লুলারাম নুপুরের ব্যবহারে তিতিবিরক্ত। মেজাজ হারিয়ে একদিন সে নূপুরের গালে চড় মেরেছিল। সেই আঘাতের দাগ তার কিশোরী গালে রক্তখেগো জোঁকের মতো মোটা হয়ে ভেসে উঠল। লজ্জায় ঘর থেকে দু’দিন বেরয়নি নূপুর। মরমে মরে গেল লুলারামও। ঝারি তাকে রাতের বেলায় কত বোঝাল, কাজটা ঠিক করলে না গো, মা মরা মেয়েকে কেউ অমনধারা মারে?
-মারব না? জানো, ও তুমাকে জড়িয়ে কত গালমন্দ করল। লুলারাম বাঘে খেদানো ষাঁড়ের মতন পায়।
-নূপুর যা বলেচে–তাতে তো কুনো ভুল নাই। ঝারির মনটা কেমন হয়ে গেল, ওদের মা নেই, মা থাকলে অন্য কথা। বাপ আচে, বাপও তো ঘরে থাকে না। ফলে মেয়েটার সুখ-দুঃখ কে দেখবে? আমি দেখতে গেলে ওরা তা মেনে নেবে কেন? জানো তো–একগাছের ছাল আরেক গায়ে লাগে না।
ঝারির কথার বাঁধনে অভূত-আশ্চর্য এক সান্ত্বনার মলম লুলারামের অশান্ত বুকে লেপে যায়, তুমি ঠিকই বলেছো, আমি তো এভাবে ভাবিনি। আমি শুধু নিজের সুখের কথা ভেবেচি।
নিজের সুখের কথা তুমি ভাববে তবে বেশি নয়। জানোই তো অমৃত বেশি খেলে হজমায় না, বিষ হয়ে যায়। ঝারির ঝিলিক দেওয়া চোখে সান্ত্বনার হাসি চুঁইয়ে নামল।
লুলারাম গদগদ কণ্ঠে বলল, আমার এ জীবনে মেয়ে আমি কম দেখিনি। অনেক মেয়েকে নেড়ে-ঘেঁটে দেখেচি–তারা শুধু মেয়ে, তার বেশি কিছু নয়। তুমি মেয়ে হয়েও কুথায় যেন জ্যান্ত প্রতিমার শক্তি লুকিয়ে রেখেছো। তোমার ওই শক্তিটাকে আমি দণ্ডবত করি। তোমার শক্তির জোরে আমার যদি কিছু বদল ঘটে।
ঝারি ভ্রূ তুলে বলল, মানুষ নিজে না চাইলে তার কুনো বদল ঘটে না। বদলে যাওয়া অত সহজ কাজ নয়। যারা পারে তারা তো অন্য মানুষ।
লুলারাম বলল, আমি বদলে যাব ঝারি, শুধু তুমি আমাকে এট্টুখানি তাপ চাখতে দিও।
–আমার সবটাই তো তুমার?
–তাহলে ভিকনাথ? মুখ তুলে প্রশ্ন করল লুলারাম।
ঝারি হাসল, ও আমার শরীলটাকে পেয়েছে। ও আমার শরীলটাকেই ভালবাসে, এর বেশি ওর কিছু চাওয়ার নেই। তবে শুনে রাখো–আমি মরে গেলে ও আবার কাউকে বিয়ে করবে। বিয়ে না করে ও থাকতেই পারবে না।
অন্ধকারের হাজার রূপ। ঝারি সেই অন্ধকারের ছবি। শুধু ওর চোখ দুটো আলো জ্বেলে রাখে প্রেম-প্রতীক্ষার।
.
