কথাটা প্রথম দিকে ছিল ফিসফিসানো পর্যায়ের, পরে তা ধুলোর ঘূর্ণির মতো বাড়তে বাড়তে ছুঁতে চাইছে আকাশ। ঝারির বেতের চেয়েও ছিপছিপে শরীরের দিকে তাকিয়ে ভয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ে লুলারাম। সত্যিই কি ঝারি ডাইন হয়ে গিয়েছে? প্রশ্নটাকে হাজার বার হাজার রকম করে দেখতে থাকে সে। ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়। একটা আস্ত রাত ফুরিয়ে যায় চোখের তারায়। ভিকনাথের বউটার চোখের তারায় একটা অস্বাভাবিকত্ব দেখতে পেয়েছে লুলারাম। ভেজা এঁটেল মাটির মতো ওর শরীরের চাকচিক্য এবং নমনীয়তা বেড়েছে ঝারির। পানপাতা মুখটায় কাচবরণ গায়ের রঙ যৌবন্য লালিত্যে আশ্বিনের কচুপাতার মতো টলমল করছে। হাতে প্লাস্টিকের শাখা, পরনে কমা শাড়ি, খালি পা তবু ওর দীর্ঘাঙ্গী শরীরের শান্ত কুয়োর চেয়েও গভীর চোখ দুটো ওকে সবার থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। আজকাল ঝারির শরীর থেকে উঠে আসা সুগন্ধটা লুলারামকে পাগল করে দেয় সবসময়।
এত টান ঝারির উপর লুলারামের ছিল না। তখন শুধু শরীর টানত শরীরকে। এখন শরীর মন দুটোই যেন বাঁধা পড়ে গিয়েছে ঝারির কুসুমবনের শরীরে। লুলারাম বুঝতে পারে সে ঝারিকে না দেখতে পেলে পাগল হয়ে যাবে। এক দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে চুল্লু খাওয়া ঘোড়ার মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে।
ঝারির প্রতি এই টান দু-মাস আগেও তার ছিল না। ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল ঝারি, সে হাসিতে ঠোঁট ভিজিয়ে শুধোল, কী ব্যাপার পীরিতের আঠাটা যে তুমাকে আর ছাড়ছে না। এত টান তো এর আগে দেখিনি? তুমার কি পীরিতের ব্যামো হল নাকি?
ঝারির কথাগুলোয় লুলারাম বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়। বছর তিনেক আগে মনসা পুজোর মেলা বসেছিল গাঙের ধারে। সেই মেলার দিনে ঝারি যেভাবে সাজল তার বাহার দেখে চোখ ঘুরে গেল অনেকের। সবাই আড়ালে আবডালে বলল, বউটার রূপ দেখেচো গো, যেন জ্যান্ত মনসাদেবী। আহা, কী শরীরের বাঁধুনি, কী তার চলন বলন। সেদিনই পশ্চিমের গুনিন বলেছিল, বউটার সব ভালো শুধু স্বভাব-চরিত্র ভালো নয়। ওর শরীরে আর এট্টা শরীল ঠাঁই নিয়েচে। দেখচো না ওর তাই কেমন রমরমা।
মেলা থেকে কথাটা চাউর হয়ে গিয়েছে গ্রামে। ঝারির শরীরের ভেতর আর একটা শরীর বাড়ছে। তার আত্মাকে চেপে রেখে আর একটা আত্মা দাপটের সঙ্গে চষে বেড়াচ্ছে তার মন। ঝারি এখন সেই মনের দাসানুদাস। সে ভিকনাথের বউ হলে কি হবে তার দেহ থাকে ঘরে, মন থাকে বাইরে। এই অবস্থায় তাকে যে ছোঁবে, সে-ই মরবে। বদ আত্মা তাকে ছেড়ে দেবে না।
