দিনসাতেক আগেও রামনগরে ঝামেলা হয়ে গেল শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে। দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে কোম্পানীর অনড় মনোভাব বিচলিত করেছে তাকে। দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল শ্রমিকপক্ষ। একে অন্যের শত্রু এমন মনোভাব নিয়ে ওরা পরস্পরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। একটা খণ্ডযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হল ওখানে যা ভীষণভাবে মনটাকে নাড়া দিয়ে গেল কপোতাক্ষর। তাহলে কাদের জন্য এ লড়াই? কৃষক ঐক্য, শ্রমিক ঐক্যের চরিত্র হারিয়ে গেলে মিথ্যাচার বয়ে বেড়ানোর দায়িত্ব ন্যস্ত হয় অগ্রণী নেতাদের ঘাড়ে। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সামনে নেতাদের কি কিছু করার থাকে? এত সভা-সমিতির আয়োজন তাহলে বৃথা। গোপন সভার তাহলে কি প্রয়োজন? মানুষের স্বার্থে যদি মানুষ না এগিয়ে আসে তাহলে গতি পায় না আন্দোলন। স্রোত হারিয়ে নদী তখন চৌবাচ্চার সমান। কপোতাক্ষ চেয়েছিলেন মানুষ বুঝতে শিখুক তাঁর কথাগুলো। ওরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। ওদের প্রাপ্য সম্মান ছিনিয়ে নিক।
শেষ পর্যন্ত কপোতাক্ষ তাঁর নিজের কথাকে, পার্টির ভাবনা এবং আদর্শকে সবার মাঝখানে বিলিয়ে দিতে পারলেন না। তাঁর নির্দেশিত শ্রমিক সংগঠন দু-ভাগ হয়ে দুটি শিবিরে ফুঁসে উঠল। সংসদীয় গণতান্ত্রিক নীতিকে অগ্রাহ্য করে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজেদের মধ্যে। হিংসার ঔদ্ধত্য ছোবল ওদের জখম করে পৌঁছে দিল হাসপাতালে। এমন কী সেই রণভূমি থেকে নিষ্কৃতি পেলেন না কপোতাক্ষ। মাথায় তিনটে সেলাই নিয়ে তিনিও ফিরে এলেন ঘরে।
মীনাক্ষী আঁতকে উঠেছিলেন তাঁর মাথায় ব্যান্ডেজ দেখে, কী হয়েছে গো তোমার? কী ভাবে। মাথা ফাটালে? আহা, একটু সাবধানে কি চলা ফেরা করতে পার না?
কপোতাক্ষ সেদিন মীনাক্ষীর মুখের উপর একটা কথাও বলেননি, বলা শোভন মনে করেন নি, নিজেদের বিরোধের কথা বলে তিনি নিজেকে ছোট করতে চান নি। গ্রামের মানুষকে তাদের মতো করে তিনি বুঝিয়ে উঠতে পারেন নি, এই অক্ষমতা একমাত্র তাঁরই। এর দায় তিনি আর কাউকে দিতে নারাজ। সংগঠনের প্রতি তাঁর আরও মনোযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন, নাহলে আন্দোলনের অঙ্কুর শুকিয়ে যাবে। চোখের সামনে সংগঠিত আন্দোলনের শ্মশানযাত্রা দেখতে হবে তাঁকে।
পড়ন্ত বিকেলে রঘুনাথ এসে দ্বীপীদের দরজায় কড়া নাড়ল। শীতের বেলা ব্যাঙাচির লেজের মতো তাড়াতাড়ি ঝরে পড়ে। ইতস্ততভাব কাটিয়ে রঘুনাথ দ্বীপীর মুখোমুখি দাঁড়াল। হাতে পেন নিয়ে দ্বীপী বই ফেলে ছুটে এসেছে তার সামনে।
রঘুনাথ ভাবছিল দ্বীপী হয়ত অসন্তুষ্ট হবে তার উপর। পড়াশোনার ব্যাঘাত সে মেনে নিতে পারবে না। রঘুনাথের ভাবনা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হল। দ্বীপী সহজ গলায় বলল, কখন এলে? ভালো আছ তো?