বুড়িগাঙের জলে ঢেউ উঠলে বেড়ে যায় ঠাণ্ডা। তখন আর থাকতে পারে না মুনিরাম, ওর হাতে পায়ের ঘাগুলো রস কেটে টনটনিয়ে ওঠে, অসহ্য যন্ত্রণায় সে আর কঁকিয়ে কেঁদে ওঠে না, চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে হরেকৃষ্ণ হরেরাম গায়।
শীতের শেষটানটা বড়ো ভয়ানক, ধুলো ওড়া দিনের মতো নয়, শেকড় সমেত উপড়ে নিয়ে পালিয়ে যাবার দিন। এই শীতটা পেরলে হয়’ মুনিরাম বিড়বিড়িয়ে ওঠে সব সময়। ইদানীং লুলারাম তার খোঁজখবর নেয় না, সবসময় এটা-সেটা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ছেলের এই এড়িয়ে যাওয়া হাড়ে হাড়ে টের পায় মুনিরাম, এবং এর কি কারণ সেটাও তার অজানা নয়।
ছেলে যদি কাছে এসে বসত তাহলে যুক্তি দিয়ে দু-চার কথা বলত মুনিরাম। বলত, দায়ের উপর কুমড়ো পড়লে দায়ের কিছু হয় না, কুমড়োই ফালা হয়ে কেটে যায়। বাপরে, সাবধান হ। তুই যার পাল্লায় পড়েচিস, সে তো কুনো সাধারণ মেয়েছেলে নয়। ওর ভেতরে যোগিনী পোরা। আমি জানগুরুর কাচ থিকে খোঁজ নিয়েচি। ওরা বর-বউ দুজনে মিলে এই বিদ্যেটা শিখেচে।
-বলো কি? লুলারাম আকাশ থেকে পড়ল।
মুনিরাম ম্লান মুখে বলল, সত্যি কথা তিতা হয় রে! যদি আমার কথা বিশ্বেস না হয় তাহলে তুই পরীক্ষা করে দেখা যোগিনীর বাঁ-বাহুতে সাপের চোখের চেয়েও চকচকে আঁচিল থাকবে। সেই আঁচিলে হাত ছোঁয়ানো মাত্র ওর শরীলে দশটা হাতির জোর আসবে। ওর কণ্ঠ হয়ে যাবে কোকিলের চেয়েও মিঠে, যা বলবে তাতেই তুই ফাঁদে লটকান ডাহুকের মতন লটকে যাবি।
মুনিরাম যা বলে তার একটাও মিছে নয়। ঝারির কথায় মিছরি গোলা। ওর বাঁ হাতের আঁচিলটায় কতবার যে জিভ ছুঁইয়েছে লুলারাম, যতবারই জিভ ঠেকিয়েছে ততবারই সাপের মতো গা-পাকমোড়া মেরে উঠেছে ঝারি, অমন করো না গো মরে যাব। এ বিদ্যে তোমায় আবার কে শেখাল। তুমার ওই জিভের ডগায় কামদেবতা ভর করেছে। আমাকে পিষে মারো, না হলে আমিও যে ধসে যাব।
জ্যোৎস্নারাতে খোলা মাঠে শরীর যেন খোলা বিল। নদী পেরনো নারী খেগো বাঘের মতো, দাপড়ে-হাঁপড়ে সাঁতরাতে থাকে লুলারাম। ঝারির আহ্লাদী কথায় পৃথিবী বুঝতে পারে–এবার জ্বালামুখী থেকে নিষ্কাশিত হবে ফুটন্ত অগ্নিধারা, ধনধান্যে ভরে যাবে হলদিপোঁতা ধাওড়াপাড়া। বুড়িগাঙের জলে আবার নতুন করে ঢেউ জাগবে, আর সেই ঢেউগুলো হবে ঝারির বুক জাগানো শরীরী ঢেউয়ের চেয়েও মায়াময় জাগ্রত সুন্দর।
লুলারামের মনে প্রশ্নটা অনেকদিনের। পাড়ার লোক বলে-ডাইনি হয়ে গিয়েছে আটকুঁড়া ঝারি। ওর কোল ভরবে কি, ও যে নিজের কোল নিজে খায়। হেইমা, ও যে সর্পজাতক। ওর ভেতরে মাছের মায়ের স্বভাব। ও ঢিলিকে খেয়েছে। তিন-তিনটা বুড়াকে খেয়েচে। ও ভূষণীবুড়িকে খেতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারল না। দেহ বেঁধে রেখেছিল বুড়িটা। গাঙ বন্ধন, শরীর বন্ধন, মন বন্ধন। কেউ কোথাও নড়বে না, সব যে যার জায়গায় থাকবে। ও মা গো, কী শক্তি গো। প্রকৃতি বাঁচবে তো এই বিপরীত মহাশক্তির কাছে। ঝারি সেই অশুভ শক্তির দাসী হয়ে বেঁচে আছে। ওকে নাড়াঘাটা করলে সবার বিপদ।