শেরপুর-হলদিপোঁতায় পরপর পাঁচজন বিছানা নিয়েছে অসুখে। সবার অসুখ কোনো মামুলি অসুখ নয়। এর মাঝখানে ভিন পাড়ার জলজ্যান্ত ছেলে সাদাতও চলে গেল। এসব কার রোষে হয়? ঢিলিকে কে মারল? ওটা তো শুধু আত্মহত্যা নয়, নিশ্চয়ইএর পেছনে বদ আত্মার প্রভাব রয়েছে। কে সেই বদ আত্মা? কোথায় তার ঘরবাড়ি? সে কেন আসে, কেন যায়, কি তার উদ্দেশ্য এরকম অনেক প্রশ্ন হলদিপোঁতার মানুষ ভয়ে নিজের বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখে। তারা ঝারির দিকে তাকালেও তাদের লুকিয়ে থাকা ভয়টা কিছুতেই কাটে না।
রঘুনাথের সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা হয়েছিল কমলার। দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ-এর শিহরণ খেলে গেল ওদের দুজনের মনের ভেতর। কমলা আর নিজেকে বেঁধে রাখতে পারেনি। লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে সে চলে এসেছিল রঘুনাথের সামনে। তার গায়ে তখন একটা দামী চাদর জড়ানো। গা দিয়ে সুগন্ধি পাউডারের ভুরভুরানো সুগন্ধ বের হচ্ছে। আর সেই সুগন্ধটা রঘুনাথকে প্রেমকাতর চড়াই পাখির চেয়েও উতলা করে তুলছে।
কতদিন পরে কমলা গাঁয়ে ফিরছে কে জানে। কাশীনাথটা হাড় শয়তান। সে কমলার মেলামেশা বন্ধ করার জন্য জোর করে তাকে রেখে এল মামার ঘরে। সেখানে কিছুতেই মন বসছিল না কমলার, প্রায় সময় রঘুনাথের সরল মুখখানা ঘাই দিয়ে উঠত মনের জলাশয়ে।
বারোয়ারী তলার চাতালে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে কমলা আর রঘুনাথ। তার মামাতো ভাই সব্যসাচী তার সঙ্গে এসেছে পাহারাদার সেজে। বড়ো মামা বোনের বাড়িতে আসার সময় পেল না, যা কাজের চাপ। সেই জন্য ছেলেটাকে পাঠিয়েছে মেয়েটাকে দেখে-শুনে পৌঁছে দেবে।
সব্যসাচী গিয়েছে মিষ্টি কিনতে। এই সুযোগটা ছাড়তে চায় না কমলা। রঘুনাথ মন কেমন করা চোখে তাকিয়ে ছিল কমলার দিকে, তার চোখের পাতা পড়ছে না, এক বন্য অস্থিরতা তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সবসময়। কমলা শুধোল, ঘর যাবা না? চলো একসাথে যাই।
ফাঁপরে পড়া চোখ মেলে তাকাল রঘুনাথ, আমি সাথে গেলে তুমার কুনো অসুবিধা হবে না তো?
ভরাট মুখে মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে পড়ল কমলার, না, না অসুবিধা আবার কি হবে? আমার মামার ছেলে আমার সাথে এসেছে। ও অতো সাতে-পাঁচে থাকে না।
তবু যেন স্বস্তি পেল না রঘুনাথ, বেশ কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে সে বলল, তুমি চলে যাবার পর পুরো গাঁ খানা আমার কাছে শ্মশানের মতো মনে হত। দিনটা কেটে গেলেও রাতটা আর কাটতে চাইত না।
-তুমি তো আমার মামার ঘরে যেতে পারতে? প্রশ্নটা করে কমলা ঠোঁট কামড়াল।
–আমি কি ঠিকানা জানি যে যাবো?
–দাদার কাছে ঠিকানা ছিল।
রঘুনাথ আক্ষেপের সঙ্গে বলল, তুমার দাদা আমার সাথে কথা বলে না। ওর সব সময় আমার উপর রাগ রাগ ভাব। মনে হয় আমাকে খুন করতে পারলে ওর বুঝি মন জুড়োত।
