপ্লবের ডাক দিয়েছে। এরা একনায়কতন্ত্রী সরকার চায়। এরা রক্ত চায়, খুন চায়। এরা বস্তুবাদী জীবের কল্যাণ কামনায় অস্ত্র তুলে নিয়েছে হাতে।
রঘুনাথ পকেট থেকে রুদ্রাক্ষর হাত চিঠিটা বের করে আনল, চিঠিটার দিকে পরম মমতার চোখে তাকিয়ে সে বলল, এই চিঠিটা তোর জেঠিমাকে পৌচে দিবি। বলবি-রুদ্রদা ভালো আচে। ওদের যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না। সূর্যাক্ষ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল রঘুনাথের মুখের দিকে, বড়দা, এসেছিল? এটা যেন আমার বিশ্বাস হয় না। ওঃ, আজ ভীষণ হালকা লাগছে। আমি এখন জেঠিমার কাছে যাবো। তুই কি আমার সঙ্গে যাবি?
রঘুনাথ ভাবল, দু’জনে যাওয়া কি উচিত হবে? এক কাজ কর, তুই বরং একা যা। আমি ঘর ফিরে যাই। সাঁঝ নামচে।
হাঁটতে হাঁটতে বাঁধের উপর উঠে এল রঘুনাথ। কাজটা ঠিক সময়ে সারতে পেরে নিজেকে হালকাবোধ হল ওর। আখখেতের পায়ের কাছে অন্ধকার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে পায়ে ধরার জন্য। গাঙ-পালানো বাতাসে লুকিয়ে ছিল শীতের কষাঘাত। গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে রঘুনাথ পিছনে ছেড়ে আসা গ্রামখানার দিকে তাকাল। আলোর ছোট ছোট ফুটকিগুলো যেন স্বপ্ন হয়ে দুলছে ওখানে। অথচ ধাওড়াপাড়ার সব ঘরে আলো জ্বলে না এখনও। দেশ জুড়ে মজুত খাদ্যের অভাব। কেরোসিন তেল রেশনও অপ্রতুল।
রুদ্রাক্ষ যেদিন এল সেদিনও ঘর আঁধার ছিল ওদের। রেশন-ডিলার জগতের সঙ্গে গুয়ারামের একচোট বচসা হয়ে গেল। মানুষটা কিছুতেই মানবে না নিজের দোষের কথা। দেবগ্রাম থেকে ঘোড়ার গাড়িতে রেশনের মাল আসে ফি-হপ্তায়। জগত ক্যাশ নিয়ে যায় ওখানে। হিসাব চুকিয়ে সে বাসে ফিরে আসার আগেই তার ড্রামের কেরোসিন নিঃশেষ হয়ে যায় কালোবাজারে। ফাঁকা ড্রাম দেখিয়ে জগতের তখন সহানুভূতি আদায়ের বৃথা চেষ্টা।
এই কারসাজিটা গুয়ারাম নিজের হাতে ধরে ফেলে। ট্যাঙ্গাওয়ালাকে মনের সুখে গাল দেয় সে। ট্যাঙ্গাওয়ালা প্রাণের দায়ে আসল কথাটা উগরে দেয়, তুমারা আমাকে ধরে টানাটানি করে কী করবে? গোড়া কেটে ডগায় জল দিয়ে কী ফল হবে? আড়ত থেকে পুরা মাল কিনে নিয়েছে ইসমাইল। টাকা পেয়ে গিয়েছে জগতবাবু। যদি কিছু বলার হয় তো বাবুকে বলো, তবে বাপু আমার নামটা করো না। আমি ট্যাঙ্গাওলা। গরীব মানুষ। দেখো–আমার পেটে যেন লাথ না পড়ে।
সকালে ঝোলা নিয়ে জগতের রেশন দোকানে গিয়েছিল গুয়ারাম। শুধু কেজি তিনেক গম ছাড়া কেরোসিন তেল, চিনি কোনোকিছু আর পাওয়া যাবে না। কথাটা শুনে মাথায় রক্ত চড়ে গেল গুয়ারামের। প্রতিবাদ করে বলল, এ আমরা মানচি নে, মানব না। দরকার হলে আমি নিজে গিয়ে কপোবাবুকে ডেকে আনব। একি মগেরমুলুক নাকি?
জগত অনেক চেষ্টা করেছিল গুয়ারামকে বোঝাবার কিন্তু ওর গোঁ জগৎছাড়া। গুয়ারামের চিনি না হলেও চলবে কিন্তু কেরোসিন ছাড়া তার চলবে না। বাজারে এখন কেরোসিন হাওয়া। যাও বা মেলে তার দাম অত্যধিক চড়া। ঘরে আলো না জ্বললে মন খারাপ হয়ে যায় গুয়ারামের। অন্ধকারে কেউ কারোর মুখ দেখতে পায় না। সব সওয়া যায় কিন্তু অন্ধকার সহ্য করা যায় না। গুয়ারাম গলা চড়িয়ে বলেছিল, কেরোচিন কুথায়, চিনি কুথায়?
–মাল এবার সাপ্লাই হয়নি। জগতের কুণ্ঠাহীন জবাব।
-কেনে মিচে কতা বলচো? আমি সব জানি গো, আমার চক্ষে ধুলি দিতে পারবে না। গুয়ারাম গলা চড়াল ধীরে ধীরে।
বেগতিক দেখে জগত তাব সঙ্গে আপোষের পথে হাঁটতে চাইল, আরে মাথা গরম করো না, তোমার জিনিস যাতে তুমি পেয়ে যাও আমি সেই ব্যবস্থা করছি। একটু শান্ত হও গো। আমার ব্যবসার পিণ্ডি চটকে দিও না।
কী, তুমি আমাকে লুভ দেখাবে? ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা। এ আমি কী শুনচি গো। গুয়ারামের কথায় ক্ষেপে উঠল আশেপাশের ভিড়টা। জগত সেই জ্বলে ওঠা আগুনে জল ঢেলে নিভিয়ে দিতে পারল না।
সাইকেল নিয়ে একজন গেল মানিকডিহি গায়ে। এসব মামলায় কপোতাক্ষর জুড়ি নেই। তিনি এর বিহিত করে ছাড়বেন। দরকার হলে দরখাস্ত লিখে পাঠিয়ে দেবেন বিডিও অফিস নতুবা ফুড-সাপ্লাই অফিসে। গণ-স্বাক্ষরের গুরুত্ব সব অফিসারই দিতে চান।
বাড়ি ফিরে এসে রঘুনাথের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ঘরে কেউ নেই, তালা ঝুলছে। নূপুর এসে উদ্বেগভরা গলায় বলল, আঁধারে জ্যাঠার মাথা কেউ ফেটিয়ে দিয়েছে। কী রক্ত, কী রক্ত। জেঠি জ্যাঠারে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছে। তুমার বুড়াদাদুও গিয়েচে ওদের সাথে।
যার কোন শত্রু নেই, তার এমন আচমকা বিপদে বেশ ঘাবড়ে যায় রঘুনাথ। গুয়ারামের মাথায় কে মারতে পারে লাঠি? কার এত হিম্মোত আছে এ গ্রামে? তার নামটা জানতে পারলে রুদ্রাক্ষর দেওয়া রিভলবারটা কাজে লাগিয়ে দেবে সে। হাতি পুষে শুধু ভুষি খাওয়ানোর দলে সে নেই। সে জানে মারের বদলে মার।
