–ছাড়ো তো ওসব কথা। কমলা এড়িয়ে যেতে চাইল, আজ রাতে একবার আসবে, তোমাকে একটা জিনিস দেব।
-কি দেবা আগে বলো?
–আগাম তা বলা যাবে না। যদি আসো তাহলে পাবে, নাহলে নয়।
–যা দেবার এখনই দিয়ে দাও। গলায় দাবী ফুটে উঠল রঘুনাথের।
চোখে ঝিলিক মেরে হেসে উঠল কমলা, সবখানে কি সব কিছু দেওয়া যায় গো? আমি দিলে তুমিই বা নেবে কি করে?
রঘুনাথ এ রহস্যের মানে বুঝতে পারল না, সে বোকার মতো তাকাল।
কমলা কি ভেবে ওর গায়ের চাদরটা খুলে দিল রঘুনাথের হাতে, এটা গায়ে জড়িয়ে নাও। আজ বেশ শীত পড়েছে।
শীত তো সব দিন পড়ে।
-সব দিন তো আমি তোমার কাছে থাকি না। আজ কাছে আছি। আজ আমার কথা রাখো। কমলা ভেতরের উচ্ছ্বাস লুকিয়ে রাখতে পারল না।
গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে রঘুনাথ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। কমলা আশেপাশে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলল, ভাই আসছে, চাদরটা নাও তো, আর দেরি করো না।
-তুমার শীত লাগবে যে!
গায়ে আমার গরম জামা আছে। তাছাড়া আর কত পোশাক চাই? দেখছ না শীতকালে কেমন মোটা দেখায় আমাকে। কমলা শরীর দুলিয়ে হেসে উঠল।
চাদরটা গায়ে জড়িয়ে পাশাপাশি হাঁটছিল রঘুনাথ। মিহি অন্ধকার নেমে আসছিল চারপাশে। এ সময় পাখ-পাখালির ব্যস্ততা বেড়ে ওঠে, ঘরে ফেরার তাড়ায় ওদের মাথার বুঝি ঠিক থাকে না। বাঁধের নীচের আখখেতে সব সময় বুঝি চড়কমেলার গুঞ্জন। কিছুটা হেঁটে আসার পর রঘুনাথ বলল, জানো, আমার ঢিলিকাকি গলায় ফাঁস নিয়ে মারা গিয়েছে। পাড়ার লোকে বলচে-কাকি মরত না, শুধু ভিকনাথ কাকার বউটার জন্য মরল।
কমলা আঁচলে দাঁত বসিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল, ফুঁপিয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে বাধা দিল সে, শুনে বড়ো খারাপ লাগছে। আহা অমন মানুষ পাওয়া যায় না। তবে তোমার কাকা বড়ো জ্বালাত। মানুষ সব সহ্য করতে পারে, ভালোবাসা খুন হলে সে আর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।
সব্যসাচী টেরিয়ে টেরিয়ে রঘুনাথকে দেখছিল, ওর এক হাতে মিষ্টির হাঁড়ি, অন্য হাতে কালো রঙের একটা ব্যাগ। তার দিকে কোনো খেয়াল ছিল না কমলার, হঠাৎ রঘুনাথের ইঙ্গিতভরা চিমটি খেয়ে সে যেন নড়ে চড়ে উঠলল, শোন, এ হল আমার আদরের ভাই সব্য। আমার একেবারে ন্যাওটা। ও আসল বলে তো আমার আজ আসা হল।
রঘুনাথ সব্যসাচীর চোখে চোখ ফেলে হেসে উঠল, আমার নাম রঘু, রঘুনাথ। বাঁধের ধারে হলদিপোঁতায় থাকি। সেই থেকে ব্যাগটা বইছো, ইবার আমাকে ইট্টু দাও।
সব্যসাচী সংকোচ করছিল, রঘুনাথ জোর করে তার হাত থেকে ব্যাগটা কেড়ে নিল। আগুপিছু করে হাঁটছিল ওরা। সব্যসাচী বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে, রঘুনাথ পাতলা অন্ধকারে কমলার হাতটা চেপে ধরল, এট্টু দেঁড়িয়ে যাও।
কমলা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অবাক চোখে তাকাল, কী হল, কিছু বলবে বুঝি?