মাথা নাড়ল রঘুনাথ, সূর্য কুথায়? ওর সাথে ভেষণ দরকার ছিল।
সে আমি জানি। দ্বীপী কাঁধের দু’পাশের খোলা চুলগুলো নেচে উঠল হাওয়ায়, ভেতরে এসো, আমি সূর্যকে ডেকে আনছি।
সূর্য এসে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, কি রে এতদিন পর উদয় হলি, কোথায় ছিলিস? রঘুনাথ জোর করে হাসল না বরং গম্ভীর হয়ে গেল ওর মুখখানা, কুথায় আর থাকব, পেটের দায়ে ঘুরচি। তোদের মতন আমাদের ভাগ্যে তো আর বাঁধা ভাত নেই।
সূর্যাক্ষ এ প্রসঙ্গে গেল না, কী ব্যাপার হঠাৎ যে এলি? কী দরকার বল? রঘুনাথ আশেপাশে তাকাল, তারপর গলা খাদে নামিয়ে বলল, চল এটু বাইরে যাই। ইখানে বলে ঠিক জুত হবে না।
দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন না করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল সূর্যাক্ষ। আলো মরে আসছে পৃথিবীতে। নিমগাছের ডালে জড়ো হয়েছে রাজ্যের পাখি। ওদের কিচির মিচির ডাকে পুরো এলাকাটায় যেন হাট বসেছে পাখিদের। এ সময়টায় গোরুর পাল পায়ের ধুলো উড়িয়ে লেজ দুলিয়ে গোয়ালে ঢোকে। সূর্যাক্ষ বাঁশবাগানের কাছে এসে ঘন ছায়ায় দাঁড়াল, তোর কাছে বিড়ি হবে? দুপুর থেকে অঙ্ক কষে মাথাটা জাম হয়ে গিয়েছে। বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া না দিলে আর চলছে না।
রঘুনাথ কোনো কথা না বলে ঢোলা পায়জামার পকেট থেকে দুটো বিড়ি আর দেশলাই বের করল। দেশলাই জ্বেলে নিজের বিড়িটা ধরিয়ে অন্য বিড়িটা এগিয়ে দিল সূর্যাক্ষর দিকে, নে ধরা। তবে বেশি টানবিনে। বেশি টানলে কলিজা ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।
বেঁচে কি হবে বলতে পারিস?
রঘুনাথের কোনো উত্তর জানা নেই, বোবার মতো সে তাকাল।
সূর্যাক্ষ বলল, অমলকান্তি স্যারের কথা শুনেছিস? ওর নাকি জেল হয়ে গিয়েছে। রঘুনাথ ঠোঁট দিয়ে ইস শব্দ করল, আহারে, অমন ভালো মানুষ আর হয় না। ভালো মানুষের কপালে দেখছি যত কষ্ট।
-হ্যাঁ, তা তো ঠিক। তবে রুখে দাঁড়াতে হবে। সূর্যাক্ষর চোয়াল জেগে উঠল রাগে। রঘুনাথ বিচক্ষণের মতো বলল, তোর বাবার কথা ভাবতো। মানুষটা সারাদিন পার্টি-পার্টি করে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেল। শেষে কিনা পার্টির লোকই তার মাথা ফেটিয়ে দিল।
সূর্যাক্ষ নিরুত্তর চোখে তাকাল। রঘুনাথ স্পষ্ট করে বলল, এতে শিবনাথবাবুর কারসাজি আচে। সে তোর বাবাকে মোটেও সহ্য করতে পারে না। হরসময় গালি দেয়।
-ওর মরণ আমার হাতে লেখা আছে। আগে চাকরিটা পেতে দে। একটা বন্দুক কিনি, তারপর।
রঘুনাথের মনে পড়ে গেল রুদ্রাক্ষের দিয়ে যাওয়া রিভলভারটার কথা। ওটা খড়গাদায় গুঁজে রেখেছে সে। যন্ত্রটা বেশ ভারী আছে। ছুঁলেই শরীরের রক্ত ফুটে ওঠে। দিন চারেক আগেই রুদ্রাক্ষ ভোরবেলায় হাজির হয়েছিল তাদের ঘরে। উদ্দেশ্য ছিল একটা। ওর মা তুঙ্গভদ্রা অসুস্থ। সবসময় তাঁর বুক ধড়ফড় করে। পাড়া-প্রতিবেশীদের বলে বেড়াচ্ছে–তিনি আর বাঁচবেন না। ছেলের চিন্তায় তাঁর মাথার শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বিকেলের পরে এখন অসহ্য মাথায় যন্ত্রণা হয় তাঁর। ঘাড়ের কাছটায় কনকনিয়ে ওঠে ব্যথা। হাসপাতালের ডাক্তার বলে দিয়েছেন, নুন খাওয়া বারণ। খাসি-মাংস ছোঁওয়া যাবে না। ছেলের খোঁজে নীলাক্ষ কলকাতায় গিয়েছিলেন। হোস্টেলে রেখে এসেছিলেন হাতচিঠি। সেই চিঠি রুদ্রাক্ষর হাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। চিঠি পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল রুদ্রাক্ষর। মার সঙ্গে যে করেই হোক দেখা করতে হবে। মনটা কু গাইছিল।