ভার হয়ে এল রঘুনাথের চোখ-মুখ, আমার কপালে কি আছে আমি জানিনে। জানিনে আমাদের এই সম্পর্ক কতদিন আর বাঁচবে? চারদিকে দশ লোকে দশ কথা বলছে। আমার আর শুনতে ভালো লাগে না। তুমাকে এট্টা জিনিস চাইবো–দেবে?
-কি? রঘুনাথ কমলার মুখের দিকে নিবিষ্ট চোখে তাকাল, তারপর দুম করে বলে বসল, তুমি আমার হবে? আমাকে ভুলে যাবে না তো?
–এ তুমি কী বলছে? কমলার গলা কেঁপে উঠল অস্বাভাবিক, তোমাকে ভুলে যাবো, এ তুমি কি করে ভাবলে?
অন্ধকারে কমলার ফুলের মতো শরীরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল রঘুনাথ। শরীরও সুগন্ধ ছড়ায় হাসনুহানার মতো। হাওয়া লাগা গাছের মতো কেঁপে উঠল কমলা। মাটি হয়ে তাকে জন্মের মতো আশ্রয় দিতে চাইল রঘুনাথ।
.
২৭.
সকালবেলায় মুনিষ গেলে ফিরতে ফিরতে সাঁঝ নামে গুয়ারামের। কদিন ধরে শীতের যা কামড় তা বুঝি সহ্য হচ্ছে না কারোর। রঘুনাথের গায়ে রঙচঙে চাদরটা দেখে চোখ কপালে তুলে দুর্গামণি শুধালো, কি রে এটা আবার কুথা থেকে পেলি?
রঘুনাথ ঘাবড়াল না, ঢোক গিলে বলল, দিদিমণির বাগান তেড়ে দিয়েছিলাম, দিদিমণি খুশি হয়ে আমায় এটা দিলো। বলল, নিয়ে যা রঘু, গায়ে দিবি। আমি আর দিদিমণির মুখের উপর না বলতে পারিনি।
সব ভালো মানুষগুলা কি হাসপাতালে থাকে? দুর্গামণির চোখে সন্দেহ নেচে উঠল, আমারে একবার হাসপাতালে নিয়ে যাবি তো? মানুষগুলাকে চোখের দেখা দেখব।
-কেনে তুমার আবার কি হলো?
–ভালো মানুষগুলার সাথে আলাপ করে আসবখন। দুর্গামণির সারা শরীরে একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ল যা শীতের রোদের চেয়েও চনমনে, আরামদায়ক।
রঘুনাথ বলল, এ আর কী এমন কথা! যবে মন চাইবে, আমাকে বলো। আমি তুমাকে সাথে করে নিয়ে যাবো। তুমার কুনো অসুবিধা হবে না।
সামনে পরীক্ষা বলে সূর্যাক্ষ আর দ্বীপী বাইরে বেরবার সুযোগ পায় না। ওরা জোর কদমে পড়ছে। কপোতাক্ষ বললেন, এখন আর টিউশনি গিয়ে লাভ নেই। যাওয়া আসায় অনেক সময় নষ্ট হয়। তোমরা নিজেরা পড়ো, তাতে অনেক লাভ হবে।
বাবার কথা মন দিয়ে শুনেছে সূর্যাক্ষ। দ্বীপীও অবাধ্য হয় নি। ওরা রাত দশটা অব্দি একসঙ্গে পড়ে। দশটার পরে সূর্যাক্ষ নিজের ঘরে ফিরে যায়। মীনাক্ষী ভাতের থালা আগলে বসে থাকেন ছেলের জন্য। ভালো রেজাল্ট করার জন্য চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছে না সূর্যাক্ষ। তার ইচ্ছে বড়ো হয়ে সে সরকারি দপ্তরে চাকরি করবে, যেখানে মন চায় বেড়াতে যাবে, দ্বীপীকে সে অনেক অনেক সুখে রাখবে। বাবার মতো সে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে না, এতে সম্মান বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক বদনামও ভাগ্যে জোটে।
